মুক্তির মহানায়ক জাতির পিতার নেতৃত্বে বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতার দীর্ঘ সংগ্রাম বঙ্গবন্ধুর ভাষায়- 'অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা, অত্যাচার, নিপীড়ন, নির্যাতন, গণমানুষের রক্তক্ষরণ ও মুমূর্ষু নর-নারীর আর্তনাদের করুণ ইতিহাস।' অহর্নিশ ত্যাগঋদ্ধ বঙ্গবন্ধুর জীবনগাথা। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সভাপতি তোফয়েল আহমেদের আহ্বানে প্রায় দশ লাখ ছাত্র-জনতা কৃতজ্ঞচিত্তে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে অভিষিক্ত করেন। ১৯৭২ সালের ১০ অক্টোবর বিশ্বশান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধুকে বিশ্বনেতার স্বীকৃতিস্বরূপ 'জুলিও কুরি শান্তি পদক' অর্পণ করেন। চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোতে প্রাপ্ত এই বিরল সম্মান বঙ্গবন্ধুর আগে অর্জন করেছিলেন কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো, চিলির সার্ভে আলেন্দে, ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাত, ভিয়েতনামের হো চি মিন, দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, ভারতের মুলকরাজ আনন্দ ও ইন্দিরা গান্ধী।
১৯৭৩ সালের ২৩ মে ঢাকায় আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উদ্বোধনী ভাষণে বিশ্বশান্তি পরিষদের সম্মানিত মহাসচিব রমেশচন্দ্র বঙ্গবন্ধুকে বিশ্বশান্তি, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নির্ভীক কাণ্ডারি এবং বিশ্বের সব নির্যাতিত, নিপীড়িত ও শোষণ-বঞ্চনার শিকারে বিপন্ন জনগণের অধিকার আদায়ে তৎকালীন সময়ের জীবন্ত কিংবদন্তি বঙ্গবন্ধুকে 'বিশ্ববন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করেন। সেদিন থেকেই বাঙালির বঙ্গবন্ধু নতুন অভিধায় বিশ্ব পরিমণ্ডলে অবহিত হলেন 'বিশ্ববন্ধু শেখ মুজিব'। নিঃসন্দেহে দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যায়, বঙ্গবন্ধু যে গণতান্ত্রিক-অসাম্প্রদায়িক-শোষণমুক্ত-মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে মহান মুক্তিযুদ্ধের জন্য বাঙালিকে প্রস্তুত করেছিলেন, পাকিস্তান সামরিক জান্তার গণহত্যা শুরু এবং গ্রেপ্তারের প্রাক্কালে ২৫ মার্চ শেষ রাতে বলেছেন, 'এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।'
মৃত্যুঞ্জয়ী শেখ মুজিব ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তাঁর নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের পর পেয়েছিলেন যুদ্ধবিধ্বস্ত এক ক্ষতবিক্ষত ধ্বংসযজ্ঞের অবশিষ্ট দেশ-মাটি ও মানুষ। তীব্র খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান, কলকারখানায় শূন্য উৎপাদন, পরিপূর্ণ বিপর্যস্ত সব পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসনসহ বহুমুখী সংকটের ক্ষুধিত কাঠিন্য। ১০ এপ্রিল ১৯৭২ গণপরিষদের ভাষণে বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য ছিল- 'আমার যারা পশ্চিম পাকিস্তানে আছে, তারা যুদ্ধাপরাধী নয়। তারা সেখানে কাজ করছিলেন, তাদের ফেরত দিতে হবে। এখানে পাকিস্তানের যারা আছে তারা যদি এখানে থাকবার না চায়, তাদেরও আমি ফেরত দিতে রাজি আছি। কিন্তু যুদ্ধাপরাধী যারা এ দেশে পাশবিক অত্যাচার করেছে, লুট করেছে, হত্যা করেছে এবং যারা ইন্টারন্যাশনাল আইন মানে নাই, তাদের এখানে যুদ্ধাপরাধীর বিচার হবে।'
