ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

বিপ্লবী রাজনীতির কাণ্ডারি

স্মরণ

বিপ্লবী রাজনীতির কাণ্ডারি

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৩ | ২২:৫৭

কমরেড মণি সিংহ ছিলেন আমাদের উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের কিংবদন্তি নেতা, তার অন্যতম স্থপতি। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ছিলেন মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সৃজনশীল বৈজ্ঞানিক মতাদর্শে দৃঢ় আস্থাবান একজন খাঁটি কমিউনিস্ট নেতা। এই বিপ্লবীর জীবনাদর্শ ও আমৃত্যু অক্ষয় বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের মাঝেই তাঁর কালজয়ী পরিচয় লিপিবদ্ধ। 

কমরেড মণি সিংহের জীবন-সংগ্রাম ছিল মেহনতি মানুষের মুক্তির জন্য এবং তিনি বিশ্বাস করতেন যে তার মধ্য দিয়েই সার্বিক মানবমুক্তি। ‘মুক্ত মানবের মুক্ত সমাজ’ তথা সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য আমৃত্যু তিনি লড়াই করেছেন। মানুষই ছিল তাঁর সাধনার কেন্দ্রবিন্দু। তিনি বলতেন যে প্রত্যেক কমিউনিস্টকে ‘বিপ্লবী মানবতাবাদে’ উদ্বুদ্ধ হয়ে শ্রেণি-সংগ্রামের ধারায় শোষণের সমাজকে উপড়ে ফেলে সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ অভিমুখীন সমাজবিপ্লব সাধনে আত্মনিবেদন করতে হবে। মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও মানবপ্রেমকে বিপ্লবী প্রয়াসের মাধ্যমে সমাজে সর্বজনীন করে তুলতেই তিনি তাঁর বিপ্লবী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছিলেন। এ দেশে ও বিশ্বে আজও সেই বিপ্লবী কর্মকাণ্ড অব্যাহত আছে। প্রবল প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে হলেও নবজাগরিত শক্তি নিয়ে তা অগ্রসর হচ্ছে।

বর্তমানে যখন অপরাজনীতি, ব্যবসায়িক রাজনীতি, হালুয়া-রুটির রাজনীতি, আত্মস্বার্থের রাজনীতি এবং ‘বাজার অর্থনীতির’ দানবীয় বিস্তারের মুখে ‘বাজার রাজনীতি’ সবকিছুকে গ্রাস করে চলেছে, যখন জাতির সামনে ‘রাজনীতি বাঁচাও’ আজ এক অগ্রগণ্য কর্তব্য হয়ে উঠেছে তখন জাতির সামনে ‘রাজনীতি বাঁচাও’-এর সংগ্রাম অতীব জরুরি হয়ে উঠেছে। ‘রাজনীতি বাঁচাও’-এর সংগ্রামে কমরেড মণি সিংহ আজ এক অজেয় প্রতীকী শক্তি হয়ে আছেন। কমিউনিস্ট আদর্শবোধই তাঁকে একজন বিশুদ্ধ, অনুপম, অনুকরণীয় দেশপ্রেমিক হওয়ার পথ করে দিয়েছে। সততা, ত্যাগ, আদর্শ-নিষ্ঠা, কঠোর শৃঙ্খলাবোধ, মানুষের প্রতি অকৃত্রিম দরদ, দায়িত্ববোধ, দেশমাতৃকার স্বার্থে আত্মস্বার্থ বিসর্জন, জনসেবা-দেশসেবাকে সাধনা হিসেবে গ্রহণ; প্রতিদিনের চিন্তা-কাজে মানবমুক্তি ও দেশপ্রেমের অধ্যয়ন, ছোট-বড় সব কাজে বিপ্লবী জীবনাদর্শের প্রতিফলন ঘটানোর নিরন্তর প্রয়াস কমরেড মণি সিংহের মাঝে দৃষ্টান্ত স্থানীয় রূপে বিরাজমান ছিল। এসব অমূল্য গুণের কারণেই তিনি আজও এদেশের রাজনীতিতে অনন্য সম্মানের স্থানে অধিষ্ঠিত। তাই কমরেড মণি সিংহ একজন শ্রেষ্ঠ ‘জাতীয় নেতা’ হয়ে উঠতে পেরেছেন।

