বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও লেখক অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালকে হত্যাচেষ্টা মামলায় হামলাকারী ফয়জুল হাসান ফয়েজকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এ জন্য তার ওপর মায়া হয় বলে মন্তব্য করেছেন ড. জাফর ইকবাল। তার ওপর ব্যক্তিগত কোনো রাগ নেই বলেও এক প্রতিক্রিয়ায় সমকালকে জানিয়েছেন তিনি।

মঙ্গলবার দুপুরে সিলেট বিভাগীয় সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনালের বিচারক নুরুল আমীন বিপ্লব এ রায় দেন। রায় ঘোষণার পর বিকেলে সমকালের সঙ্গে কথা বলেন অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) সাবেক শিক্ষক ড. জাফর ইকবাল বলেন, এই ছেলেটার (ফয়েজ) ওপর ব্যক্তিগতভাবে আমার কোনো রাগ নেই। দেশের একটা আইন আছে। সে একটা কাজ করেছে। তাকে তো শাস্তি পেতেই হবে। কিন্তু আমার ভেতরে এমন কোনো আনন্দও নেই যে, খুব ভালো হয়েছে। মায়া হয়। এতদিন ধরে সে বেচারা জেলখানায় থাকবে, দিনের পর দিন, বছরের পর বছর।

প্রধান আসামির বিরুদ্ধে রাগ না থাকলেও ফয়েজকে যে বা যারা জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করেছেন, তাদের ওপরে ক্ষোভ রয়েছে ড. জাফর ইকবালের। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যে মানুষগুলো বা যে সিস্টেম তাদের রেডিকেলাস (মৌলবাদী) করে, জঙ্গি তৈরি করে দেয় যে, আমাকে বা আমার মতো অন্য আরেকজনকে মারলে তারা বেহেশতে যাবে, সেই মানুষগুলোর ওপর আমার ক্ষোভ আছে। কাজেই ব্যক্তিগতভাবে তাকে শাস্তি দিয়ে আমার ভেতরে কোনো আনন্দ নেই। যদি ওই ধরনের মানুষগুলোকে আমরা দেশ থেকে ইয়ে করতে পারতাম… ওই ধরনের মানুষের প্রচারণা বন্ধ করতে পারতাম, তাহলে হয়ত আমি শান্তি পেতাম।

চাঞ্চল্যকর এ মামলায় ফয়েজকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি তার বন্ধু সোহাগ মিয়াকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন বিচারক। এছাড়া মামলা থেকে ফয়েজের বাবা আতিকুর রহমান, মা মিনারা বেগম, মামা ফজলুর রহমান ও ভাই এনামুল হাসানকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন>> জাফর ইকবালকে হত্যাচেষ্টা মামলায় একজনের যাবজ্জীবন, খালাস ৪

গত ২২ মার্চ উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে বিচারক রায়ের তারিখ নির্ধারণ করেন। গত ১০ মার্চ চাঞ্চল্যকর এই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। এই মামলায় মোট ৫৬ জন সাক্ষীর মধ্যে ৩৫ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। এরপর ২১ ও ২২ মার্চ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। এই মামলার ছয় আসামির মধ্যে ফয়েজ ছাড়া বাকি পাঁচজন জামিনে ছিলেন। যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বিচারক।

২০১৮ সালের ৩ মার্চ বিকেলে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবি) ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চে একটি অনুষ্ঠান চলাকালে ড. জাফর ইকবালের ওপর হামলা হয়। মাদ্রাসাছাত্র ফয়েজ ছুরি দিয়ে জাফর ইকবালের মাথা ও ঘাড়ে উপর্যুপরি আঘাত করেন। এ সময় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছাত্র-শিক্ষকরা হামলাকারীকে হাতেহাতে ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করেন।

এদিকে জাফর ইকবালকে আহত অবস্থায় প্রথমে নগরীর এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে ঢাকায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

এ ঘটনায় শাবির রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ ইশফাকুল হোসেন বাদী হয়ে মহানগর পুলিশের জালালাবাদ থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করেন। ২০১৮ সালের ১৬ জুলাই ফয়েজসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জালালাবাদ থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম। পরে এই বছরের ৪ অক্টোবর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়।