বাড়ি ভাঙতে পারে, মানুষ ভাঙতে পারে না

 প্রকাশ : ১১ মে ২০১৯ | আপডেট : ১১ মে ২০১৯      

 শেখ রোকন

নদীমাতৃক দেশের জনসাধারণ নদীর জন্য দরদী হবে, এ আর নতুন কী? কিন্তু নদ-নদীর 'পক্ষে' বলতে গিয়ে নদী তীরবর্তী বাসিন্দাদের কাছ থেকে কখনও কখনও নদীর বিরুদ্ধে অভিযোগও পাওয়া যায়। বিশেষত বড় ও ভাঙনপ্রবণ নদীগুলোর ক্ষেত্রে। নদী কী কী উপকার করে- মৎস্যসম্পদ, যোগাযোগ এবং এই সম্পদ ঘিরে নদীর উপযোগিতা নিয়ে কথা বলতে বেগ পেতে হয় না, বলাবাহুল্য। জীবন ও জীবিকা দিয়েই তারা বোঝে। পরিবেশ ও প্রতিবেশগত এবং সাংস্কৃতিক মূল্য বোঝাতে হয় তথ্য ও তত্ত্ব দিয়ে। কিন্তু ভাঙনের জবাব কী? ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, তিস্তা, কুশিয়ারা, গঙ্গা, পদ্মা অববাহিকায় গেলে বরং নদীর বিরুদ্ধে স্থানীয়দের ক্ষোভ প্রকাশ হয়। যতই বলি ভাঙন আসলে উজানে পানি প্রত্যাহার কিংবা ভাটিতে অপরিকল্পিত স্থাপনার প্রতিক্রিয়া, যার বাড়ি-ঘর নদীতে ভেঙেছে, তার কি ক্ষোভ প্রশমিত হয়? যতই বলি নদী ভাঙন রোধে বান্ধালের মতো লোকায়ত পদ্ধতি দরকার, নদী যাকে গিলে খেতে আসছে তার কাছে এসবের মূল্য সামান্য। যতই বলি বাঁধ বরং নদীর এবং নদী-তীরবর্তী মানুষের জীবন-জীবিকায় দীর্ঘমেয়াদে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, তারা বাঁধের পক্ষেই সওয়াল করেন।

বস্তুত নদীভাঙন এক চরম বাস্তবতা। এর কোনো সান্ত্বনা হয় না। বন্যায় সব ভাসিয়ে নিয়ে গেলেও জমি রেখে যায়। ঝড়ে ঘর-বাড়ি উড়ে গেলেও আবার ঘর তোলার সুযোগ থাকে। অগ্নিকাণ্ডে বসতি ভষ্ফ্ম হলেও ফসলের ক্ষেত অক্ষত থাকে। কিন্তু নদীভাঙন মুহূর্তের মধ্যে মানুষকে নিঃস্ব করে ফেলতে পারে। কাজী নজরুল ইসলাম সেই কবে নদী প্রসঙ্গে গানে গানে বলেছেন, সকাল বেলা আমির রে ভাই ফকির সন্ধ্যা বেলা। ভাঙনপ্রবণ নদ-নদীর পাড়ে থাকা মানুষগুলো তাদের দৈনন্দিন জীবনেই এমন অনেক উদাহরণের শিকার কিংবা সাক্ষী।

ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙনের শিকার মানুষ যখন নদীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে; আমি পাল্টা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টাও কম করি। ক্ষোভ প্রশমিত হলে তখন হয়তো ধীরেসুস্থিরে ভাঙনের কারণগুলো ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি। তবুও সতর্ক থাকি, আমার ব্যাখ্যা বা বিশ্নেষণ যেন তার অসহায়ত্বকে খাটো না করে।


২০১৭ সালের মে মাসে গিয়েছিলাম কুড়িগ্রামের রৌমারীর বলদমারা ঘাটের কাছে। আমার নিজের এলাকা যদিও, তার আগে বহু বছর ওই দিকটায় যাওয়া হয়নি। ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন সম্পর্কেও কমবেশি জানা। আমরা শৈশব থেকেই জানি, পশ্চিমপাড়ের চিলমারী কীভাবে নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। পূর্বপাড় বা বাম তীরে বরং চরের পর চর পড়ে যাচ্ছিল। ঘাট ক্রমেই সরে সরে যাচ্ছিল রৌমারী থেকে। কিন্তু নদীটি যে গত এক দশক ধরে বামতীরেও কতটা ভাঙন শুরু করেছে, সরেজমিনে না গেলে বোঝা যেত না।

বলদমারা ঘাটের কাছেই বসে কথা বলছিলাম স্থানীয়দের সঙ্গে। সঙ্গে ছিলেন অগ্রজপ্রতিম রাজনৈতিক ও পরিবেশ কর্মী মহিউদ্দিন মহির। মূলত তারই ব্যবস্থাপনায় ব্রহ্মপুত্রের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে গিয়েছিলাম। সেখানে আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন আলতাফ হোসেন। ঘাটেই কাজ করেন, পাশেই বাড়ি। আধা আনুষ্ঠানিক আলোচনা শেষে নদীর তীরে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম কয়েকজনের সঙ্গে। অদূরেই নদীভাঙনের ধপাস ধপাস শব্দ শোনা যাচ্ছিল। বামতীর ধরে যতদূর চোখ যায় ভাঙনের দীর্ঘতর রেখা।\হবলদামারা ঘাটও কোনো স্থায়ী স্থাপনা নয়। অনানুষ্ঠানিক ঘাটগুলো এমনই। কোনো এককালে একটি নাম নির্ধারিত হয় বটে। নদীর ভাঙাগড়ার সঙ্গে মিলিয়ে সেই ঘাট স্থানান্তরিত হয় একই নামে। আলতাফ হোসেন বলছিলেন, গত ১৫ বছরে কীভাবে সাতবার তার বাড়ি নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। একেকবার ভেঙেছে, আবার নতুন করে বাড়ি গড়েছেন। শুনতে শুনতে আলতাফ ভাইকে প্রশ্ন করি।

- এতবার নদী ভাঙছে, তবু নদীর কাছাকাছিই বাড়ি করেন কেন?

- আর কনে যামু? কামকাজ যা হিখছি, সবতো গাঙের সঙ্গেই!

- এতবার ভাঙনের শিকার হয়ে আবার বাড়ি করার শক্তি কোথা থেকে পান?

- দেহেনছে, রাইতে ঘুমাইতে হইব না! নদী বাড়ি ভাঙবার পারে, মানুষ কি ভাঙবার পারে?

আলতাফ হোসেন আমার বোকাসোকা প্রশ্নে যেন খানিকটা বিরক্ত হন। আমাদের পাশেই ঘূর্ণি দিয়ে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্রের খাড়া পাড়ে বাতাসের ধাক্কা লেগে হু হু শব্দ হয়। নদীও যেন আলতাফ হোসেনের কথায় সায় দেয়।


লেখক ও গবেষক

[email protected]