কমরেড মণি সিংহকে আমি প্রথম দেখি ১৯৬৬ সালের মে মাসের এক সন্ধ্যায়, ঢাকার কল্যাণপুর এলাকায় গোপন ডেরায় অনুষ্ঠিত ছাত্র-কর্মীদের এক বৈঠকে। কমিউনিস্ট পার্টি তখন নিষিদ্ধ এবং তাঁকে কাজ করতে হচ্ছে আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যবস্থায়। পার্টির তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক শক্তি সংহত করার জন্য মহান মে দিবস উপলক্ষে ঢাকার ছাত্র-কর্মীদের এই সভায় আত্মগোপনে থাকা পার্টির কয়েকজন শীর্ষ নেতা উপস্থিত ছিলেন। কমরেড আজাদ নামে পরিচয় করিয়ে দেওয়া সাদা পায়জামার ওপর সাদা ফুল হাতা লম্বা কুর্তা-শার্ট গায়ে, ফর্সা, লম্বা, কালো চশমা পরা একজন কমরেড তেজোদীপ্ত কণ্ঠে অনেক কথা বলেছিলেন। পার্টির অন্য নেতারা ফিসফিস করে কানে কানে জানিয়েছিলেন যে তিনিই কমরেড মণি সিংহ। আমরা কমরেড মণি সিংহকে রূপকথার নায়কের মতো গণ্য করতাম। কল্পনার সেই বিপ্লবী নায়ককে কাছ থেকে স্বচক্ষে দেখতে পেয়েছি জানতে পেরে সেদিন প্রবলভাবে রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম।

১৯৬৭ সালে তিনি আন্ডারগ্রাউন্ড থাকা অবস্থাতে গ্রেপ্তার হয়ে যান। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি মুক্ত হয়ে আসেন। মণি সিংহকে এক নজর দেখার জন্য সবাই তখন পাগলপ্রায়। তাঁর সঙ্গে এবার আমি প্রকাশ্য সাক্ষাৎ পরিচয়ের এবং সামনাসামনি কথা বলার সুযোগ পাই। কিন্তু ১৯৬৯ সালের জুলাই মাসে তিনি আবার গ্রেপ্তার হয়ে যান। তাঁর এই স্বল্পকালীন মুক্ত থাকা অবস্থায় তিনি আমাদের নিয়ে বৈঠক করে অনেক কথার মধ্যে দুটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন। একটি ছিল–‘…মনে রাখবে, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান হলো আসন্ন আরও বড় সংগ্রামের ড্রেস রিহার্সেল মাত্র।’ অপর কথাটি ছিল–‘…আর্মড স্ট্রাগল ইস ইন থি এজেন্ডা নাউ’ (অর্থাৎ ‘সশস্ত্র সংগ্রামের বিষয়টি এখন সামনে’)।

আট মাস বন্দি থাকার পর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ জনগণ কমরেড মণি সিংহকে রাজশাহী জেল ভেঙে মুক্ত করে। তিনি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের কাজে নেমে পড়েন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কমরেড মণি সিংহের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘনিষ্ঠতা লাভ করে। তখন বেশ কয়েকবার তাঁর সঙ্গে আমার দেখা-সাক্ষাৎ হয়। আমরা বেশ কয়েকদিন একই বাসায় কাটিয়েছি। আমি ছিলাম প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা, ‘বিশেষ গেরিলা বাহিনী’র প্রথম দলের একজন কমান্ডার। তিনি আমার কাছে অস্ত্রশস্ত্র সম্পর্কে, যুদ্ধ কৌশল সম্পর্কে, গেরিলা দলগুলোর তৎপরতা সম্পর্কে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চাইতেন। এসব যেন তাঁর একান্ত আপন ভুবনের ব্যাপার। তাঁর সঙ্গে যখন আমার সশস্ত্র যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা হতো তখন মুখের দিকে তাকিয়ে যে উজ্জ্বল জ্যোতি দেখতে পেতাম তাতে আমার মানসচক্ষে ভেসে উঠত অস্ত্র কাঁধে ঝোলানো সাদা ঘোড়ায় সওয়ার গারো পাহাড় এলাকার টংক প্রথাবিরোধী সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহের সেনাপতি, চল্লিশ-পঞ্চাশ দশকের মণি সিংহের ছবি।

কমরেড মণি সিংহ ছিলেন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্যতম। তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীর অন্যতম সদস্য এবং কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক-সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। ৭০ বছর বয়সের এই মানুষটি ৯ মাস ধরে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক, সাংগঠনিক, আন্তর্জাতিক, আদর্শিকসহ বহুবিধ কাজে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রগতিমুখীনতা নিশ্চিত করার জন্য, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে দেশি-বিদেশি শক্তির সমাবেশ ও ঐক্য গড়ে তুলতে এবং জাতির এই মরণপণ সংগ্রামকে বিজয়ের পথে নিয়ে যেতে কমরেড মণি সিংহ অমূল্য অবদান রেখেছেন। গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার কাজে ‘বেইস ক্যাম্পে ও রণাঙ্গনেই’ আমার সময় কাটত বেশি। কমরেড মণি সিংহ ‘বেইস ক্যাম্পে’ এক-আধবার এসেছিলেন। আমাকেও সময়ে-সময়ে বিশেষ কাজে পার্টি হেডকোয়ার্টারের বাসায় দু-তিন দিনের জন্য যেতে হতো। তখন তাঁর সঙ্গে দেখা হতো। আমার সঙ্গে দেখা হলেই কমরেড মণি সিংহের উচ্ছ্বাস বেড়ে যেত। স্পষ্টই বুঝতে পারতাম, আমাকে অস্ত্রধারী অবস্থায় দেখে তাঁর চোখ দুটি জ্বলজ্বল করে উঠেছে। যেন তাঁর যৌবন তিনি ফিরে পেয়েছেন।

