ধর্মীয়, রাজনৈতিক আবেদনের উর্ধ্বে অনন্য এক স্থাপত্য নিদর্শন হয়ে রয়েছে তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরের ‘হাজিয়া সোফিয়া’। তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরটি যেমন দুটি মহাদেশের সহাবস্থানের প্রতীক, তেমনি ইসলাম ও খ্রিস্ট ধর্মের সহাবস্থানের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘হাজিয়া সোফিয়া’। দৃষ্টিনন্দন এই স্থাপনাটি নির্মাণ করা হয়েছিল প্রায় ১,৫০০ বছর আগে বাইজেন্টাইন খ্রিস্টান ব্যাসিলিকা হিসেবে। কিন্তু বর্তমানে অনেকটা প্যারিসের আইফেল টাওয়ার বা এথেন্সের পার্থেননের মতো এটিও একটি অসাম্প্রদায়িক স্থাপত্যশৈলী হিসেবে পরিগণিত হয়। অবশ্য শুধু স্থাপত্য কৌশলের কারণেই যে এটি বিখ্যাত তা নয়, এ ঐতিহাসিক স্থাপনাটির রয়েছে নানা রকম রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং শৈল্পিক আবেদন।


তুরস্কের পুরাতন অংশে বসফরাস প্রণালীর কোল ঘেঁষে নির্মিত এই স্থাপনাটি সনাতন খ্রিস্টান এবং মুসলিম উভয় ধর্মের মানুষের কাছেই মর্যাদার বস্তু। কেননা, তুরস্কের বহুবছরের ঐতিহ্য আর ইতিহাসের ধারক-বাহক এই স্থাপনা। ইতিহাসের পালাবদলের সাথে সাথে বিভিন্ন সময় বদল হয়েছে এর পরিচয় এবং ব্যবহার। এটি বানানো হয়েছিল বাইজেন্টাইন খ্রিস্টানদের উপাসনালয় হিসেবে। কালের বিবর্তনে এটি ব্যবহৃত হয়েছে গ্রিক সনাতন খ্রিস্টানদের ক্যাথেড্রাল, রোমান ক্যাথলিকদের ক্যাথেড্রাল এবং মুসলিমদের মসজিদ হিসেবে। কিছুদিন আগেও এটি সব ধর্মের মানুষদের জন্য জাদুঘর হিসেবে উন্মুক্ত ছিল। তবে প্রায় ৮৫ বছর পর বর্তমানে এটি মসজিদ হিসেবে আবার ব্যবহৃত হচ্ছে।


কামাল আতাতুর্ক তুরস্ক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নয় বছর পরে, ১৯৩৫ সালে হাজিয়া সোফিয়াকে একটি জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়। তখন বাইজেন্টাইন আমলের বিভিন্ন খ্রিস্টীয় প্রতীক ও ছবি পুনঃস্থাপন করা হয় হাজিয়া সোফিয়াতে। খ্রিস্টান এবং মুসলিমদের ধর্মের নানা প্রতীক এবং বাণী পাশাপাশি দেখতে পাওয়া যেতো হাজিয়া সোফিয়াতে। একপাশে মোহাম্মদ, অন্যদিকে আল্লাহ লেখা আবার মাদার মেরির কোলে যিশুখ্রিস্ট সবই ছিল এখানে। সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি ধর্ম বিশ্বাসের আশ্চর্য এক সহাবস্থান চোখে পড়ে জাদুঘরটিতে। বিভিন্ন সময়ে হাজিয়া সোফিয়া খ্রিস্টান এবং মুসলিমদের প্রার্থনালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে এ স্থাপনাটিতে খ্রিস্টান এবং মুসলিমদের ধর্মের নানা অনুসঙ্গের সহাবস্থান চোখে পড়ে। এ দুটি ভিন্ন ধর্মের মানুষদের ধ্যান-ধ্যারণা আর চিন্তা-ভাবনা এসে যেন এক হয়ে মিলে গেছে হাজিয়া সোফিয়াতে।


তবে হাজিয়া সোফিয়া যে অনন্তকাল পর্যন্ত এভাবেই ভিন্ন দুটি ধর্মের সহাবস্থানের প্রতীক হয়ে টিকে থাকবে সেটা বলা মুশকিল। ২০২০ সালে ৮৫ বছর পর এটি আবার মসজিদে পরিণত হয়। তবে প্রায় একশত বছর পর্যন্ত যে এ স্থাপনাটি ভিন্ন দুটি ধর্মবিশ্বাসের আশ্চর্য এক মেলবন্ধন হিসেবে ছিল, সেটিও নেহায়েত কম নয়। ইতিহাসের প্রয়োজনেই আবার হয়তো দুটি ধর্মের সহাবস্থানের অনন্য স্থাপনা হয়ে উঠতে পারে ‘হাজিয়া সোফিয়া’।