ঢাকা বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

প্রযুক্তি­

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মানবতার ভবিষ্যৎ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মানবতার ভবিষ্যৎ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না জানলে মানবসভ্যতার ক্ষতি হতে পারে সংগৃহীত

নাভিদ সালেহ

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ২৩:২০

প্রযুক্তি দুনিয়ার সর্বাধিক আলোচিত বিষয় আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এর ক্ষমতা, বিকাশের সম্ভাবনা ও শঙ্কা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে গবেষকশ্রেণি, এমনকি দার্শনিকদেরও ভাবিয়ে তুলেছে। কী এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা? মানবমস্তিষ্কের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য আর বিভেদ কোথায়? অর্থনীতি, সমাজনীতি, এমনকি বিজ্ঞানকে প্রভাবিত করার ক্ষমতাই বা এর কতটুকু? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা লেখকের মূল গবেষণাক্ষেত্র না হলেও এ বিষয়ে একটি সাধারণ ধারণা দিতে দর্শন, ভাষাতত্ত্ব ও হালের বিতর্কের আলোকপাত থাকছে এই সম্পাদকীয়তে। 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জনক হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন ম্যাকার্থি ২০০৭ সালে বলেছেন, কম্পিউটার যখন মানব বুদ্ধিমত্তাকে সিমুলেট বা অনুকরণ করতে সক্ষম হয়, তখন সেই মেশিনকে ইন্টেলিজেন্ট বা বুদ্ধিমান বলা চলে। তিনি বলেন, বুদ্ধিমত্তা হলো মানুষের কম্পিউটেশনাল বা গণনামূলক ক্ষমতা, যা তাকে সিদ্ধান্ত নিতে ও কাজ সম্পাদনে সমর্থ করে তোলে। তবে এ সংজ্ঞা নিয়ে দার্শনিক বিতর্ক রয়েছে; সে বিষয়ে একটু পরে আসছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কী করে কাজ করে তা পর্যালোচনা করলে এর পরিচয়টি আরেকটু স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

কম্পিউটার আজ বিপুলসংখ্যক উপাত্ত ধারণ ও দ্রুততার সঙ্গে বিশ্লেষণ করতে সক্ষম। যন্ত্রটি নানা ধরনের উপাত্ত, যেমন– সংখ্যা, শব্দ, স্থিরচিত্র ইত্যাদি ০ ও ১ এই দুটি সংখ্যার সমন্বয়ে উপাত্তে রূপান্তরিত ও স্টোর বা সংরক্ষণ করে থাকে। যেহেতু আধুনিক কম্পিউটার অধিক তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করতে সক্ষম, এই বিপুল তথ্য থেকে পরিসংখ্যান তত্ত্ব খাটিয়ে উপাত্তের মধ্যে থাকা প্যাটার্ন বা নকশা খুঁজে বের করা যায়। যত বেশি উপাত্ত থাকবে, প্যাটার্ন তত নিখুঁত হবে। উদাহরণ দেওয়া যাক। কম্পিউটার যদি একটি মাত্র গোলাপের ছবি স্টোর করে রাখে, সে ক্ষেত্রে ভিন্ন আরেকটি ফুল, যেমন– রজনীগন্ধার কোনো ছবি দিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলে, সেটিও যে ফুল এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে তার বেগ পেতে হবে। তবে একই কম্পিউটারে এক লাখ নানা জাতের ফুলের ছবি সঞ্চিত থাকলে তার বিশ্লেষণসাপেক্ষে রজনীগন্ধার পরিচয় হয়তো চিহ্নিত করা যেতেও পারে। এই প্যাটার্ন-ম্যাচিং প্রক্রিয়ার পেছনে সংখ্যা ও পরিসংখ্যানের কারসাজি চলে। ছবি যেহেতু বাইনারি সংখ্যায় পর্যবসিত হয়, রজনীগন্ধার ছবির প্রতিনিধিত্বকারী সংখ্যামালা কম্পিউটারে স্টোর করা ছবির সংখ্যা-বিবরণের সঙ্গে তুলনা করা যায়। পরিসংখ্যান ব্যবহার করে গণনা হয়, কোন ছবির সঙ্গে রজনীগন্ধার মিল সবচেয়ে বেশি, অর্থাৎ পরিসংখ্যানগত ত্রুটি কোনটির কম– এভাবে সেই ছবিটির পরিচয় নির্ধারণ করতে পারে কম্পিউটার। সহজ কথায়, যে কোনো উপাত্ত নিউমেরিকাল কোডে রূপান্তর করার মাধ্যমে দ্রুত সে কোড পড়া এবং তা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে এই যন্ত্র। সিদ্ধান্ত একটি যন্ত্রের কাছ থেকে আসছে বিধায় একে বলা হয়ে থাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।  

