করোনাকাল কবে অতিক্রান্ত হবে তা জগৎবাসীর কেউ-ই বলতে পারছেন না। পৃথিবীর দাপুটে রাষ্ট্রগুলো যখন অসহায়। তাদের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানদের চোখের পানি তরঙ্গমালায় ভেসে বেড়ায়, তা দেখলেই বোঝা যায়। অস্ত্র বা অর্থবল কিছুই নয়। এই মুহূর্তে লাখ কোটি টাকা খরচ করেও বেঁচে থাকার জন্য সামান্য চিকিৎসা সহযোগিতা পাওয়ার সামর্থ্য থাকলেও সুযোগ নেই। পৃথিবীর তাবৎ অস্ত্রের পাহারাদারদের জীবন বিপন্ন। সেটি মার্কিন রণতরীর থেকে তীরে ফেরার জন্য সামরিক অধিনায়কের তারবার্তাই প্রমাণ করে। সবাই বাঁচতে চাই। জগতের সব প্রাণীর প্রথম দাবিই তার বেঁচে থাকা। সেটি নিজের জন্য, দেশের জন্য বা প্রজন্মের জন্য- যে ভাবেই বলি। এই যে করোনা আক্রান্ত পিতার মৃত্যুর খবরে পুত্রের পলায়ন। লাশের পাশে পুত্র নেই, নেই স্বজনরা। কি এক নিদারুণ মর্মবেদনায় ভারাক্রান্ত পৃথিবী।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যতই বলুন 'আমেরিকার জন্ম হয়নি লকাউনের জন্য।' জনগণ ও অঙ্গরাজ্যগুলো কিন্তু নিজ প্রয়োজনে লকডাউনে গিয়েছে। তারাও মার্কিনপ্রধানের বক্তব্যে স্থির থাকতে পারেননি। আমাদের দেশের একদল স্বপ্নবাজ মানুষ তেপান্তরের ওই দেশগুলোতে গেছেন একটা সুন্দর জীবনের আশায়। তারা সেখানে যে শুধু নিজেদের জীবন বদল করেছেন- তাই নয়, সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জীবনকেও বদলে দিয়েছেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স আমাদের বাহাদুরির একটা বড় কারণ। যে ছেলেটা বাড়িতে এক গ্লাস পানি নিজে ঢেলে নিত না, সেই ছেলেটা/মেয়েটা দিনরাত কাজ করে আমাদের স্বপ্নসাধ পূরণ করে। তাদের পাঠানো টাকায় শুধু পরিবার নয়, আমাদের রাষ্ট্রও একটা শক্ত অর্থনৈতিক ভিতের ওপর দাঁড়িয়েছে।

করোনার ছোবল আসার আগ পর্যন্ত আমরা বলেছি, ওরাই আমাদের রেমিট্যান্সযোদ্ধা। বিমানবন্দরে ওদের জন্য মর্যাদা চেয়েছি। ওদের পাঠানো টাকায় রাষ্ট্র বোনাস দিয়েছে। করোনার ছোবলের পর সেই আমরাই বলেছি, ওরা আমাদের জন্য মহাবিপদ! ওরা যেন এখানে না আসে। বিমান যোগাযোগ বন্ধ করে দিক সরকার।এই যে ব্যবহারের বৈচিত্র্য, এর পেছনের মূল কারণ কিন্তু নিজের বেঁচে থাকার বিষয়। এখন আবার শুরু হয়েছে যারা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ থেকে আসছেন বা যারা গ্রাম থেকে সেসব কর্মের জায়গায় ফিরছেন, তাদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাবের প্রকাশ। আমরা যারা সমালোচনা করছি, তারা যেমন নিরাপত্তার প্রশ্নে সঠিক আছি। আবার আমি যখন কাজে যাচ্ছি বা লকডাউনের কারণে বাড়িতে ফিরছি, সেটিও বাস্তবতা। আসলে আমরা সমন্বয় করতে পারছি না বলেই আমাদের যত এলোমেলো অবস্থা। প্রয়োজনের সময়ে সঠিক কাজটি করতে না পারায় আমরা বিপদগ্রস্ত হচ্ছি।

আর একটি সমস্যা আমাদের দেশের ছিন্নমূল মানুষ, যারা তার নাড়ি পোঁতা ভিটেমাটি হারিয়ে বড় বড় শহরের ফুটপাতে থাকেন, তিনি কোথায় লকডাউন হবেন? কোনো গৃহ কি তার আছে? লকডাউন আর হরতাল এক নয়। হরতাল দাবি আদায়ের জন্য, যা দেশ ও জীবনের জন্য কখনও কখনও দরকার। আর লকডাউন রাষ্ট্র কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া গৃহবাস। লকডাউন আর লকাপের মৌলিক পার্থক্য- লকআপে থাকা খাওয়া-চিকিৎসার দায়িত্ব রাষ্ট্রের আর লকডাউনে নিজের খেয়ে রাষ্ট্রের আদেশ পালন করা।

