প্রতিদিন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি মৃতের সংখ্যাও বেড়েই চলেছে। মানব ইতিহাসে এমন দুর্দশা বা ক্রান্তিকালের অভিজ্ঞতা আগে কখনও মানব জাতির জীবনে ঘটেনি। দুই বিশ্বযুদ্ধও সারাবিশ্বকে এমন টালমাটাল করতে পারেনি। অথচ ছোঁয়াচে এই রোগটির কারণে মানব জাতির অস্তিত্ব রক্ষাই কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়েছে। মানুষের মানবিক মূল্যবোধ বলে আর কিছু থাকবে এমন ভরসা করা যাচ্ছে না। প্রতিটি মানুষই নিজের সুরক্ষায় বিচ্ছিন্ন হয়ে আত্মরক্ষায় নিমগ্ন। এই রোগ থেকে বাঁচার জন্য ওটাই প্রধান অবলম্বন বলে জোর প্রচার চলছে। এমতাবস্থায় কে কাকে সাহায্য করবে। আক্রান্ত ব্যক্তির পাশে খোদ নিজ আত্মীয় পরিজন পর্যন্ত ঘেঁষছে না। দূরত্ব বজায় রেখে দূর থেকে সহানুভূতি প্রকাশ করা ছাড়া তাদের সামনে বিকল্প উপায়ও নেই। প্রতিটি মানুষ নিজের জীবন রক্ষায় ব্যস্ত, আতঙ্কে প্রহর গুনছে কেবল। সামাজিক জীবন পরিত্যাগ করা ছাড়া এ মুহূর্তে সুরক্ষার বিকল্পও নেই। আমাদের সামষ্টিক সামাজিক জীবনাচার বিদ্যমান ব্যবস্থার কারণে এমনিতেই ভেঙে পড়েছে। এই রোগের আগমনে নিজেদের সুরক্ষায় জনবিচ্ছিন্নতা অপরিহার্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাণঘাতী রোগটি মানুষের সামাজিক জীবনাচারকে পুরোপুরি বিনাশ করে তুলেছে।

করোনাভাইরাসের উৎসমূলে বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর রাষ্ট্র চীন। এক সময়ের সমাজতান্ত্রিক দেশটি মতাদর্শ পরিত্যাগ করে এখন কঠোর পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত। পুঁজিবাদ কেবল মুনাফা বোঝে। এর বাইরে আর কিছুই বোঝে না। পুঁজিবাদ যে কত নৃশংস উপায়ে মুনাফার তাড়নায় অমানবিক ব্যভিচারী হতে পারে পুঁজিবাদী দেশগুলোর নানাবিধ তৎপরতায় সেটা অপ্রমাণিত থাকেনি। তাদের প্রকৃত স্বরূপটি নিজেদের কর্মকাণ্ডেই উন্মোচিত হয়ে পড়েছে। অতি উৎপাদন অতি মুনাফার লোভে পড়ে বিশ্বের পরিবেশ-প্রকৃতি দূষণ করে বিশ্বকে মনুষ্য বসবাসের অনুপযোগী করে ছেড়েছে পুঁজিবাদী দেশগুলো। করোনাভাইরাসের আগমনের পেছনে চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রবণতা নিশ্চয় ছিল। তেজস্ট্ক্রিয় বা রাসায়নিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে গিয়ে করোনাভাইরাসের উদ্ভব যে হয়নি তারও বা প্রমাণ কি? চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতার জন্য পরস্পর পরস্পরকে ঘায়েল করতে চেয়ে যদি এই মরণ ব্যাধির উদ্ভব ঘটে থাকে, সেটাও আমরা অস্বীকার করি কীভাবে।

চীনে সর্বপ্রথম ভাইরাসটির আগমনের বার্তা দিয়েছিলেন সে দেশেরই এক গবেষক-বিজ্ঞানী। এজন্য তাকে রাষ্ট্র কর্তৃক কম হেনস্তা হতে হয়নি। কিন্তু অচিরেই তার বার্তাটির সত্যতা প্রমাণিত হয়। ওই বিজ্ঞানীর কাছে চীনা কর্তৃপক্ষ আগাম বার্তাটির জন্য ক্ষমা বা দুঃখ প্রকাশ কোনোটিই করেনি। বিজ্ঞানীও দ্রুত করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এতে কি প্রমাণ হয় না চীন সরকার পুরো বিষয়টি জানত এবং তাদের কৃতকর্মেই ভাইরাসটির উদ্ভব হয়েছে। চীনের অভ্যন্তরের কোনো সংবাদ জানার উপায় নেই। তারা যা কিছু প্রকাশ করে বিশ্বের গণমাধ্যমগুলো সেগুলোই পরিবেশন করে। চীনে এযাবৎ প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের মৃত্যুসংবাদ বিশ্বের গণমাধ্যমে পরিবেশিত হয়েছে। প্রকৃত সত্য কিন্তু জানার উপায় নেই। অনেক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর রটেছে চীনের দেড় কোটি মানুষের মোবাইল সিম বন্ধ। এই দেড় কোটি মানুষের কী পরিণতি হয়েছে সে সংবাদ আমরা কখনও জানতেও পারব না। ব্যাধিটি সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার পর মৃতের সংখ্যা যেভাবে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে, রোগের খোদ উৎসমূল চীনে মৃতের সংখ্যা কীরূপ হতে পারে সেটা অনুমান করা অসাধ্য নিশ্চয় নয়!