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শুরুর ইতিহাসটি অভিনব। তখন চল্লিশের দশকের শুরুর দিক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তীব্রতা ছড়িয়ে পড়েছে। এক পক্ষ যদি অন্য পক্ষের গতিবিধি অনুমান করতে পারে, তবে যুদ্ধে প্রাধান্য তৈরি হবে। গোপনে তথ্য ও বার্তা বিনিময় চলছে। যুক্তরাষ্ট্র ২৯ জন নাভাহো আদিবাসীকে নিয়োগ দিয়েছে অলিখিত নাভাহো ভাষা ব্যবহার করে কোড আদান-প্রদানের জন্য। যেখানে তিন বাক্যের ইংরেজি কোড ভাঙতে ৩০ মিনিট সময় লাগত, নাভাহো কোড টকারেরা সে কোড ভাঙছেন ২০ সেকেন্ডে আর তাদের কোড জার্মানরা পড়তে অপারগ। জার্মানিও পিছিয়ে নেই। বার্তা আদান-প্রদানের জন্য ‘এনিগমা’ নামের কোডিং যন্ত্র তৈরি করেছে তারা। পোল্যান্ডের গণিতবিদরা এনিগমার কোড প্রথমে ভেঙে ফেলতে পারলেও এনিগমাকে আরও সমর্থ করে তোলে জার্মানি। মিত্রপক্ষ তখন হিটলারের গতিবিধি সম্পর্কে পুরোপুরি অন্ধকারে চলে গেছে। এ সময় যুক্তরাজ্যের বাকিংহামশায়ারের ব্লেচলি পার্কের অতিগোপন তথ্য বিশ্লেষণ কেন্দ্রে কাজ নেন মেধাবী গণিতজ্ঞ অ্যালেন টুরিং। তিনি ‘বম্ব’ নামের একটি কোড-ব্রেকিং যন্ত্র তৈরি করেন, যা মিত্রপক্ষকে ব্যাপক সুবিধা এনে দেয়। যুদ্ধ শেষে অ্যালেন টুরিং উপাত্ত বিশ্লেষণের ওপর জোর দেন। ১৯৫০ সালে ‘কম্পিউটিং মেশিনারি অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রথম আলোকপাত করেন এবং ‘টুরিং টেস্ট’ নামক একটি পরীক্ষা প্রবর্তন করেন। টুরিং টেস্ট অনুযায়ী একজন পর্যবেক্ষক যদি পর্দার আড়ালে থাকা একটি যন্ত্র ও একজন মানবের বুদ্ধিমত্তার ভেতর পার্থক্য করতে না পারেন, তবে সেই যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তা রয়েছে বলে ধরা যেতে পারে। সেই থেকে শুরু। পরবর্তী পাঁচ দশক ধরে যন্ত্রকে বুদ্ধিমান করে তোলার কাজে নিয়োজিত হয়েছেন অসংখ্য বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ।         

মোদ্দাকথা হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপুল তথ্য থেকে স্বল্পসংখ্যক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারে। এখানেই দার্শনিক বিতর্কের শুরু। ২০২৩ সালে নিউইয়র্ক টাইমসের একটি নিবন্ধে নোম চমস্কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে আদতে মানব বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তুলনীয় নয়, সে যুক্তি দিয়েছেন। তিনি বলছেন, মানবমস্তিষ্ক স্বল্প তথ্য ব্যবহার করে বিপুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে; অযুত উপাত্তের প্রয়োজন পড়ে না। চমস্কি ভাষাবিদ। তাই উদাহরণ হিসেবে একটি শিশুর ভাষা শেখার কথা তুলেছেন। তিনি বলছেন, একটি শিশু কয়েকটি শব্দকে সম্বল করে ব্যাকরণের মতো অসংখ্য নিয়মের ভাগাড়কেও আয়ত্তে নিয়ে আসে। ব্যাকরণের সব নিয়ম স্টোর করে, গণিতের জটিল সমীকরণ সমাধান করে শিশুটিকে ভাষা চর্চা করতে হয় না। তার বুদ্ধিমত্তা তাই শক্তিশালী একটি কম্পিউটারের অনেক ওপরে।

