পর্দায় কয়েক বছর ধরে নানা রূপে, নানা চরিত্রে দেখা দিয়েছেন বিদ্যা সিনহা মিম। মডেল ও অভিনেত্রী হিসেবে প্রশংসাও কুড়িয়েছেন দর্শকের। কিন্তু এবার 'পরাণ' ছবিতে অনবদ্য অভিনয় দিয়ে নিজেকেই নিজে ছাড়িয়ে গেছেন। অভিনয়জগতে নতুন করে আবিস্কৃত মিমকে নিয়ে লিখেছেন রাসেল আজাদ বিদ্যুৎ

"অভিনীত চরিত্র নিয়ে দর্শককে কখনও হাসতে, কখনও চোখের পানি গড়িয়ে পড়তে দেখেছি। গল্প আর চরিত্র নিয়ে ভাবনায় ডুবে যাওয়ার দৃশ্যও চোখে পড়েছে। অভিনয় নিয়েও আলোচনা-সমালোচনা শুনেছি। কিন্তু অভিনয় করে একের পর এক দর্শকের গালি শোনার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। স্বপ্নেও ভাবিনি, কোনো সিনেমায় অভিনয় করে এত গালি শুনতে হবে। কিন্তু সেটাই হয়েছে 'পরাণ' সিনেমায় অভিনয় করে।

হলে গিয়ে খেয়াল করেছি, 'পরাণ'-এর দর্শকরা কাহিনিতে ডুবে গিয়ে ভুলে গেছেন, তাঁরা যা দেখছেন সেটা সিনেমা। যে জন্য আমার অনন্যা চরিত্রে সমস্ত কারসাজি তাঁদের মনে রাগ-ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। সেই রাগ-ক্ষোভ সিনেমা হলে বসেই প্রকাশ করা শুরু করেছেন দর্শক। নিজের সিনেমা নিয়ে এমন কোনো ঘটনার সাক্ষী হতে হবে, সত্যি ভাবিনি।" সদ্য মুক্তি পাওয়া 'পরাণ' ছবির দর্শকপ্রতিক্রিয়া নিয়ে এমন কথাই শোনালেন নন্দিত মডেল ও অভিনেত্রী বিদ্যা সিনহা মিম। অবাক করার বিষয় হলো, দর্শক যখন তাঁর চরিত্র নিয়ে এত রাগ-ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, তখনও মুখের হাসি এতটুকু ম্লান হয়নি তাঁর; বরং মুখের হাসি ধরে রেখেই হল থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেছে এই অভিনেত্রীকে।

তাই শুরুতেই মিমের কাছে প্রশ্ন ছিল, তাঁর অনন্যা চরিত্র নিয়ে যখন দর্শক রাগ-ক্ষোভ উগড়ে দিচ্ছেন, তখনও মুখের হাসি ধরে রেখেছেন কীভাবে? এর জবাবে মিম বলেন, "সত্যি এটাই, 'পরাণ' সিনেমার দর্শকের এমন প্রতিক্রিয়া নিয়ে একটুও মন খারাপ হয়নি আমার। উল্টো তাঁদের এই রাগ-ক্ষোভের প্রকাশ, চরিত্রকে গালাগালি করায় নিজেকে ভাগ্যবান বলেই মনে হয়েছে।

আমার ধারণা, সব অভিনেতা-অভিনেত্রীই চান, তাঁদের কাজটি দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে। আমিও সেটাই চাই। সে জন্যই অনন্যার মতো চরিত্রে চ্যালেঞ্জ নিয়ে অভিনয় করা।" মিমের কথা থেকে এটা স্পষ্ট যে, কোন ভাবনা থেকে অভিনয়জগতে তাঁর পদচারণা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নিয়মিত অভিনয় করে যাওয়ার জন্য সব সময় কি নিজের পছন্দসই গল্প, চরিত্রে কাজের সুযোগ থাকে? সেটা জানতে চাইলে মিম বলেন, 'চাইলে ভালো কাজের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সম্ভব। তার জন্য বাছ-বিচার প্রক্রিয়া ধরে রাখতে হবে। অর্থের মোহে বা সংখ্যা বাড়ানোর জন্য কাজ করতে চাইলে নিজের চাওয়াকে জলাঞ্জলি দিতে হবে, যা আমি কখনও চাই না। কাছের মানুষের অনেকে প্রশ্ন করেন, আমার সমসাময়িকরা এত এত কাজ করছে, আমার কাজ এত কম কেন?

