ঢাকা সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪

পানি সংকট ও জেন্ডার বৈষম্য

অন্যদৃষ্টি

পানি সংকট ও জেন্ডার বৈষম্য

নাহিদা নিশি

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৮:০০

ভবিষ্যৎ বিশ্ব নাকি যুদ্ধ করবে বিশুদ্ধ পানির জন্য। অথচ জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে পানির অপচয়, ক্ষতিকর ব্যবহার ও দূষণ। এ সংকটে জলবায়ু পরিবর্তনের  অবদানও কম নয়।

জাতিসংঘের বিশ্ব পানি উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০২৩ অনুযায়ী, সারা বিশ্বে প্রায় ৩৫০ কোটি মানুষ বছরে অন্তত একটি মাস তীব্র পানি সংকটে পড়ে। ৪০ শতাংশ মানুষ ব্যবহার করছে দূষিত পানি। পানিবাহিত রোগে বছরে গড়ে মারা যায় ২০ লাখ মানুষ। এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্সের একটি গবেষণা বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৪১ শতাংশ বা সাত কোটি মানুষ নিরাপদ পানির অভাবে আছে।

বিশ্বব্যাপী নারী এবং কন্যাশিশুরাই যেহেতু পরিবারের জন্য পানি সংগ্রহের প্রধান দায়িত্ব পালন করে; পানি সংকট তাই নারীদের জীবনে ডেকে এনেছে চরম দুর্দশা। ওয়াশের তথ্য অনুযায়ী, বাড়িতে পানির ব্যবস্থা না থাকা পরিবারগুলোর প্রতি ১০টির মধ্যে সাতটিতে নারী ও কন্যাশিশুই পানি সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করে থাকে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে পানি সংগ্রহের পেছনে নারীদের প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ কোটি ঘণ্টা ব্যয় হয়। লাখ লাখ নারীকে প্রতিদিন নিরাপদ পানির জন্য মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয়। ভারতীয় নারীরা পানি সংগ্রহের পেছনে বছরে প্রায় ১৫ কোটি দিন ব্যয় করে। গ্রীষ্মকালে কখনও কখনও তাদের দিনে ছয়বার পর্যন্ত পানি সংগ্রহে যেতে হয়। বাংলাদেশে ৮৫ শতাংশ নারী এবং ৪ দশমিক ৭ শতাংশ কন্যাশিশু পরিবারের জন্য পানি সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করে। এ ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের তুলনায় ১০ গুণ সময় ব্যয় করে। মৌসুম ও অঞ্চলভেদে পানি সংগ্রহের পেছনে নারীরা দৈনিক চার-পাঁচ ঘণ্টা সময় ব্যয় করে।

বাড়িতে নিরাপদ পানির অভাব নারীর স্বাস্থ্যে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে; বিশেষ করে গর্ভাবস্থা, মাসিককালীন এবং সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে। এ ছাড়া পানি সংগ্রহ ও বহন শরীরের পক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। এ কারণে রক্তস্বল্পতা, জরায়ুর স্থানচ্যুতি, পিছলে পড়া, প্যারালাইসিস, হাড় ভাঙা এবং অকাল গর্ভপাতের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। ঋতুস্রাবের সময় জীবাণুমুক্ত পানির সংকট নারীর প্রজননস্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায়। সারাদিনের গৃহস্থালি কাজ যেহেতু নারীকেই করতে হয়, তাই নারীর পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।

পানি সংকট পরোক্ষভাবে নারীকে তার শিক্ষার অধিকার থেকেও বঞ্চিত করছে। প্রথমত, পানি সংগ্রহে অনেক সময় ব্যয় করতে হয় বলে তারা স্কুলে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। দ্বিতীয়ত, স্কুলে বিশুদ্ধ পানির সংস্থান না থাকায় তারা নানা জটিলতায় পড়ে; এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে স্কুলের প্রতি অনীহা আসে। গবেষণা বলছে, তানজানিয়ায় যেসব মেয়ের বাড়ি পানির উৎসের কাছাকাছি, তাদের তুলনায় এ উৎস থেকে অনেক দূরে অবস্থানকারী মেয়েদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার ১২ শতাংশ কম।

আফ্রিকান এক জরিপ বলছে, নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে নারী ও কন্যাশিশুরা পানি সংগ্রহের পেছনে বছরে ৪০ বিলিয়ন ঘণ্টা ব্যয় করছে, যা ফ্রান্সের এক বছরের শ্রমশক্তির সমপরিমাণ। নারীর জীবনের এই মূল্যবান শ্রমঘণ্টা ব্যয় হচ্ছে শুধু পানি সংগ্রহের কাজ করে, যার কোনো আর্থিক মূল্য নেই।

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পানি সংগ্রহের সময় নারীকে অনেক ক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়। উত্তর-পূর্ব উগান্ডার কিশোরী স্কোভিয়া পানি আনতে গিয়ে ছেলেদের দ্বারা নিয়মিত উত্ত্যক্ত হওয়ার কথা জানায়। স্কোভিয়ার এক বন্ধু নাকি পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে ধর্ষিত হয়েছে।

পরিস্থিতি তাই শুধু নিরাপদ পানির নিশ্চয়তাই নয়; নারী ও কন্যাশিশুদের ওপর পানি সংগ্রহের যে স্বীকৃতিহীন কাজের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তারও অবসান দাবি করছে। বিশ্বব্যাপী গৃহস্থালি ও পানি সংগ্রহকে নারীর কাজ হিসেবে দেখার যে প্রবণতা, তার পরিবর্তন দরকার। ইতিবাচক অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জনেরও পূর্বশর্ত এটি।

নাহিদা নিশি: উন্নয়নকর্মী

আরও পড়ুন

×