অন্যদিকে ম্যাকার্থি বুদ্ধিমত্তাকে একান্তভাবে একটি গাণিতিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন। চমস্কি ও তাঁর সহগবেষকরা ‘রিজন’ বা যুক্তি প্রদানের ক্ষমতা, নীতিজ্ঞান ইত্যাদিকে বুদ্ধিমত্তার কেন্দ্রে খুঁজে পাচ্ছেন। তারা বলছেন, যন্ত্র পরিসংখ্যান খাটিয়ে সিদ্ধান্ত দেয়, তবে তার দায়ভার নেয় না। বলে, ‘আমার কাছে থাকা উপাত্তের ভিত্তিতে আমি এই সিদ্ধান্ত দিচ্ছি।’ অর্থাৎ উপাত্ত পাল্টালে তার সিদ্ধান্তও পাল্টাতে পারে। অন্যদিকে মানুষ স্বল্পসংখ্যক উপাত্ত থেকে শুধু সিদ্ধান্তই দেয় না, তার ব্যাখ্যাও তৈরি করে। মানুষ রিজন করতে জানে, জানে সৃষ্টি করতে। সে চিন্তাশীল জীব। ষোলো শতকে রেনে দেকার্ত তাই বলেছিলেন, ‘আমি চিন্তা করি বলেই আমার অস্তিত্ব আছে।’ রিজনিং নিয়ে টমাস হবস ‘লেভিয়াথানে’ মানবক্রিয়ার সংযমের ক্ষমতার কথা তুলেছেন, ডেভিড হিউম ট্রিটিসে উল্লেখ করেছেন মানব অনুভূতির খুঁটিনাটি। এ বিষয়ে দিগ্গজ ছিলেন ইমানুয়েল কান্ট, যিনি রিজনিং-এর শ্রেণিভেদ করেছেন তাত্ত্বিক, নৈতিক, প্রায়োগিক ও নান্দনিক এই চারভাগে আর প্রবর্তন করেছেন রিজনিং-এর সর্বজনীন বিধিমালা। দার্শনিক বিচারে যন্ত্র তাই বুদ্ধিমত্তা ধারণ করে বলে প্রমাণ দেওয়া শক্ত। 

দার্শনিক তর্ক যাই থাকুক না কেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি আগামী পৃথিবীতে থেকে যাবে। যে কোনো নতুন প্রযুক্তি এলে তার পক্ষে যেমন একদল হুজুগে জোটে যায়, তেমনি বিপক্ষেও অহেতুক ভয় তৈরির চেষ্টা দেখা যায়। পারমাণবিক শক্তি নিয়ে এমনটিই দেখা গেছে। দেখা গেছে হালের জেনেটিক্স বা ক্লোনিং নিয়েও। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি গাণিতিক প্রক্রিয়া, যা বিপুল পরিমাণ উপাত্ত বিশ্লেষণ করে, প্যাটার্ন চিহ্নিত করে সিদ্ধান্ত দিতে সক্ষম। এই প্রযুক্তিকে আমরা কীভাবে ব্যবহার করব, তার ওপর নির্ভর করছে এর সম্ভাবনা কিংবা ঝুঁকি। 

একজন পরিবেশ বিজ্ঞানী হিসেবে লেখক মনে করেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে উপেক্ষার উপায় যেহেতু নেই, এর ক্ষমতাকে কাজে লাগানোই উত্তম। এতে যদি চিকিৎসক নিখুঁত স্বাস্থ্য সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, বিজ্ঞানী পারেন নতুন আবিষ্কারের ধারণা তৈরি করতে, আর পরিবেশ কুশলীরা জটিল বৈশ্বিক উষ্ণায়ন সমস্যার অভিনব সমাধান খুঁজে পান, তাতে ক্ষতি কী? এটি সত্যি যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একজন রবীন্দ্রনাথকে অনুকরণ করতে পারে মাত্র, তাঁর লেখনী ছাড়া নতুন ধারার সাহিত্য এখনও সে সৃষ্টি করতে সক্ষম নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাই মানুষের দাস, তার অধিপতি নয়।    

নাভিদ সালেহ: যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিনে পুরঃ, স্থাপত্য ও পরিবেশ কৌশল অনুষদের অধ্যাপক 
 

আরও পড়ুন

×