ঢাকা সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪

মানবিক শিক্ষার সন্ধানে

অন্যদৃষ্টি

মানবিক শিক্ষার সন্ধানে

খাদিজা খাতুন

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৮:০০

আজ থেকে ৪০-৪৫ বছর আগে ছাত্রকে শিক্ষকের হাতে তুলে দিয়ে বলা হতো, আপনার সন্তান, আপনার মতো করে গড়ে তুলুন। শিক্ষক ছিলেন গুরু, ছাত্র শিষ্য। শিক্ষক ছাত্রকে শিক্ষার সঙ্গে দিতেন দীক্ষা। আর বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের সবার জানা। গুরু-শিষ্যের সেই সম্পর্ক নেই বললেই চলে।

তবে পিতামাতা যতই বিত্তশালী হোন, শিশুকে অবশ্যই বিদ্যালয়ে কিংবা সমমানের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের কাছে পাঠিয়ে দেন। শিশুর কাছে তখন শিক্ষক হয়ে ওঠেন প্রধান, পিতামাতা হয়ে পড়েন গৌণ। তাই শিশু যদি সঠিক শিক্ষা তথা মানবিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়, তার দায় শিক্ষক কিছুতেই এড়াতে পারেন না। শিশুকে মানবিক শিক্ষায় শিক্ষিত করলেই মানবিক পরিবার তথা সমাজ, জাতি, দেশ ও বিশ্বকে পাওয়া যাবে।

শিক্ষা শুধু পুথিতে লিপিবদ্ধ কিছু কথা নয়। শিক্ষা একজন মানুষকে সুন্দর করে। সুন্দর বলতে চলার সৌন্দর্য, বলার সৌন্দর্য, আচার-আচরণের সৌন্দর্য, সংযমের সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে শিক্ষকের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। সেজন্য শিক্ষক হবেন একজন বিশ্বস্ত কাউন্সিলর। তিনি কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে শিশুর সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে সৌন্দর্যকে পরিস্ফুটনের পথিকৃৎ হবেন। কাউন্সেলিং শুধু ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো প্রক্রিয়া নয়, এটি শিক্ষক-পিতামাতার মধ্যেও চলতে হবে। কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষক শিক্ষার্থীর একজন বিশ্বস্ত বন্ধু হয়ে সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলার প্রত্যয়ে শিক্ষার্থীর মনের সৌন্দর্যের বিকাশ ঘটাবেন। অধ্যয়নকালে একজন শিক্ষার্থীকে শিক্ষক নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ পান। যা অনেক সময় পিতামাতা বা অভিভাবকের পক্ষে সম্ভব হয় না।

শিশুর মানবিক বিকাশে সহশিক্ষা কার্যক্রমগুলোতে শিশুর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। পিতামাতা বা অভিভাবকদের এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। অনেক অভিভাবক গতানুগতিক পড়াশোনার বাইরে সৃজনশীল কাজে শিশুর সম্পৃক্ততাকে সময়ের অপচয় মনে করেন। সৃজনশীলতার বিকাশ ছাড়া মানবিক বিকাশ ব্যাহত হয় বিষয়টি অভিভাবকদের বোঝাতে হবে। বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে শিশুকে সম্পৃক্ত করতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান, বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, ক্যাম্পেইনে সহযোগিতা করা, জাতীয় দিবসসহ বিভিন্ন দিবসে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো নিশ্চিত করতে হবে।

চারু-কারু, সংগীত, শারীরিক শিক্ষা বিষয়গুলোর প্রতি অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। শরীরের যেমন খাদ্যের প্রয়োজন, তেমনি মনেরও খাদ্যের প্রয়োজন রয়েছে। মনের খাদ্য জোগান নিশ্চিত করতেই সহশিক্ষা কার্যক্রমগুলো জোরদার প্রয়োজন। ছোট ছোট জিনিস, কাজ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেওয়া, নিজের জন্য শুধু প্রয়োজনীয়টুকু রেখে বাকিটুকু অন্যদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া, নিজের টিফিন থেকে অন্যকে শেয়ার করা, যে বন্ধুটি টিফিন আনতে পারেনি তাকে নিয়ে একসঙ্গে খাওয়া– বিষয়গুলো খুব সাধারণ মনে হলেও এসব কর্মকাণ্ডই একজন শিশুকে ভবিষ্যতে একজন দাতা মনোভাবের গড়ে উঠতে সাহায্য করবে। তাই এসব গুণ গড়ে তুলতে শিক্ষকের ভূমিকা হবে অগ্রগণ্য।

বিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষার্থী একসঙ্গে থাকে তাই তাদের কিছু হারিয়ে গেলে অন্য কেউ সেটা পেলে তা সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীকে ফিরিয়ে দিলে সেটা যে মাধ্যমেই (নিজে/ শিক্ষকের কাছে জমা দেওয়া) হোক না কেন হারিয়ে যাওয়া জিনিস ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সবার মাঝে তার প্রশংসা করা, অন্যান্য শিক্ষার্থীর কাছে বিষয়টি প্রকাশ করে হাততালির মাধ্যমে সম্মান জানানো– এসবের মাধ্যমে শিশুকে পুরস্কৃত করা যায়। ফলে অন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ভালো কাজের প্রতিযোগিতা বাড়বে।

বর্তমান প্রজন্ম করোনা মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। মহামারির নিষ্ঠুরতা, ভয়াবহতা দেখে তাদের কোমল হৃদয় বিশাল ধাক্কা খেয়েছে, যা আমরা অনেকেই উপলব্ধি করতে পারছি না। কিন্তু এই ধাক্কার প্রভাব কাটাতে চাই সঠিক শিক্ষা এবং অবশ্যই তা মানবিক শিক্ষা। যে জাতি যত বেশি উন্নত, যে দেশ যত বেশি এগিয়েছে তাদের জনশক্তি তত বেশি শিক্ষিত এবং তা অবশ্যই মানবিক শিক্ষায় শিক্ষিত। টেকসই উন্নয়নে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে তাই সবার সঙ্গে আমাদের শিক্ষকদের অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। তবেই আমাদের স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।

খাদিজা খাতুন : সরকারি কর্মকর্তা, নারায়ণগঞ্জ

আরও পড়ুন

×