'আসুন সবাই মিলে বাংলা নববর্ষটাকে অন্যরকম করি'

প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২০     আপডেট: ২৮ মার্চ ২০২০   

অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)

অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)

অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)

সামাজিক বিচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই মুহূর্তে দশ দিনের ছুটিতে বাংলাদেশ। এ সময় যানবাহন চলাচল যেমন বন্ধ থাকছে, তেমনি বন্ধ থাকছে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানও। শুধুমাত্র ওষুধ আর খাবার-দাবার ছাড়া অন্যান্য সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও বন্ধ থাকছে। 

প্রবাসীদের দলে-দলে দেশে ফিরে আসা এবং তারপর হোম-কোয়ারেন্টাইনের শর্ত না মেনে যত্রতত্র মেলামেশা সরকারকে বাধ্য করেছে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে। আর সামাজিক বিচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করার এই সরকারি সদিচ্ছাকে ঈদের ছুটি বানিয়ে হাজার-হাজার মানুষের ঢাকা ত্যাগ এখন গোটা দেশকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। তবে সব শেষ হয়ে গেছে এমনটা মনে করার কারণ এখনো ঘটেনি। এখনও যদি খুব কড়াকড়িভাবে সামাজিক বিচ্ছিন্নতাটা ধরে রাখা যায় তাহলে আশা করা যেতেই পারে যে চৌদ্দটি দিন পরে আমাদের দেশের পরিস্থিতি ইতালি কিংবা স্পেনের মত হবে না।

আমেরিকা পারেনি, আমরা কিভাবে পারব? এই হাপিত্তেশে যাদের দিন কাটছে তাদের মনে করিয়ে দিতে চাই চীনের প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়া পারেনি, কিন্তু পেরেছে প্রতিবেশী হংকং আর তাইওয়ান। পারেনি ঠিকই ইতালি আর স্পেন কিন্তু পেরেছেতো জার্মানি। আর অত ক্ষমতাধর আমেরিকা যা করতে পারলো না তাইতো করে দেখাচ্ছে ঘরের কাছের নেপাল-ভুটান।কাজেই আমাদের আস্থা রাখতে হবে সরকারি উদ্যোগের ওপর আর তার চেয়েও যা জরুরি, আমাদের পালন করতে হবে নিজ নাগরিক দায়িত্বটা।

আপনি যদি প্রবাস ফেরত হয়ে থাকেন কিংবা ওই লাখো মানুষের একজন হন যারা গত ক'দিনে 'দুলক-ভুলক-গোলক ভেদিয়া' ঢাকা থেকে পৌঁছে গেছেন নিজ-নিজ গ্রামে তাহলে অন্ত এখন সংযত হন। যা হবার তা হয়ে গেছে। সীমিত আকারে করোনার যে সামাজিক বিস্তৃতি ঘটতে যাচ্ছে তা আইইডিসিআর-এর পরিচালকের বয়ানেই আমরা এরই মাঝে জেনে গেছি। এখন দেশটাকে ইতালি-ইরান, স্পেন বা চীন না বানাতে চাইলে তার চাবিকাঠিটা আমাদের যার যার নিজের কাছেই। এ জন্য কঠিন পুলিশি ব্যবস্থা নিতে পারে রাষ্ট্র, নামাতে পারে সেনাবাহিনীও। রাষ্ট্র তার কাজটা ঠিকমতই করছে। তারপরও পুরোপুরি কাজ হবে না যদি না আমরা নিজেরা ঠিক হই।

এটা সত্যি যে এসময়টায় অন্যান্য আর সবকিছুর মত রোগীদের চিকিৎসা সেবা পেতে কিছুটা সমস্যা হতেই পারে। এই ছুটিটা শুরু হবার আগে-আগে রোগীর যে চাপ ছিল তা থেকে আমার কাছে এটা স্পষ্ট যে, মানুষ একটা অস্থিরতার মধ্যে আছে, বিশেষ করে রোগীরা। এই অস্বস্তির জায়গাটা কমানোর জন্যও কিন্তু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলো চিকিৎসা সেবা দেয়ার জন্য তাদের দরজা খোলাই রেখেছে। তবে আতঙ্কটা যেহেতু করোনা নিয়ে, কাজেই করোনা হয়েছে কি হয়নি তা নিয়ে মনের মাঝে যত দোলাচাল তার উত্তরটা তাড়াতাড়ি পাওয়াটাও জরুরি। এই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই আইইডিসিআর-এর হান্টিং নাম্বারের সংখ্যা বৃদ্ধির সুখবরটা আমাদের সবার জন্য স্বস্তি দায়ক। আরো যা স্বস্তির তা হলো ঢাকার বাইরেও প্রতিটি জেলায় চালু করা হচ্ছে হটলাইন নাম্বার। পাশাপাশি বিভিন্ন মিডিয়া হাউসগুলোর এবং পেশাভিত্তিক সংগঠনগুলোও চালু করতে যাচ্ছে হটলাইন নাম্বার যেখানে ফোন করে যে কেউ তার মনের সংশয়টা দূর করতে পারবেন সঠিক পরামর্শ পেয়ে।