আমরা মাস্ক চেয়েছি, মাস্ক সংকটের কারণে তীব্র সমালোচনা করছি। কিন্তু যারা মাস্ক তৈরি করবেন সে শ্রমিক বা গার্মেন্ট চালু রাখতে দিচ্ছি না। আমরা আটা, ময়দা বা পাউন্ড বা নানরুটি চেয়েছি, কিন্তু এগুলোর উৎপাদনের শিল্প খোলায় আবার সমালোচনা করছি। আমরা চাল চাইছি, কিন্তু চালের মিল-চাতাল খুলতে দিচ্ছি না। আসলে এগুলোর একটা ফয়সালা হওয়া দরকার। আমরা যারা ভাবছি ১৫ দিন গৃহবাসেই সমাধান, তাহলে তো কথাই ছিল না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রোগের চিকিৎসা যেহেতু নেই। এই করোনাকে এড়িয়ে যেতে নন-কমুনিকেটিভ মেথড অ্যাপ্লাই একমাত্র আপাতত (টোটকা) চিকিৎসা! সে ক্ষেত্রে এটি সেপ্টেম্বর অবধি গড়াতে পারে! যদি তাই হয়, তবে আমাদের ভাবনায় নিতে হবে শিল্প ও কৃষি অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপগুলোর বিষয়ে।

সমাজ ও রাষ্ট্রের আচরণ ও কথাবার্তা থেকে অনুভূত হচ্ছে এপ্রিলই শেষ নয়, আগামী মাসাধিকাল আমাদের জন্য কঠিন সময়। এই সময়কাল অতিক্রান্তে কয়েকটি সেক্টরে কিছু করণীয় বিষয়ে ব্রাত্যজনের সুপারিশ-

স্বাস্থ্য খাত : আমরা এরই মধ্যে অবগত আমাদের দেশের ৯৫ শতাংশ প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ। রংপুরের ধাপ যেখানে কয়েকশ' প্যাথলজি ও ক্লিনিক। গুডহেলথ, আপডেটসহ দু'একটি ছাড়া সব বন্ধ। বাস্তবতার কারণে চিকিৎসকরা করোনা সংক্রমণ ঝুঁকিতে রয়েছেন বলেই রোগী দেখছেন না। এ রোগের কে কেরিয়ার, কে শিকার তা যেহেতু বোঝার উপায় থাকে না, ফলে এ সর্তকতা অন্যায় বলার সুযোগ নেই। এসবের কারণে পরিস্থিতি এমনতর হয়েছে, অন্য রোগের চিকিৎসাসেবাও পরিত্যক্ত হয়েছে। এর থেকে জরুরি উত্তরণ দরকার। যদিও প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসকদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা ও ঝুঁকি ভাতার ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে চিকিৎকদের বিজ্ঞানসম্মত নিরাপত্তা দিয়েই চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা গড়তে হবে।

আমাদের করোনা পরিস্থিতি জ্যামিতিক হারে বাড়বে, এ নিয়ে বোধ করি সন্দেহ নেই। কিন্তু সে তুলনায় চিকিৎসক ও নার্স বা সেবাদানকারীর সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। (ক) অবসরে যাওয়া কর্মক্ষম অনেক অভিজ্ঞ চিকিৎসক আছেন, যারা অবসরজনিত ছুটিতে আছেন বা শুধু অবসর নিয়েছেন- এসব অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া। (খ) সরকারি কর্ম কমিশনে বিসিএস উত্তীর্ণ হয়ে নন-ক্যাডারে সুপারিশকৃত হয়ে আছেন তাদের দ্রুত নিয়োগ ও পোস্টিং দেওয়া। (গ) বিপুল সংখ্যক চিকিৎসক এমবিবিএস পাস করে চাকরির অপেক্ষায় আছেন তাদের এডহক ভিত্তিক চিকিসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া। (ঘ) যারা এমবিবিএস পাস করেছেন কিন্তু ইন্টার্নি শুরু হয়নি, তাদের বাধ্যতামূলক এই পরিষেবায় যুক্ত করা, প্রয়োজনে যেখানে রোগী বেশি সেই মেডিকেল কলেজে ডেপুটেশনে নিয়ে আসা। এতে তার শিক্ষা ও সেবা দুটিই হবে। বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সরকারিভাবে বেতন দেওয়ার ব্যবস্থা করা। কারণ, বেসরকারি অধিকাংশ কলেজ মাসিক বেতনের নাম করে আগেই ইন্টার্নির পেমেন্ট সমন্বয় করে থাকে। ফলে ইটার্নরা একপ্রকার বিনা পয়সায় সার্ভিস দেন। (ঙ) বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোয় করোনা রোগীর জন্য একদম পৃথক ভবন রাখা। (চ) সরকারি-বেসরকারি সব মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের এই পরিস্থিতিতে কাজে লাগানো। একইভাবে নার্সিং কোর্স কমপ্লিট করে অনেকে চাকরির অপেক্ষায় আছেন, তাদের নিয়োগ দেওয়া। ইউনিয়ন হাসপাতালগুলোয় পরিষেবা অব্যাহত রাখা। করোনা উপসর্গের রোগী ছাড়া তারা যেন অন্য রোগগুলোর বিষয়ে দেখভাল করেন। যারা এই করোনাকালে হেলথ সার্ভিস দেবেন, তারা ভবিষ্যতে চাকরির ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পাবেন এবং তাদের জন্য চাকরির শর্ত শিথিলযোগ্য করা।

