আতাউর রহমান
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সর্বকালের সর্বযুগের অত্যাধুনিক মানুষ। শুধু মঞ্চ বলে নয়, তিনি সব সময় আজকের মানুষ। তাঁর মতো আমরা আধুনিকতাকে কোনো ক্ষেত্রেই স্পর্শ করতে পারিনি। পাশ্চাত্যে শেকসপিয়রের নাটকের অর্থ যেমন এখনও প্রাসঙ্গিক, তেমনি আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিটি নাটকেই রয়েছে সমসাময়িকতার প্রতিচ্ছবি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সভ্যতার বিলুপ্তি এগুলো সব সময় নতুন মোড়কে সমাজে বিরাজ করে, রবীন্দ্রনাথ তা তাঁর নাটকে দেখিয়েছেন। আজকের মানুষ 'রক্তকরবী' নাটক দেখলেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিভিন্ন নাটকে মানবমুক্তি ও সার্বিক স্বাধীনতার কথা বলেছেন। জীর্ণ-পুরাতনকে ভাঙার কথা বলেছেন। কূপমণ্ডূকতা, কুসংস্কার এবং দুঃশাসনের বিরুদ্ধে রক্তপতাকা উড়িয়েছেন। সামাজিক অচলায়তন, পক্ষপাতিত্ব ও বিভেদ ভেঙে দিয়ে মানবমুক্তি ও সমাজের সব স্তরের মানুষের সম-অধিকারের কথা দৃপ্তকণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন। তিনি প্রবলভাবে নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী ছিলেন। 'রক্তকরবী' নাটকে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, শয়তানের কালো ছায়ার বিপরীতে আমি নন্দিনী চরিত্রটি সৃষ্টি করেছি। নন্দিনীকে তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অচলায়তন নাটকেও তিনি কুসংস্কারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। 'রথের রশি'তে তিনি দেখিয়েছেন, কোনো সভ্যতা ও ক্ষমতা চিরকালীন নয়। 'বিসর্জন' নাটকেও তিনি হত্যার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ প্রতিনিয়ত আমাদের কাছে মহত্তর হন। বাংলাদেশে রবীন্দ্র-নাট্যচর্চা নিয়মিতভাবে হয়। একাধিক নাটকের দল, ঢাকার বাইরে জেলাগুলোতে রবীন্দ্রনাথের নাটক, উপন্যাস ও গল্পের নাট্যরূপ মঞ্চায়ন করে চলেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর নাটকের মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকেন। তিনি শুধু আমাদের সম্পদ নন, গোটা পৃথিবীর সম্পদ।

মামুনুর রশীদ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সময়ের চেয়ে অগ্রগামী একজন মানুষ ছিলেন। মঞ্চনাটকের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারে কোনো সংশয় থাকে না। তাঁর অনেক নাটক রয়েছে, যা এখনকার সময়ের সঙ্গে খুবই প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের মঞ্চে বেশ রবীন্দ্রচর্চা হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের সব নাটকই অভিনীত হয়েছে এখানে।
'রক্তকরবী', 'রথের রশি', 'মুক্তধারা', 'বিসর্জন'সহ অনেক নাটকেরই মঞ্চায়ন হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের জন্মসার্ধশত বছর উপলক্ষে বাংলাদেশ ও ভারতের ২১ জন লেখককে নিয়ে একটি কর্মশালা হয়েছিল। এরপর রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনিকে বেইজ করে অনেক নাটক মঞ্চায়ন হয়েছে বাংলাদেশে। শুধু ঢাকায় নয়, ঢাকার বাইরে ভালো নাটক মঞ্চায়ন হচ্ছে। চট্টগ্রামের তির্যক নাট্যদল প্রযোজিত 'বিসর্জন' নাটকটি আমার খুব ভালো লেগেছে। দলটি মঞ্চে 'রক্তকরবী' নাটকটিও এনেছিল। আরণ্যক নাট্যদল এখন পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের কোনো নাটক মঞ্চে আনেনি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নাটক করেছে।

অনন্ত হিরা
শুধু রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া মানেই রবীন্দ্রচর্চা নয়। আমি মনে করি, মঞ্চে যতটা রবীন্দ্রচর্চা হওয়া দরকার, তা হচ্ছে না। শুদ্ধ ও পরিশীলিত বাঙালি হতে হলে রবীন্দ্রনাথের চর্চার বিকল্প কিছু নেই। আমরা যখন প্রাঙ্গণেমোর দলটি করি, তখন দলের ঘোষণাপত্রে বলেছিলাম, প্রাঙ্গণেমোর বাংলাদেশের রবীন্দ্রচর্চাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেবে। সেই ভাবনা থেকে একে একে পাঁচটি রবীন্দ্রনাথের নাটক করেছি। এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমাদের প্রযোজনাও রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের নাটক নিয়ে আলাদা করে 'দুই বাংলার নাট্যমেলা' শিরোনামে একটি নাট্যোৎসব করেছি। সেই উৎসবে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার নাট্যদলকে যুক্ত করার চেষ্টা ছিল। রবীন্দ্রনাথের নাট্যচর্চা যাতে বেগবান হয়, সে লক্ষ্যেই ছিল আমাদের এই প্রয়াস। ওই সময় রবীন্দ্রনাথের নাটক করার মতো দলও খুঁজে পায়নি। আমরা এক মাস পরপরই রবীন্দ্রনাথের নাটকের প্রদর্শনী করে আসছি। ভবিষ্যতেও করব। রবীন্দ্রনাথের 'রক্তকরবী' নাটকটি লেখার ১০০ বছর পূর্তি হতে যাচ্ছে আগামী বছরের ২৬ এপ্রিল। এটিকে কেন্দ্র করেই নতুন করে ৫ আগস্ট মঞ্চে আনতে যাচ্ছি 'রক্তকরবী'। এ ছাড়া আরও কিছু পরিকল্পনা রয়েছে বছরব্যাপী। 'রক্তকরবী' মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে এর সূচনা করব। গত ২০ বছরে রবীন্দ্রনাথের জন্ম অথবা প্রয়াণবার্ষিকীতে আমাদের দলের কিছু না কিছু কার্যক্রম ছিলই। আমি মনে করি, রবীন্দ্রনাথের নাটক সম্পর্কে সবার এক ধরনের ভীতি আছে। থাকাও স্বাভাবিক।

বিষয় : রবীন্দ্র-নাটক

মন্তব্য করুন