এ প্রশ্নে আমার একটাই জবাব, 'যশ-খ্যাতির জন্য অনেক কিছুই করা যায়, কিন্তু আত্মতৃপ্তি সবকিছুতে থাকে না। এ জন্য সেই কাজই করতে চাই, যা আমার শিল্পীসত্তাকে খুশি করবে।' মিমের এই কথা থেকে এটা বোঝা গেল যে, জনপ্রিয়তার জোয়ারে গা ভাসাতে চান না এই মডেল ও অভিনেত্রী। তিনি সুদূরের যাত্রী। শিল্পীসত্তাকে খুশি রেখে ভালো কাজের মধ্য দিয়েই সেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে চান। কিন্তু সেই চাওয়া পূরণে প্রতিটি কাজে নিশ্চয়ই যাচাই-বাছাই করতে হয়? এ প্রশ্নে মিম বলেন, 'কাজের বাছ-বিচার তো করতেই হয়। এ জন্য অভিনয়ে সব সময় গুরুত্ব দিই গল্পকে। এরপর আসে চরিত্রের বিষয়টি।

চরিত্রে মিশে গিয়ে পর্দায় নিজেকে তুলে ধরতে পারব কিনা এবং তা দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা কতটা সম্ভব- সেটা নিয়ে ভাবি। তাই ততক্ষণ পর্যন্ত প্রতীক্ষায় থাকি, যতক্ষণ না কাঙ্ক্ষিত গল্প ও চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ আসে।' এক যুগের ক্যারিয়ারে বহুবার অভিনয়ে নিজেকে ভেঙে পর্দায় তুলে ধরছেন মিম। নানা চরিত্রে অভিনয় করে দর্শক প্রশংসাও কুড়িয়েছেন। কিন্তু দর্শকের মনে 'পরাণ' ছবিতে অনবদ্য অভিনয় দিয়ে নিজেকেই নিজে ছাড়িয়ে গেছেন মিমি। সে কারণে এই অভিনেত্রীর কাছে তাঁদের প্রত্যাশাও বেড়ে গেছে।

সেই প্রত্যাশা পূরণে আলাদা করে কিছু ভাবছেন কিনা জানতে চাইলে মিম বলেন, 'অনেক দিন ধরেই অভিনয়ে নিজেকে ভেঙে ভিন্ন সব চরিত্রে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। সব চরিত্রই একেবারে নতুন, এটা বলা যাবে না। যেমন 'পরাণ' ছবিতে কলেজছাত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেছি। কলেজছাত্রীর চরিত্র নতুন না হলেও এই চরিত্রের মাঝে যার বসবাস- তাকে কিন্তু আগে কেউ দেখেনি। একইভাবে 'অন্তর্জাল', 'দামাল', 'ইত্তেফাক'সহ আগামী দিনে আমার যেসব সিনেমা মুক্তি পেতে যাচ্ছে, সেখানেও দর্শক নতুন এক মিমের দেখা পাবেন বলেই আমার বিশ্বাস। আনন্দের বিষয় হলো, দর্শক হলমুখী হয়েছেন। যার সুবাদে সিনেমা জগতের সবাই ভালো কাজ তুলে ধরার আয়োজনে উঠেপড়ে লেগেছেন।'

রায়হান রাফী
'পরাণ' ছবিতে মিমের অভিনয় ছিল সাবলীল। যে কারণে দর্শকের মনোযোগও কেড়েছে। অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকের কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টাও তার মধ্যে রয়েছে। ফলে আমার মনে হয়েছে, মিম চরিত্র বুঝেই ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে। ব্যক্তিজীবনে মিম আমার কাছের বন্ধুদের একজন। পাশাপাশি মিম আমার বেশ কয়েকটি কাজও করেছে। ফলে তার ওপর একটা ভরসার জায়গাও আমার আছে। নিজের সু-অভিনয় দিয়ে মিম আরও বহুদূর এগিয়ে যাবে- এই প্রত্যাশা করছি।

শরীফুল রাজ
মিম আমার কাছের বন্ধুদের মধ্যেও একজন। খুব অল্প সময়ে মিম প্রমাণ করেছেন, তিনি সুদূরের যাত্রী। নানা চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নিজেকে পরিণত করে তোলার চেষ্টাও দেখা গেছে তাঁর মধ্যে। 'পরাণ' ছবির দৃশ্যধারণের সময় আমরা অনেক মজা করেছি। নিজের কাজ নিয়ে মিম সব সময় ভাবেন; সব সময় ভালো কিছু করার প্রবণতা লক্ষ্য করেছি। আশা করছি, মিম তাঁর এই ভালো গুণগুলো নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবেন।

ইয়াশ রোহান
আগে থেকেই মিমের অনেক নাটক ও টেলিছবি দেখেছি। এ প্রজন্মের অভিনেত্রীদের মধ্যে তাঁকে দারুণ অভিনেত্রী মনে হয়েছে। তাঁর কিছু সাক্ষাৎকার টিভিতে দেখেছি। পত্রিকায় পড়েছি। তাঁকে খুবই মার্জিত ও মেধাবী অভিনেত্রী মনে হয়েছে। আগামীতে মিমের আরও ভালো ভালো কাজ দেখার অপেক্ষা করছি। একাগ্রতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি যেমন এগিয়ে যাচ্ছেন, একইভাবে যেন পথ চলতে থাকেন। কেউ যখন একটুখানি রিলাক্সড হয়ে যায়, তখনই সমস্যা শুরু হয়। তাঁর জন্য শুভকামনা।