ঢাকা শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪

অবিলম্বে সক্ষম প্রবীণ সূচক চালু করা দরকার

প্রবীণ দিবস

অবিলম্বে সক্ষম প্রবীণ সূচক চালু করা দরকার

মো. আমিনুল হক

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৮:০০

বিশ্বের আর সব উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রবীণ বা বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বেড়ে চলেছে। ২০২০ সালে বাংলাদেশে ৬০ বছরের ওপরের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১.৩১ কোটি (প্রায় ৮.০ শতাংশ), যা ২০৫০ সালে বেড়ে হবে প্রায় ২.১৯ কোটি বা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩১.৯ শতাংশ। এটা বাংলাদেশের মতো একটি নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের জন্য অবশ্যই চিন্তার বিষয়। কারণ কতগুলো প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের সমাধান না পেলে বিষয়টা রাষ্ট্রের জন্য এক বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

প্রশ্নগুলো হলো: ১. এ বিশাল প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে তাঁর প্রয়োজনীয় আর্থিক, শারীরিক, মানসিক ও চিকিৎসা সেবা প্রদান কীভাবে সম্ভব? ২. কীভাবে একটি সুন্দর প্রবীণ জনগোষ্ঠী গঠন ও লালন-পালন করা যায়? ৩. কীভাবে একটা দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠী কী অবস্থায় আছে তার পরিমাপ করা যায়? ৪. সমাজে এ জনগোষ্ঠীর জন্য কী কী সেবা ও সহায়তা প্রচলন বা প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে? ৫. কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান কী সেবা দেবে প্রবীণদের?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নিয়মিতই প্রবীণদের সার্বিক অবস্থা পরিমাপের ব্যবস্থা করে। প্রতি বছর বা দু’বছর অন্তর তারা ২০-২৮টি বিষয়ে প্রবীণদের থেকে তথ্য সংগ্রহ করে একটি সূচক প্রকাশ করে; যা সক্ষম প্রবীণ সূচক (অ্যাকটিভ এইজিং ইনডেক্স) নামে অভিহিত। এ সূচকে তারা দেখার চেষ্টা করে, কত শতাংশ প্রবীণ ব্যক্তি ১. যে কোনো ধরনের কর্মে নিযুক্ত; ২. সপ্তাহে কমপক্ষে এক দিন সমাজের বিভিন্ন সামাজিক ও ঐচ্ছিক বা স্বেচ্ছাশ্রমে যুক্ত ৩. সপ্তাহে কমপক্ষে এক দিন তাঁর ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনিদের সেবা প্রদান করেন; ৪. সপ্তাহে কমপক্ষে এক দিন পরিবারের বয়স্ক বা শারীরিক চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সেবা প্রদান করেন; ৫. সপ্তাহে কমপক্ষে এক দিন সমাজের সামাজিক, রাজনৈতিক সভা, সালিশ, দরবার-মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করেন; ৬. সপ্তাহে প্রায় প্রতিদিন কিছু সময় শারীরিক ব্যায়াম করেন; ৭. শরীর ও দাঁতের নিয়মিত সেবা গ্রহণ করেন; ৮. একা এবং যৌথ বাসায় বাস করেন; ৯. দারিদ্র্যসীমার নিচে আছেন; ১০. মানসিক সমস্যামুক্ত; ১১. রাতে একাকী হাঁটতে নিরাপদ বোধ করেন; ১২. মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণ করেছেন এবং ১৩. কর্মক্ষম ও সুন্দর বার্ধক্য কাটানোর জন্য কতটুকু পরিবেশ তৈরি করতে পারেন; যা এভাবেও বলা যায়, ৫৫ বছরের পরে শারীরিকভাবে, মানসিকভাবে তিনি সুস্থ আছেন কিনা, বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী, আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করেন কিনা, প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত কিনা।

