সব 'বিউটিফুল' স্থাপনা 'ফ্রুটফুল' নয়

 প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০১৯ | আপডেট : ৩১ মার্চ ২০১৯      

 শেখ রোকন

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে গিয়েছিলাম নেদারল্যান্ডস, একটি আবাসিক কর্মশালায় যোগ দিতে। আমন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান 'আইএইচই ডেলফট'। নদী ও পানি নিয়ে নমস্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্বব্যাপীই একে এক নামে চেনে। বাংলাদেশেও যারা নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করে আসছেন, তাদের কাছে এর ব্যাপারে আলাদা টিকা-ভাষ্য দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বস্তুত আমাদের দেশের নদী ও পানি বিশেষজ্ঞ এবং গবেষকদের অনেকেই এর 'অ্যালামনাই'। জাতিসংঘের দিক থেকে একে আখ্যা দেওয়া হয় 'ফ্লাগশিপ' প্রতিষ্ঠান হিসেবে। অর্থাৎ জাতিসংঘ 'পানি পরিবারের কর্তা' প্রতিষ্ঠান।

এমন একটি গুরুগম্ভীর প্রতিষ্ঠানে আমাদের মতো 'নন-একাডেমিক' নদী গবেষকদের আমন্ত্রণ জানানোর মূল উদ্দেশ্য নদী বিষয়ে সামাজিক জ্ঞান বিনিময় করা। নেদারল্যান্ডস যেমন পানি ব্যবস্থাপনায় উৎকর্ষ সাধন করেছে, তাদের মনে হয়েছে বাংলাদেশও তেমন নদী ও পানি ব্যবস্থায় লোকায়ত জ্ঞানের দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে।
এতদিন আমরাসহ গোটা বিশ্ব ডাচদের কাছে প্রকৌশলগত নদী ব্যবস্থাপনা শিখেছে। এখন হাওয়া ঘুরতে শুরু করেছে। তারা মনে করছে, কেবল প্রকৌশলগত উৎকর্ষই শেষ কথা নয়। এর সঙ্গে লোকায়ত জ্ঞান, ঐতিহ্যগত প্রযুক্তি ও সামাজিক উপলব্ধিও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের আমন্ত্রণ সেই উদ্দেশ্য থেকেই।

নেদারল্যান্ডস ও বাংলাদেশের পানি-সম্পর্ক বহু পুরনো, বলা বাহুল্য। দেশটিতে ১৯৫৩ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যা থেকে শিক্ষা নিয়ে পানি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের জন্য সে বছরই যাত্রা শুরু করেছিল আইএইচই ডেলফট। মজার ব্যাপার, এর 'আন্তর্জাতিক' হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের অবদান।

১৯৫৫ সালে নেদারল্যান্ডসে নিযুক্ত তৎকালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত প্রস্তাব দেন, তার দেশ থেকে কিছু প্রকৌশলী সেখানে প্রশিক্ষণ নিতে পারে। যাতে করে ওই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বন্যাপ্রবণ এলাকায় কাজে লাগানো যায়। ১৯৫৭ সালে তৎকালীন পাকিস্তান থেকে যাওয়া প্রথম ব্যাচের প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়েই নেদারল্যান্ডসের জাতীয় প্রতিষ্ঠান 'ডেল্টা ওয়ার্কস' হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক 'আইএইচই' বা ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হাইড্রোলিক অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং। আন্তর্জাতিক সম্ভাবনা দেখে পরবর্তীকালে যুক্ত হয় ইউনেস্কো।

বাংলাদেশ থেকে আমন্ত্রণ জানানো দলটি জন্য ডাচ গবেষকদের একটি দলের সঙ্গে একই বাসায় থাকা, খাওয়া ও আলোচনার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে ছিল পরিদর্শনের ব্যবস্থা। দেখলাম, তাদের পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে নির্মিত স্থাপনাগুলো এখনও সচল এবং নদী ও পানি ব্যবস্থাপনায় সেবা দিয়ে চলেছে সাফল্যের সঙ্গে। অথচ আমাদের দেশে একই প্রযুক্তিতে তারও পরে নির্মিত নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক স্থাপনাগুলোর বেশিরভাগই অকেজো।