ইতোপূর্বে ৯ এপ্রিল ১৯৭২ স্বাধীন বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিল অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'হঠাৎ স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয় নাই। স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়েছে অনেক দিন পূর্বে। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে তাদের জীবনভর উজানে নৌকা বাইতে হয়েছে। কোনদিন তারা ভাটিতে নৌকা বাইতে পারে নাই কয়েক মাস ছাড়া। আওয়ামী লীগ কর্মীদের ত্যাগ, তিতিক্ষার ইতিহাস স্বর্ণ অক্ষরে লেখা থাকবে। এই জন্যই এখন লেখা থাকবে যে, আজ বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। লেখা থাকবে, হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ শহীদ ভাইয়ের ইতিহাস, যারা শহীদ হয়েছে স্বাধীনতা দেওয়ার জন্য। কর্তব্য রয়েছে দেশবাসীর, কর্তব্য রয়েছে আওয়ামী লীগ কর্মীদের। স্বাধীনতা পাওয়া যেমন কষ্টকর স্বাধীনতা রক্ষা করা তেমনি কষ্টকর।'
জাতি বিস্মৃত নয় যে, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর একাত্ম দর্শন বিশ্বে সমাদৃত। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে চরম অর্থনৈতিক নাজুক অবস্থায়ও বঙ্গবন্ধু বৈদেশিক সাহায্য গ্রহণে বলেন, 'নীতিগত প্রশ্নে সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ওপর জবরদস্তি কিছু চাপিয়ে দেওয়া চলবে না। দেশের এই মুহূর্তের অবস্থা যাই হোক না কেন, দেশের স্বার্থেই স্বাধীন ভূমিকার কোনো হেরফের হবে না। আমরা সাড়ে সাত কোটি মানুষ কর্মশক্তিতে বলীয়ান- দেশকে গড়ে তুলতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। আমাদের প্রত্যেকের আছে দুটি বাহু। আমাদের বাহুর সাহায্যে প্রকৃতির অকৃপণ দান উর্বর মাটি থেকে আমরা আমাদের গ্রাসাচ্ছাদন জুগিয়ে নিতে পারব। দাতামহল দাবি না ছাড়লে আগামীকালই তারা চলে যেতে পারেন। আমরা সাহায্য নেব না। ওইসব শর্তে আমরা সাহায্য নিতে পারি না।' গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু ছিলেন নবোন্মেষ পরমাত্মা; তবে সংযমিত কণ্ঠে সাবধান করেছেন গণতন্ত্রকে যেন উচ্ছৃঙ্খলতার মোড়কে কলুষিত করা না হয়।
১ মে ১৯৭২ জাতির উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু সংবাহ বৃংহণে বলেন, 'দেশ আজ স্বাধীন। সম্পদের মালিক জনগণ। তাই কোনো শ্রেণিবিশেষের ভোগ-লালসার জন্য এবং লোভ চরিতার্থ করার নিমিত্ত এই সম্পদকে অপচয় করতে দেওয়া যাবে না। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে সমাজতন্ত্র কায়েম করা। এই ব্যবস্থায় দেশের সমুদয় উৎপাদিত ও প্রাকৃতিক সম্পদ কৃষক-শ্রমিক ও সর্বশ্রেণির মানুষের মধ্যে সুষমভাবে বণ্টন করা হবে।' উল্লেখ্য, ব্যবহর্তায় কৃষকদের সুদসহ বকেয়া খাজনা, ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির কর, লবণ উৎপাদকদের আবগারি শুল্ক্ক, নিবর্তনমূলক ইজারাদারি প্রথা ইত্যাদি বিলুপ্ত করেন। দরিদ্র চাষিদের ঋণ, সার, বীজ ধান প্রদান নিশ্চিতকল্পে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, ক্ষতিগ্রস্ত রেল ও সড়ক সেতু দ্রুত সময়ে পুনর্নির্মাণ, ব্যাংক-বীমা-শিল্প-ব্যবসা সব বিরাজমান অরাজকতা নির্মূলকল্পে দক্ষ পরিচালক নিয়োগ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ক্রয়-আমদানি এবং চলমান ক্রিয়াশীল পুঁজির সরবরাহের ব্যবস্থা করেন।