বিলম্বে হলেও সরকারের তরফে বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে অবরুদ্ধ দেশে রোজ আনে রোজ খায় মানুষের দুর্দশার বিষয়েও সরকারের দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কায়িক শ্রমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। দিনমজুর, রিকশা শ্রমিক, নির্মাণ কাজের শ্রমিক, ফুটপাত ও রাস্তার হকার, বিভিন্ন বাসাবাড়িতে ঘুরে ঘুরে গৃহকর্মীরা কাজ করে। এরকম পাঁচ কোটি মানুষ দিনের উপার্জনে দিনের পেট চালায়। অবরুদ্ধ দেশে তারা শ্রমবাজারে শ্রম বিক্রি করতে পারছে না। গৃহবন্দি অবস্থায় তাদের দুরবস্থার অন্ত নেই। রাস্তায় অনেক রিকশাচালক নিরুপায়ে রিকশা নিয়ে বের হয়ে পুলিশের নির্দয় বেত্রাঘাতের শিকার হচ্ছে। আমাদের পুলিশ বরাবরই পরিস্থিতির মওকা গ্রহণে সিদ্ধহস্ত, দেশের এই ক্রান্তিলগ্নেও পুলিশের চাঁদাবাজি-অপকীর্তি থেমে নেই। খাদ্যপণ্যের দোকানগুলো থেকে দোকান খোলার অজুহাতে চাঁদা আদায় করছে। সরকারের নির্দেশ অমান্যকারীদের হয় নির্দয়ভাবে হেনস্তা করছে, নয়তো টাকার বিনিময়ে ছাড় দিচ্ছে। ৩১ মার্চ সরকার গরিব মানুষের জন্য খাদ্যপণ্য বিতরণের কথা ঘোষণা করেছে। তবে বাস্তবে সেটা কার্যকর করা কতটুকু সম্ভব? শহরের বস্তিগুলো থেকে দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের সব অনাহারী মানুষের জন্য সরকারি খাদ্য সাহায্য পৌঁছবে কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ নিশ্চয় আছে।

করোনাভাইরাস অজ্ঞাত ব্যাধি বলেই শনাক্তকরণ সহজ নয়। ইতোমধ্যে গুটি কয়েক স্থানে শনাক্তকরণের যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে। তবে সেটা অধিক মাত্রায় অপ্রতুল। কোনো সরকারি, বেসরকারি হাসপাতালে যে কোনো ধরনের রোগীকে গ্রহণ করা তো পরের কথা, ঢুকতে পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে না। বিনা চিকিৎসায় সাধারণ রোগে আক্রান্ত অগণিত মানুষ রোগযন্ত্রণা নিয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। করোনা আতঙ্কে দেশের চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোর অমানবিকতার যেন সীমা-পরিসীমা নেই। আমরা জানি করোনা রোগের প্রতিষেধক নেই। এখন পর্যন্ত আবিস্কৃত হয়নি। একমাত্র সচেতনতাই এই রোগ বিস্তার ঠেকাতে পারে। জনবিচ্ছিন্নতাই এই রোগ থেকে বাঁচাতে পারে। ছোঁয়াচে এই রোগ থেকে বাঁচতে গৃহবন্দি থাকার বিকল্প নেই। সেটা দেশের মোট জনসমষ্টির সংখ্যালঘুদের পক্ষে সম্ভব হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ দারিদ্র্যপীড়িতদের ক্ষেত্রে সম্ভব হবে না। সরকারি নির্দেশনা জারি করে মানুষকে গৃহবন্দি করা সহজ হবে, যদি তাদের বাঁচার জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। খাদ্যসামগ্রী পৌঁছানোর দায়িত্ব যেমন সরকারকে নিতে হবে তেমনি দেশের বিত্তবান এবং স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিতভাবেও করতে হবে। নয়তো করোনা থেকে বাঁচলেও না খেয়ে মরার দশায় পড়তে হবে অসহায় সংখ্যাধিক্য মানুষকে। এ কথাটা যেন আমরা ভুলে না যাই।

নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত