করোনা আতঙ্কে স্থবির পৃথিবী। মানব সভ্যতা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। ব্যতিক্রম নয় বাংলাদেশও। সম্ভাব্য সব ধরনের সংক্রমণের রাস্তা বন্ধ করতে নেওয়া হয়েছে নানা ব্যবস্থা। কয়েক দফায় বৃদ্ধি করে আগামী ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছুটির কারণে অধিকাংশ সেবা বন্ধ থাকলেও বেশ কিছু জরুরি সেবা চালু রয়েছে। চালু থাকা বেশিরভাগ জরুরি সেবায় লোকসমাগম হওয়ার তেমন সুযোগ না থাকলেও সারাদেশে সীমিত আকারে যে ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু রয়েছে, সেখানে যথেষ্ট লোকসমাগম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তা করোনাভাইরাসে আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে। সম্প্রতি অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের প্রিন্সিপাল শাখার এক তরুণ কর্মকর্তার শরীরে করোনা শনাক্ত হলে ওই শাখায় কর্মরত ৬৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়। তবে ওই ব্যাংকে লেনদেন করতে আসা কোনো গ্রাহককে কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়নি। এ ক্ষেত্রে আশঙ্কা থেকেই যায়, করোনা যেভাবে বিস্তার লাভ করে, তাতে কোনো গ্রাহক যদি আক্রান্ত ওই কর্মকর্তার শরণাপন্ন হয়ে থাকেন তাহলে তাকেও কোয়ারেন্টাইনে আনার আবশ্যকতা রয়েছে।

জরুরি সেবার অংশ হিসেবে রাজধানীসহ সারাদেশেই খোলা রয়েছে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোর নির্দিষ্ট কিছু শাখা। আর খুব স্বাভাবিকভাবেই এ কারণে করোনা সংক্রমণের আশঙ্কায় রয়েছেন যেমন গ্রাহকরা, তেমনি সংশ্নিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারাও। বিভিন্ন সময় বিশেষজ্ঞরা টাকার মাধ্যমে সংক্রামক রোগ ছড়ানোর ঝুঁকির কথা বলেছেন। কারণ টাকার অবিরাম হাত বদলেই জীবাণুতে আক্রান্ত হওয়ার সুযোগ বেশি থাকে। এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের পর এই মারাত্মক ছোঁয়াচে চরিত্র কাগুজে নোট ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাইরাস জড়বস্তুতে নিষ্ফ্ক্রিয় হলেও মানুষের সংস্পর্শে সক্রিয় হয়। সে ক্ষেত্রে করোনাভাইরাসের উপসর্গ বা রোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে টাকায় ঝুঁকি অনেক বেশি। কাগজের নোট হাতবদলের মাধ্যমে করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশই বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। ১৪ দিন পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ায় ব্যাংক নোট কোয়ারেন্টাইন করে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। অনেক দেশ অতিবেগুনি রশ্মি এবং উচ্চ তাপমাত্রা ব্যবহার করে নোটগুলো জীবাণুমুক্ত করেছে। এমনকি অনেক দেশ ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে ব্যাংক নোট পুড়িয়ে ফেলার মতো সিদ্ধান্তও নেয়। কিন্তু বাংলাদেশে এর কোনোটিই গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে কাগজের নোটও করোনা সংক্রমণ বাড়িয়ে দেওয়ার শঙ্কার বাইরে নেই।

এটি গেল কাগজের নোট। এবার আসি লোকসমাগম ও সামাজিক দূরত্ব প্রসঙ্গে। লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সব ব্যাংকে গ্রাহকরা পাশাপাশি গাদাগাদি করে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে লেনদেন সম্পন্ন করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সূত্রে ব্যাংকের ভেতরে লেনদেনরত অবস্থায় কারও কারও মুখে মাস্ক না থাকার দৃশ্য চোখে পড়ছে। উল্লেখ্য, এই দুর্যোগের সময় ব্যাংকে মাত্র পাঁচটি বিষয়ে লেনদেন করার কথা- ফান্ড ট্রান্সফার, টাকা উত্তোলন, জমা, রেমিট্যান্স উত্তোলন ও ক্লিয়ারিং। কিন্তু গ্রাহকরা ভিড় করছেন যে কোনো ধরনের লেনদেনের জন্য। সংক্রমণ রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথম অবস্থায় সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত লেনদেন করার নির্দেশ দেয়। পরে সেটি আরও বৃদ্ধি করে পুনরায় কিছুটা সীমিত করেছে। কিন্তু যতই সীমিত করা হোক না কেন, ব্যাংকিং কার্যক্রমে যে সংখ্যক লোকসমাগম লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাতে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে ভয়াবহভাবে।

স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংক কর্মকর্তাদের সচেতনতার স্তর কিছুটা উন্নত হওয়ায় তারা বেশ সতর্ক অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছেন। কিন্তু সেটি পুরোপুরি অনুসরণ করা সম্ভব হচ্ছে না অপেক্ষাকৃত অসচেতন গ্রাহকদের কারণে। গ্রাহকদের সচেতনতার স্তর সবার উন্নত না হওয়ায় সংক্রমণের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে অন্য সবার জন্য। ব্যাংকগুলোতে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বেশ কিছু কড়াকড়ি আরোপের চেষ্টা করা হলেও বাস্তবে তা সম্ভব হচ্ছে না। করোনা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে যে ধরনের সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নিয়ম রয়েছে, সে ধরনের দূরত্ব মোটেও বজায় রাখা হচ্ছে না বলে প্রতিনিয়ত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। মোটা দাগে বলা যায়, ব্যাংকে লেনদেন করতে আসা গ্রাহকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোনো রকম স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। ফলে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ব্যাপকভাবে।

কোনো কোনো ব্যাংক কর্মকর্তার সঙ্গে আমি ব্যক্তিগতভাবে কথা বলে জানতে পারলাম, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বা কর্মকর্তারা গ্রাহকদের নিরাপদ দূরত্বে থেকে লেনদেনের অনুরোধ জানালে পাল্টা তারা এর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। উল্লেখ্য, করোনা প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে সামাজিক দূরত্ব (৩ মিটার) বজায় রাখতে নির্দেশনা দিয়ে সার্কুলার জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু সেটি যথাযথভাবে অনুসরণের লক্ষ্যে জোরালো কোনো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যাচ্ছে না। ফলে ব্যাংক কর্মকর্তারাও এটি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। এ জন্য অনেক সময় অসহায়ের মতো চাকরি বাঁচাতে, জীবন-জীবিকার তাগিদে ইচ্ছার বাইরে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে ব্যাংক কর্মকর্তাদের। চরম আতঙ্কের মধ্যে তারা যেমন দায়িত্ব পালন করছেন, তেমনি গ্রাহকদের জীবনও রয়েছে ঝুঁকির মধ্যে।

নানা কারণে ব্যাংক খোলা রাখার যৌক্তিকতা রয়েছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়াকে কীভাবে আরও সীমিত করা যেতে পারে, সেটি ভেবে দেখারও যৌক্তিকতা তৈরি হয়েছে। ব্যাংকে লেনদেনের ক্ষেত্রে এই ক্রান্তিকালে সাধারণত কোন ধরনের লেনদেন জরুরি, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। এমনকি যেসব শাখা বন্ধ রাখা রয়েছে, সেগুলো সপ্তাহে দু'একদিন খোলা রেখে অন্য শাখাগুলোকে দু'একদিন বন্ধ রাখা যেতে পারে। এক ব্যাংকের চেকের লেনদেন অন্য ব্যাংকে সীমিত করার বিষয়টিও ভেবে দেখা যেতে পারে। এমনকি সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে কিংবা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। পরিশেষে বলতে চাই, করোনা প্রতিরোধে বিশ্বব্যাংকের দেওয়া সব নির্দেশনা অনুসরণ করার পাশাপাশি বাংলাদেশের সার্বিক পরিবেশ বিবেচনা করে কীভাবে ব্যাংক কর্মকর্তা ও গ্রাহকদের জীবন ঝুঁকির আওতায় বাইরে আনা যায়, সেদিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে।

সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
sultanmahmud.rana@gmail.com