এদিকে তুলনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ এ সূচকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ইইউভুক্ত ২৭ দেশের প্রবীণদের চেয়ে অনেক পেছনে আছে (মাত্র ৩০.১)। এটাই বলে দেয়, সর্বাত্মক প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমাদের এ সূচক মানের উন্নতি করতে হবে; যা প্রবীণদের সুন্দর জীবনের প্রতিফলন ঘটাবে।

দেখা গেছে, সক্ষম প্রবীণ জীবনযাপনের যে চারটি ক্ষেত্র আছে, তার দুটোতে (কর্মে নিয়োগ ও স্বাধীন জীবনযাপন) আমাদের অবস্থান খুবই নিচে। প্রথমটাতে ইইউর ২৭ দেশের মান ২৭, আমাদের মাত্র ৩.৩; স্বাধীন জীবনযাপন প্রশ্নে ইইউর ২৭ দেশ পেয়েছে ৭০.৫, আমরা পেয়েছি মাত্র ২৭.৩।

আগেই বলা হয়েছে, উন্নত বিশ্ব প্রবীণ জীবনসংক্রান্ত উল্লিখিত প্রতিটি বিষয়ে প্রতিনিয়ত তথ্য সংগ্রহ করে এবং সে অনুসারে দেশের প্রবীণদের জীবনমান উন্নয়নে পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু আমাদের দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ এ ধরনের কোনো সূচক তৈরি করে না। বিবিএস বা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে এ ধরনের সূচক তৈরির সহায়ক তথ্য সংগ্রহ করতে আজ পর্যন্ত বলা হয়নি।

দেশের প্রবীণবিষয়ক যে দুটো তথ্য ওপরে দেওয়া হয়েছে, সেগুলো ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত গবেষণার ফল। সে গবেষণাতেই দেখা গেছে, দেশে প্রবীণদের মাত্র ৮.৫ শতাংশ ঐচ্ছিক বা স্বেচ্ছাশ্রমে নিয়োজিত, মাত্র ২০.৩ শতাংশ আয় করেন এবং ৫০ শতাংশ দারিদ্র্যের মধ্যে দিনাতিপাত করেন। তবে মানসিক সুস্থতা (৫৫.০%) ও সমাজে সম্পৃক্ততার হার (৯৭.৮%) খুবই সন্তোষজনক।

আমরা যে যেখানেই আছি, সেখানে নিশ্চয়ই প্রবীণদের সামাজিক মর্যাদা, সামাজিক সম্পৃক্ততা, আর্থিক সংগতি, নিয়মিত আয়, শারীরিক ব্যায়াম অভ্যাস, মানসিক সুস্থতা, পরিবার-পরিজন-বন্ধুবান্ধবসহ সমাজে সুন্দর জীবনযাপনে সহায়তা করব। আমরা নিজেরাও নিজেদের ৬০ পরবর্তী সময়ের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে থাকব। তবে এগুলো প্রবীণদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্বের কোনো বিকল্প হতে পারে না। বয়স্কভাতা প্রদান, গৃহহীনদের গৃহ প্রদান, সর্বজনীন পেনশনসহ বর্তমানে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যেসব সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চলছে, সেগুলোর লক্ষ্য নিঃসন্দেহে প্রবীণদের নিরাপদ ও আনন্দদায়ক জীবনযাপন নিশ্চিত করা। তবে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে নিয়মিতভাবে দেশের কর্মক্ষম প্রবীণ সূচক তৈরি হলে প্রবীণদের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে জানা সহজ হয়। এভাবে প্রবীণদের জন্য নিবেদিত সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোকে আরও লক্ষ্যভেদী করে তোলা যায়। প্রবীণদের সার্বিক কল্যাণে মন্ত্রণালয় বা সমাজসেবা অধিদপ্তর দ্রুত এ পরিকল্পনা গ্রহণ করবে– এ প্রত্যাশা আজকের আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসে।

ড. মো. আমিনুল হক: অধ্যাপক, পপুলেশন সায়েন্স বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×