ব্যাংক-বীমা, পাট-বস্ত্র-চিনি শিল্প, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন, বৈদেশিক বাণিজ্যসহ শিল্পকারখানার বৃহদাংশ জাতীয়করণ করেন। জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থি দাবি-দাওয়া উত্থাপনের মনোভাব পরিহার করে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির কার্যকর প্রতিষ্ঠার জন্য সমাজতান্ত্রিক শৃঙ্খলার প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দেন। নিবন্ধের স্বল্প পরিসরে বিস্তারিত ব্যাখ্যার সীমিত অবকাশ সত্ত্বেও তাৎপর্যপূর্ণ কিছু বিষয় পর্যালোচনার প্রয়োজন। দেশ পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয় উপাদান অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রাধান্য পেয়েছে বঙ্গবন্ধুর সরকারের বাজেট পরিকল্পনায়। ১৯৭২ সালের ৩০ জুন নতুন করারোপ ছাড়াই ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের জন্য ৭৫২ কোটি ৩৫ লাখ টাকার পেশকৃত বাংলাদেশের প্রথম বাজেটে রাজস্ব এবং উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয় যথাক্রমে ৪৩৪ কোটি ৫ লাখ ও ৩১৮ কোটি ৩ লাখ টাকা। ১৯৭৩-৭৪ সালের অর্থবছরে জন্য বাজেট ছিল ৮৩০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা এবং এই বাজেটে রাজস্ব ও উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয় যথাক্রমে ২৯৫ কোটি ৩০ লাখ এবং ৫২৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
১৯৭৪-৭৫ সালে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দসহ রাজস্ব এবং উন্নয়ন ব্যয় যথাক্রমে ৪৭০ কোটি ২৩ লাখ টাকা ও ৫২৫ কোটি টাকা। সর্বমোট ৯৫৫ কোটি ২৩ লাখ টাকার ব্যয় প্রস্তাব করা হয়। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কল্যাণ ও উন্নয়নমুখী ১৯৭৫-৭৬ সালের বাজেটের পরিমাণ ছিল সর্বমোট ১৫৪৯ কোটি ১৯ লাখ টাকা। এ বাজেটে রাজস্ব ও উন্নয়ন ব্যয় ছিল যথাক্রমে ৫৯৯ কোটি ১৯ লাখ এবং ৯৫০ কোটি টাকা। অসাধারণ সুদূরপ্রসারী গণতান্ত্রিক-সমাজতান্ত্রিক-জ্ঞাননির্ভর মানবিক ও উন্নত মানবসম্পদ সমৃদ্ধ জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় উল্লিখিত বাজেটগুলোর ক্রমবর্ধমান ব্যাপ্তি সহজে অনুমেয়। এভাবেই পরিকল্পিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণে অভীষ্ট খঞ্জনিকা উপস্থাপিত হলো।
বাঙালি কবি ও লেখক অজয় দাশ রচিত 'বঙ্গবন্ধু :আদিগন্ত যে সূর্য' কবিতার পঙ্‌ক্তি উচ্চারণে ইতিরেখায় আজকের নিবেদন- 'বাঙালি কি বাঙালি হয় শাড়ি, ধুতি, লুঙ্গি ছাড়া/ থাকে না তার বর্গ কিছুই না থাকলে টুঙ্গিপাড়া/ সুর-অসুরে হয় ইতিহাস, নেই কিছু এ দু'জীব ছাড়া/বাংলাদেশের ইতিহাসে দেবতা নেই মুজিব ছাড়া/ .... বাংলাদেশের মুক্তিও নেই মুজিব নামের সূর্য ছাড়া।'
শিক্ষাবিদ, সাবেক উপাচার্য
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়