আইনাঙ্গন : লকডাউনের কারণে আদালত বন্ধ; কিন্তু আসামি গ্রেপ্তার বন্ধ নেই। ফলে গ্রেপ্তারকৃত আসামি আটকের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিচারকের সামনে হাজির হতে পারছেন না বা তার পক্ষে কেউ আইনি পরিষেবা দিতেও পারছেন না, যা আমাদের সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন। এতদ বিষয়ে যে বিচারক গ্রেপ্তারকৃতকে হাজতে প্রেরণের আদেশ দেবেন, তিনি অন্তত জামিনযোগ্য মামলায় আসামিকে ব্যক্তিগত মুচলেকায় জামিন দিতে পারেন। উচ্চ আদালতের অনুমোদনের মাধ্যমে পরিস্থিতিগত কারণে আদালতগুলোয় অনলাইন পিটিশন, অনলাইন হেয়ারিং, অনলাইন অর্ডার প্রভৃতির দিকে যাওয়া উচিত হবে। এতে করে স্বাস্থ্যবিধির ব্যত্যয়ও হবে না, আইনও লঙ্ঘিত হবে না। এতদ্ব্যতীত রাষ্ট্র আইনজীবীদের জন্য কিছু সহযোগিতা করতে পারে। কারণ, তারা বেতন নয়, দিনভিত্তিক কর্মের ওপর জীবন ধারণ করেন।

কৃষি ক্ষেত্র : দিন কয়েকের মধ্যেই আমাদের বোরো মৌসুমের ধান কাটা-মাড়াই। ইতোমধ্যে হাওর অঞ্চলে শুরু হয়েছে। উত্তরাঞ্চলে ১৫ দিনের মধ্যে পূর্ণ উদ্যমে শুরু হবে। এগুলো কীভাবে হবে তার ব্যবস্থাপনা এখনই করতে হবে। সেখানে সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং না পারসোন্যাল ডিসট্যান্সিং হবে- সেগুলোর ধারণা মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মীদের মাধ্যমে এখনই শুরু করা উচিত হবে। করোনার কারণে মাঠ থেকে ফসল তুলতে না পারলে বিপুল ক্ষতি হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে জেলাভিত্তিক কৃষি বিভাগকে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করতে হবে। বাংলাদেশের খাদ্য সংগ্রহের মূল মৌসুম এটিই।

শিল্প ও অন্যান্য যেসব প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্যবিধি ও সোশ্যাল ডিসট্যান্স মেনে রপ্তানিমুখী ও জরুরি পরিষেবার আওতায় উৎপাদন করতে পারবে, তাদের জন্য সুযোগ সংরক্ষণ করা। সেখানেও মালিকদের পক্ষ থেকে ঝুঁকিভাতা ও বীমার ব্যবস্থা চালু করা। আমাদের দেশের গ্রামপর্যায়ে বেসরকারি সাহায্য সংস্থার অনেকের স্বাস্থ্য কর্মসূচি আছে, সেসব এনজিওর শক্তিকে কাজে লাগানো। গ্রামপর্যায়ে স্থানীয় যুবকদের নিয়ে লকডাউন ফলো ও হেলথহাইজেন মেইনটেন সচেতনা বৃদ্ধির কাজটি এগিয়ে নেওয়া। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে খাদ্য সহযোগিতায় এই যুবসমাজকে কাজে লাগানো যেতে পারে।

বিশ্বাস করি মানুষ জয়ী হবেই। একটা পুরোনো গল্প দিয়ে শেষ করি। ১৮ বছর আগে আমেরিকার টাকায় ফিলিপিন্সে কিছু দিনের জন্য পড়তে গিয়েছিলাম। সেখানে তারা সাকসেস হিস্ট্রি দেখিয়েছিলেন, যেখানে বিশুদ্ধ পানি পান করার সফল গল্প দেখিয়েছিলেন অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশের একটি গল্প। সেখানে একজন মানুষ ঘোর বন্যায় তিন কিলোমিটার একবুক পানির পথ ঠেলে উঁচু জায়গা থেকে সিলভারের কলসে টিউবওয়েলের পানি ভরে বাড়ি বয়ে আনছেন। এটি সচেতনতার চিত্র। বিশ্বাস করি, করোনাতেও আমাদের বড় অর্জন আছে। মানুষ এই রোগকে ভয় করতে শিখেছে। পরিণতির কথা বুঝে ফেলেছে। বিশেষত গরিব মানুষ। আমরা যদি একটু যত্ন নিয়ে গরিবদের দেখভাল করি, নিশ্চয়ই আমরা সফল হবো।

লেখক : তৃণমূলের নাগরিক