যেকোনো এপিডেমিক আর পেন্ডেমিক সফলভাবে মোকাবিলা করার একটা বড় শর্ত হচ্ছে আমাদের হাঁটতে হবে এর আগে আগে, এর পিছনে ছুটলে চলবে না। আর এর জন্য একটা অন্যতম করণীয় হচ্ছে প্রকৃত সন্দেহভাজন রোগীগুলোকে আরো বেশি-বেশি আর আরো তাড়াতাড়ি পরীক্ষা করে সনাক্ত করা। আর তাদের সাথে যাদের সামাজিক মেলামেশা তাদেরও দ্রুত আনতে হবে কোয়ারেন্টাইনের আওতায়। শুধুমাত্র এভাবেই সম্ভব একটা পেন্ডেমিক-এর বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা। অত্যন্ত সুখের বিষয় এরই মাঝে ঢাকার জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ও ঢাকা শিশু হাসপাতালে পিসিআরের মাধ্যমে করোনা নির্ণয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আর শিগগির চট্রগ্রাম, ময়মনসিংহ, কক্সবাজারসহ একাধিক সরকারি মেডিকেল কলেজেও এই পরীক্ষার সুযোগ বিস্তৃত হতে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি এতাধিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানও করোনা স্ক্রিনিং কিট আনার ব্যবস্থা করছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কখন আমরা করোনা আক্রান্ত কিনা তা জানতে চেয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ফোন করবো। আমাদের অযথা ফোনকলগুলো এই নতুন হান্টিং নাম্বারগুলোকেও খুব দ্রুতই এনগেজড করে ফেলবে। কাজেই এক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্বশীল আচরণটা খুব বেশি প্রত্যাশিত।

কখন, কাকে করোনা আক্রান্ত ভেবে পরীক্ষা করা হবে এই পলিসিটা প্রত্যেক রাষ্ট্রের নিজস্ব কিন্তু তা নির্ধারণ করা হয় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিয়মকানুন অনুসরণ করেই। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের আন্তর্জাতিক ট্রান্সমিশনের পাশাপাশি স্থানীয় ট্রান্সমিশন চলছে। এখনও সামাজিক ট্রান্সমিশনটা দেখা দেয়নি। এই অবস্থায় যদি কারো বিদেশ থেকে সম্প্রতি দেশে আসার কিংবা সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন অথবা করোনা রোগে আক্রান্ত হয়েছেন এমনি কারো সংস্পর্শে আসার ইতিহাস না থাকে তাহলে তাদের জন্য করোনা ভাইরাসের পরীক্ষা জরুরি নয়। তবে কারো যদি এটিপিক্যাল নিউমোনিয়া কিংবা অন্যকোন জটিল রোগ যেমন, কিডনি ফেউলিউর, হার্টের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, দূরারোগ, লিভার সিরোসিস ইত্যাদি থাকে তবে তাদেরও পরীক্ষার আওতায় আনা হবে। তবে সবার আগে তাদের থাকতে হবে করোনার লক্ষণ অর্থাৎ জ্বর, শুকনো কাশি, শ্বাসের সমস্যা আর বুকে চাপ লাগার কমপ্লেইন।

আমাদের স্বাধীন অস্তিত্বের একটা বড় সময় কেটেছে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় মিথ্যাচার শুনে। ফলে আমরা এমন একটা অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিলাম যে আমরা প্রায় সময়ই সরকারি বক্তব্যগুলোয় আস্থা রাখতে পারতাম না। কিন্তু এখনতো সময় পাল্টেছে। এখনতো সরকারি স্যাটেলাইট চড়কি কাটে মহাকাশে। যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে ছড়ানো হয় গুজব আর সরকারি ব্যাপারে মিথ্যাচার, সেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমওতো আপনার-আমার হাতের মুঠোয় স্মার্টফোনে একটি ছোয়ার দূরত্বে ওই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটেরই কল্যাণে। তাহলে আর কেন? তার চেয়ে চলুন আস্থা রাখতে শিখি আর শিখি দায়িত্বশীল হতে। এবারের ইংরেজি নববর্ষের শুরুটা আমাদের জন্য খুব একটা সুখকর হয়নি সত্যি,কিন্তু এইটুকু যদি আমরা করতে পারি তাহলে বাংলা নববর্ষটা কিন্তু আমাদের একদমই অন্যরকম হতে পারে।

চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