স্বাধীনতার পর আরও অনেক কাছে থেকে তাঁকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। অগণিত সভায়, প্রকাশ্য-গোপন বৈঠকে, আন্ডারগ্রাউন্ডে এক ডেনে, জেলা সফরে, জনসভায়, বিদেশ সফরে, পার্টির সমাবেশে, কৃষক সমিতি-ক্ষেতমজুর সমিতির কর্মসূচিতে তাঁর সঙ্গে কাজ করেছি। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে এবং একপর্যায়ে পার্টির কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীতে তাঁর সঙ্গে কাজ করার সুযোগও আমার হয়েছে। তাঁকে কাছ থেকে দেখেছি, অনেক কিছু শিখেছি। তাঁর মাঝে আমি খুঁজে পেয়েছি অসাধারণ এক ‘মানুষ’-কে, একজন ‘জাত বিপ্লবী’-কে।

আমার দুর্লভ সুযোগ হয়েছিল তাঁর সঙ্গে অনেকদিন জেলখানায় একই ওয়ার্ডে পাশাপাশি সিটে থাকার। সেটি ছিল ১৯৭৭ সালের কথা। আমার কারাজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন ছিল কমরেড মণি সিংহের নিবিড় সান্নিধ্য পাওয়া। বিপ্লবী রাজনৈতিক জীবনবোধের নিখুঁত প্রতিফলন তাঁর মাঝে তখন দেখেছি। শৃঙ্খলাপূর্ণ প্রাত্যহিক জীবনাভ্যাস, শিক্ষা-প্রশিক্ষণ-বিনোদন, বন্দিদের প্রতি মমত্ববোধ, সাধারণ কয়েদিদের প্রতি প্রীতিময় আচরণ– ৭৫ বছর বয়সী মণি সিংহের কারাগারের দিনগুলো এসব বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিল। সঙ্গে সঙ্গে অধিকার ও আত্মমর্যাদার প্রশ্নে কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁর নিরন্তর লড়াই চালানোর প্রয়াসও আমি দেখেছি। আমাদের বন্দি করে রেখেছ– তাতে কী? এখানেও লড়াই চলবে! কারাগারেও অব্যাহত থাকবে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড। হয়তো অন্য পথে, অন্য পন্থায়। জেলখানার বন্দি দিনগুলোকেও কাজে লাগাও– বই পড়ো, পাঠচক্র চালাও, আলোচনা সভা করো। উন্নত পরিবেশের জন্য জেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দরবার করো। রেশন কেন খারাপ এলো? পত্রিকা আসতে বিলম্ব হয় কেন? ডাক্তার রাউন্ডে থাকে না কেন? যা বিদ্যমান তাকেই ধ্রুব ধরে নিয়ে, ‘বাস্তবতা’ বলে অজুহাত দিয়ে চলতি অবস্থার কাছে আত্মসমর্পণ করা চলবে না! এসবের মাঝে প্রতিবিম্বিত হতে দেখেছিলাম একজন প্রকৃত বিপ্লবীর অন্তরের অবিরাম সংগীত মূর্ছনার মর্মবাণী। 

কমরেড মণি সিংহ তেমন কোনো বড় মাপের মার্কসবাদী একাডেমিশিয়ান বা পণ্ডিত ছিলেন না। তাত্ত্বিক খুঁটিনাটিতেও তিনি বিশেষজ্ঞ ছিলেন না। কিন্তু তিনি মার্কসবাদকে গভীরতা দিয়ে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তিনি প্রজ্ঞার সঙ্গে তত্ত্বকে প্রয়োগ করতে পারতেন। তাঁর জীবন পর্যালোচনা করলে তাই দেখা যায় যে পার্টির অভ্যন্তরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে মতপার্থক্য দেখা দিলে প্রায় সবসময়ই তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে সঠিক অবস্থান নিয়েছিলেন। জনসেবা-দেশসেবাকে একটি সাধনা হিসেবে গ্রহণ করা, চিন্তায় ও কাজে প্রতিনিয়ত মানবমুক্তি ও দেশপ্রেমের অধ্যয়ন করা, নিত্যদিনের ছোট বড় সব কাজে বিপ্লবী জীবনাদর্শের প্রতিফলন ঘটানোর নিরন্তর প্রয়াস– এসব গুণ কমরেড মণি সিংহের মাঝে দৃষ্টান্তস্থানীয় রূপে বিরাজমান ছিল। এসব গুণ তাঁকে ইতিহাসে একজন ‘জাতীয় নেতার’ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। কমরেড মণি সিংহ, সালাম, তোমাকে সালাম!

 মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা, বামপন্থি আন্দোলনের অন্যতম নেতা

আরও পড়ুন

×