ডাচদের এমনই একটি স্থাপনা আমাদের দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল রটারড্যাম হারবারে। নৌপথ ব্যবস্থাপনায় কতটা সুচারু হতে পারে, তার জন্য বিশ্বব্যাপীই উদাহরণ হয়ে আছে এই 'মাজলাঙ্ক ইয়ারিং'। ওই এলাকার নাম মাজলাঙ্ক; আর ইংরেজি 'ব্যারিয়ার' ডাচ ভাষায় 'ইয়ারিং'। সে এক বিরাট ব্যাপার। নদীর দুই পাশে দুটি অতিকায় স্টিলের বাহু তৈরি করা হয়েছে। একেকটি বাহুর মাথায় হাতুড়ির আকারে নিরেট স্টিল। যখন ডাঙায় থাকে, দূর থেকে দেখলে বিরাট ঘর মনে হয়। গাইড ব্যাখ্যা করছিলেন, একেকটি বাহু যদি খাড়া করা যায়, তাহলে দৈর্ঘ্যে আইফেল টাওয়ারের সমান দেখাবে।

এই স্থাপনার কাজ হচ্ছে, জোয়ারের সময় নদীর দুই পাশ থেকে দুই বাহু এনে নদীপথ বন্ধ করে দেওয়া। যাতে করে জোয়ারে পানি মূল ভূখণ্ডে ঢুকে প্লাবন না হয়। আমাদের এখানে যেমন 'বন্যা নিয়ন্ত্রণ' করতে গিয়ে নৌ-চলাচলই বন্ধ করে দেই, সেখানে তেমন ঘটেনি। জোয়ার-ভাটা যাই হোক, জাহাজ সমুদ্র থেকে অভ্যন্তরীণ নৌপথে প্রবেশের সময় ওই বাহু দুটি খুলে দেওয়া হয়।

ডাচ-বাংলাদেশ দ্বিদেশীয় কর্মশালার সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. আনা বেসেলিঙ্কও আমাদের সঙ্গে ছিলেন। মাজলাঙ্ক ইয়ারিং দেখতে দেখতে তার সঙ্গে টুকটাক আলাপ করছিলাম। বললাম, নদীতে নির্মিত এ ধরনের বড় বড় স্থাপনা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী? তিনি বললেন, পানি ব্যবস্থাপনার এ ধরনের প্রকৌশলগত দিক দেখে দ্রুতই মুগ্ধ হওয়া ঠিক হবে না।

বাংলায় বললাম, একই কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে! তিনি ভুরু কুচকে বললেন, নিশ্চয়ই কোনো বাংলা প্রবাদ! এর অর্থ জানতে চাই। বললাম, এটা আসলে রামায়ণের সংলাপ। কারো মুখে হঠাৎ উল্টো কথা শুনলে প্রবাদের মতো ব্যবহার করি আমরা। তার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক? তার ভ্রুর কুঁচকানি তখনও মিশে যায়নি। বললাম, বাংলাদেশে আমরা নদীতে বড় বড় স্থাপনার ধারণা ডাচদের কাছ থেকেই ধার করেছি। আর এখন আপনি বলছেন, দ্রুত মুগ্ধ না হতে!

তিনি কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইলেন। তারপর মুচকি হেসে বললেন, অল দ্যাট বিউটিফুল আর নট অলওয়েজ ফ্রুটফুল। নদীতে নির্মিত সব 'বিউটিফুল' ইঞ্জিনিয়ারিংই সবসময় 'ফ্রুটফুল' হয় না। সঙ্গে যোগ করলেন, যদিও মাজলাঙ্ক ইয়ারিংয়ের সঙ্গে মেলানো যাবে না। ব-দ্বীপের নৌপথ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে উৎকর্ষের অন্যতম উদাহরণ এই স্থাপনা। বলার সময় তার মুখ ঝলমল করছিল। পড়ন্ত বিকেলের রৌদ্রে না ডাচ প্রকৌশলগত ব্যবস্থাপনার গৌরবে, ভালোভাবে দেখা হয়নি। কারণ আমি তখন নদীর ওপারে সারি সারি উইন্ডমিল শোভিত দিগন্তের দিকে তাকিয়ে নিজের দেশের কথা ভাবছিলাম। নদী প্রকৌশলের ক্ষেত্রে আমরা কেবল 'বিউটিফুল' স্থাপনাই নির্মাণ করে গেছি; কতখানি 'ফ্রুটফুল' তা ভাবার প্রয়োজন বোধ করিনি।