বিশ্বে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চিকে নিয়ে গল্প, নাটক, সিনেমা নির্মাণ হলেও বাংলাদেশে এ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কিছু হয়নি। নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে একসময় লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির বিশ্বখ্যাত 'মোনালিসা' ছবির গল্প পাঠ্য ছিল। ইতালিতে জন্ম নেওয়া লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি [১৪৫২-১৫১৯] বিশ্বের শিল্প-ইতিহাসের অবিস্মরণীয় নাম। সম্প্রতি বাংলাদেশের জয়পুরহাটের শান্তিনগর থিয়েটার তাঁর জীবনী নিয়ে নাটক নির্মাণ করেছে। রচনায় অপূর্ব কুমার কুন্ডু, নির্দেশনায় এইচআর অনিক। গত ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় নাটকটির উদ্বোধন প্রদর্শনী হয়। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ইতালির রেনেসাঁসের প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন একাধারে চিত্রশিল্পী, ভাস্কর, নকশাকার ও সংগীতজ্ঞ। বিজ্ঞানের আবিস্কার ও আধুনিক প্রযুক্তি নির্মাণের নেপথ্যে তাঁর অসংখ্য নকশা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাঁর অঙ্কিত 'মোনালিসা', 'দ্য লাস্ট সাপার' ছবি তাঁকে বিশ্বে সর্বাধিক পরিচিতি এনে দিয়েছে। পিতৃপরিচয়হীন লিওনার্দো ছিলেন চরম সহিষুষ্ণতার প্রতীক। তাঁর সময়কালের রেনেসাঁ যুগের চিত্রশিল্পী সান্দা বত্তিচেল্লি, মাইকেল অ্যাঞ্জেলো, রাফায়েলের মধ্যে তিনি ছিলেন নির্মোহ। অবিবাহিত ও সমকামী মানসিকতার নিবেদিত এ শিল্পীকে খ্রিষ্টান ধর্ম তাকে বিশেষ সম্মান প্রদান করেছে। জীবনের শেষ অধ্যায়টি পোপের অধীনেই কেটেছে। তাঁর অন্য ছবিগুলো 'ভার্জিন অব দ্য রকস', 'ভিট্টুভিয়ান ম্যান', 'লেডি ইয়ুথ অ্যান আরমিন', 'সেন্ট জন ব্যাপ্টিস্ট' ইত্যাদি।
নাট্যকার নাটকটি লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির জীবনকে আটটি দৃশ্যে উপস্থাপন করেছেন। জীবনের অন্তিম মুহূর্তে শুরু হয়ে ফ্ল্যাশব্যাকের মতো জীবনের কয়েকটি দিক উপস্থাপিত। শুরু হয় মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে রাজার জন্য অপেক্ষার মধ্য দিয়ে। কারণ, ছবিগুলোর উইল করতে হবে। কে পাবে তাঁর ছবিগুলোর উত্তরাধিকার- এমনই প্রশ্নের সম্মুখে দাঁড়ায় তাঁর শৈশবকাল। যেখানে তাঁর মায়ের চরিত্রও উপস্থিত। মা বলছেন- 'যত দিন তুমি মাতৃদুগ্ধ পান করবে, তত দিনই আমি তোমাকে পাব, দুগ্ধ পান শেষ তোমার অধিকারও শেষ।' সে সময়ে তাঁর বাবাও এসে উপস্থিত। গুরুকেও তিনি দেখতে পান। পরের দৃশ্যে তাঁর বিচার। যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত লিওনার্দো। লিওনার্দো রাজার অনুরোধে যিশুর শেষ ভোজের যে ছবিটি আঁকার আদেশ পেয়েছিলেন, সে ছবিতে যিশুর হত্যাকারীর মুখ নেই। এতে ক্ষুব্ধ রাজা। লিওনার্দো জানান, যে হত্যা করে সে আপন মানুষ। আর আপন মানুষ শত্রু বলেই সে খুনির মুখ আঁকেনি। পরের দৃশ্যেই মঞ্চে আসেন মোনালিসা। লিওনার্দো একপাশে মোনালিসার ছবি আঁকছেন, অন্যপাশে দণ্ডায়মান মোনালিসা। প্রেমের অপলক দৃষ্টি যেন চিত্রের গভীরে। লিওনার্দোর সঙ্গে মোনালিসার কথোপকথন দর্শককে আন্দোলিত করে। পরক্ষণেই পরিচয়হীনতার কষ্টে লিওনার্দো মায়ের কবরে আক্ষেপে ভেঙে পড়েন। লিওনার্দোর স্বপ্ন ছিল, তিনি রাজার কোলে মাথা রেখে মারা যাবেন। রাজা ছিলেন তাঁর প্রধান আশ্রয়স্থল। অবশেষে রাজা এসে দেখেন, লিওনার্দো মারা গেছেন। মৃত লিওনার্দো আবার মঞ্চ দৃশ্যে উঠে আসেন। সঙ্গে মোনালিসা ও অন্যরা। স্বর্গলোকে যেন তাঁদের দেখা হয়। নাটকের শেষে লিওনার্দো মোনালিসার হাত ধরে বলেন- 'তাহলে চলো, খেয়া ভাসাই।'
নাটকের সংলাপগুলো লিওনার্দোর চরিত্রানুগ হয়েছে কিনা, তা প্রশ্নবিদ্ধ! তবে নাট্যকারের কল্পনার পরিচয় পাওয়া যায়। জীবনঘনিষ্ঠ সংলাপই চরিত্রকে দর্শকের সঙ্গে একাত্ম করতে সক্ষম। ইতিহাস-ঐতিহ্য কিংবা বিশেষ কোনো চিন্তা নিয়ে কাজ করতে গেলে যথেষ্ট জ্ঞান, সৃজনী ও প্রজ্ঞাবান হতে হয়।
দেশে অনেক সময় তা দেখা যায় না। বড় কিছু নিয়ে কাজ করা ভালো; তবে তা যেন ছেলেখেলা হয়ে না দাঁড়ায়। ২০০৩ সালে ড্যান ব্রাউনের 'দ্য ভিঞ্চি কোড' উপন্যাসটি নিয়ে বেশ আলোড়নের ঘটনা আমরা সবাই জানি। কালারফুল মঞ্চ বিন্যাসে, আলোর রঙিনতায়, জৌলুসপূর্ণ পোশাক, মিউজিকের ডিজিটাইলে ও ডিজাইনে নির্দেশক এইচআর অনিক নাটকটি উপস্থাপনে প্রয়াসী ছিলেন। এ নাটকে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন- মিজানুর রহমান মিজান, শারমিন আক্তার নিসা, সেকান্দার আলী, সরদার মোস্তাক, রুপালী খানম রুপা, মাহবুব আলম, রাকিন আহমেদ, জুলফিকার আলী ভুট্টো, সজীব মাহমুদ।