ভুরভুরিয়ার 'ওষুধ'

 প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০১৯      

 শেখ রোকন

আমাদের বহনকারী ট্যুরিস্ট বাস যেখানে থামল, সেটা না বাজার না বিরান। শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সড়কের দুই পাশে সারি সারি চা বাগান; সড়কের পাশে দুই-তিনটি দোকান। মূল আকর্ষণ ফিনলে চায়ের 'হোল সেল' কাউন্টার। সেটাকে ঘিরেই আরও কয়েকটি দোকান গড়ে উঠেছে। সড়কের পাশে একটি টেবিল সাজিয়ে সেখানে আনারস বিক্রি করছেন একজন। যেসব বাস বা গাড়ি থামছে, তার যাত্রীদের নজর অবশ্য আনারস নয়, চায়ের দোকানের দিকেই বেশি।

আমরা লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে মৌলভীবাজারের মোকামবাজারের দিকে ফিরছিলাম। বনে গিয়ে আমি তেমন আনন্দ পাই না, যতটা পাই নদী বা অন্যান্য জলাশয়ের কাছে গিয়ে। সেদিন আবার সকাল থেকে রোদে ঘোরাঘুরি করে লাউয়াছড়ায় গিয়ে মাথা ধরেছিল। মনও কেন একটু খারাপ ছিল, পরে বলছি। সবাই হৈ হৈ করে নেমে গেল চা পাতা কিনতে। আমি চীনা নদীকর্মী ঝ্যাঙ চেঙকে বললাম, চলো, আমরা ওদিকটা হেঁটে আসি।

সড়কের কাছেই একাত্তরের বধ্যভূমি, বিজিবির খেলার মাঠ। আর চারদিকে ছড়ানো চা বাগান। তার ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে বয়ে চলছে একটি ছোট্ট নদী। পাড় ধরে সার বেঁধে ফুটে আছে নানা রঙের ভাটফুল। অদূরে একটি শিমুল গাছে হেলান দেওয়া কালীমূর্তি। চা-বালারা নদীতে স্নান সারছে। তাদের কলকাকলি, সড়কের কোলাহলের মধ্যে গোধূলি নেমে আসছে সন্তর্পণে। এমন প্রায় অপার্থিব মুহূর্তে দেখা হয় ভুরভুরিয়ার সঙ্গে।

মন খারাপের কারণ ছিল। কোথাও বেড়াতে গেছি, আর সেখানকার নদী না দেখে ফিরে এসেছি- গত দেড় দশকে এমন ঘটেনি। ঠিক সেটাই ঘটতে যাচ্ছিল গত মাসে, মার্চে, শ্রীমঙ্গল সফরে। নদী সংকটের প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানবিষয়ক কর্মশালায়। তিন দিন টানা ও ঠাসা কর্মসূচি, সকাল থেকে সন্ধ্যা। একদিন মাঠ পর্যায়ের পরিদর্শন হাইল হাওরের বাইক্কাবিলে; কিন্তু গোপলা নদী সেখান থেকে বেশ দূর। কয়েকটি দেশের অংশগ্রহণকারীতে সমৃদ্ধ এই আন্তর্জাতিক আয়োজনে কর্মসূচির হেরফেরেরও সুযোগ নেই।

ইচ্ছে ছিল লংলা দেখতে যাব আবার। সকাল বা সন্ধ্যায় দুসাই রিসোর্ট থেকে ৩০ কিলোমিটার পথ গিয়ে নদী দেখে আবার ফিরে আসা কঠিন। যাই হোক না কেন মনু নদী না দেখে ফিরব না- মনের মধ্যে পুষে রেখেছিলাম। এর মধ্যে ভুরভুরিয়ার সঙ্গে দেখা। নদীটিকে আরও একবার দেখেছিলাম বছর ছয়েক আগে, টি বোর্ড রিসোর্টের কাছে।

ভুরভুরিয়া বালিসিরা টিলা থেকে উৎপন্ন হয়ে হাইল হাওরে মিশেছে। সারাবছর পানি থাকে, মোহনার দিকে মাছও মেলে। এর বড় উপযোগিতা চা শ্রমিকদের গৃহস্থালি কাজে। সাম্প্র্রতিক বছরগুলোতে নদীটিতে বালু উত্তোলনের উৎপাত বেড়েছে। ফলে একদিকে কাঠামো নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে কমছে প্রবাহ। ভুরভুরিয়া স্থানীয়ভাবে 'ছড়া' নামে পরিচিত। কিন্তু যে নামেই পরিচিত হোক, প্রাকৃতিক প্রবাহমাত্রই নদী। আর ছড়া বা খাল নামে ডেকে যে আসলে গুরুত্ব হালকা করে দিয়ে প্রবাহটি মেরে ফেলার আয়োজন পোক্ত হয়, সে কথাই রিভারাইন পিপল থেকে আমরা বারংবার মনে করিয়ে দিয়ে আসছি।

যা হোক, ভুরভুরিয়া থেকে উঠে এসে দেখি, চা কেনাকাটা তখনও শেষ হয়নি। পায়ে পায়ে আনারসের দোকানদারের কাছে গিয়ে দাঁড়াই। তিনি হেঁকে চলছেন- 'এই যে শ্রীমঙ্গলের আনারস!' তার কাছে জানতে চাই, এই আনারসের বিশেষত্ব কী?
-এই দেখেন, পাতা ছোট। মধুপুরের আনারসের পাতা বড়।
-পাতা ছোট হলে কী হয়?
-বড় পাতা মানে ওষুধ দেওয়া। সাইজে বড়, রস কম। শ্রীমঙ্গলের আনারস সাইজে ছোট, রস বেশি, মিষ্টি বেশি। একটু থেমে ডান হাত প্রসারিত করে বলেন, এই ভুরভুরিয়ার মতো।
-ভুরভুরিয়া কেমন? আমি স্বভাবতই আরও কৌতূহলী হই।
-ভুরভুরিয়া দেখতে ছোট, কামে বড়।
-আপনার ভুরভুরিয়ার অবস্থা তো খারাপ! পানি নাই। খালি বালি।
-ওষুধ না মারলে দেখতেন!

আমার মনে হলো, তিনি চা বাগানে ছিটানো কীটনাশকের কথা বলছেন বোধ হয়। জানা কথা যে, কীটনাশক বৃষ্টিতে ধুয়ে নদীতে যায়। ফলে মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট হয়। তিনি কি সেই কথা বলছেন! জানতে চাই।
-না না, এই ওষুধ মানে বালু তোলা। বালু না তুললে দেখতেন, ভুরভুরিয়া কী জিনিস! আমার অজ্ঞতায় এক গাল হেসে বলেন।

আমিও হাসি, কষ্টের হাসি। সাধারণ মানুষ যে সত্য বুঝতে পারছে; বালুমহাল ইজারাদাতা এবং গ্রহীতারা তা বুঝতে পারছেন না!

লেখক ও গবেষক

[email protected]