ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২৩

দশদিক

ফিলিস্তিনি ডেভিড বনাম ইসরায়েলি গলিয়াথ

ফিলিস্তিনি ডেভিড বনাম ইসরায়েলি গলিয়াথ

ফারুক ওয়াসিফ

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৯ অক্টোবর ২০২৩ | ০৭:৩৫

‘তুমি যদি আমাকে খোঁচাও, আমার কি রক্ত ঝরবে না? তুমি যদি কাতুকুতু দাও, আমি কি হাসি না? তুমি যদি বিষ খাওয়াও, আমি কি মরব না? এবং তুমি যদি আমার প্রতি অন্যায় করো, আমরা কি প্রতিশোধ নেব না?’ শেকসপিয়রের মার্চেন্ট অব ভেনিস নাটকে ইহুদি বণিক শাইলক কথাগুলি বলেছিল তার প্রতিপক্ষকে। আজকের জায়নবাদী রাষ্ট্র ইসরায়েল যাদের ভূমি দখল করে রেখেছে, যাদের নিয়মিতভাবে হত্যা-নির্যাতন করে চলেছে, তারাও তো বলতে পারে: ‘তুমি যদি আমার প্রতি অন্যায় করো, আমরা কি প্রতিশোধ নেব না?’

বাইবেলের ঈশ্বর সোডোম আর গোমোরাহ নামে দুটি শহরকে আগুন আর পাথর বর্ষণ করে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। আর মধ্যপ্রাচ্যের আজকের ঈশ্বর ইসরায়েলের ক্রোধের শিকার ফিলিস্তিন ও লেবানন। কিন্তু মানুষ এক দুর্মর জীব। মানুষ কখনও দাসত্ব স্বীকার করে না। বাইবেলের কাহিনিতেই বালক ডেভিড শক্তিমান গলিয়াথকে পরাজিত করেছিল। সে সময়ে ডেভিড একজন ইহুদি বালক আর গলিয়াথকে বলা হয়েছিল ফিলিস্তিনি। এখন ঘটনা উল্টে গেছে। ফিলিস্তিনি ডেভিডেরা ইসরায়েলি গলিয়াথের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছে এবং এই দফায় বেকায়দায় ফেলে প্রতিশোধ নিয়েছে।

এবং দুর্গ ইসরায়েল আক্রান্ত হয়েছে, শত্রু বাহিনী তার ভেতরে ঢুকে বুকের ওপর আঘাত করেছে। ইসরায়েলের ইতিহাসে আবার একটি কালো দিন এসেছে এবং দিনটি দীর্ঘ হচ্ছে– তিন দিন ধরে লড়াই চলছে দক্ষিণ ইসরায়েলের কয়েকটি দখলকৃত শহরে। এর ধাক্কা শুধু তেল আবিব বা ওয়াশিংটনে নয়, সৌদি আরব, মিসর, ইরানে অনুভূত হচ্ছে। এমনকি ইউক্রেনকেও চিন্তায় পড়তে হচ্ছে। পশ্চিমারা মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লে কিয়েভকে বাঁচাবে কে?

দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাস, আর উত্তর ইসরায়েলে মর্টারের গোলা ছুড়ে হিজবুল্লাহ জানিয়েছে তারাও পাশে আছে। সিরিয়ায় থাকা ইরানি মিলিশিয়ারাও সম্ভবত প্রস্তুত। কিন্তু কী বিপুল ফারাক দুই পক্ষে! আক্রান্ত ইসরায়েলের পাশে আছে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুরো পশ্চিমা বিশ্ব, আরবদের একাংশসহ অনেক রাষ্ট্র। ফিলিস্তিনিদের কেবল তারাই আছে। আর আছে কিছুটা ইরানি ও কিছুটা তুর্কি সাহায্য আর মাঝেমধ্যে কাতারের দানখয়রাত।

এই অসহায়ত্বই ফিলিস্তিনিদের মরিয়া করেছে। চোখের সামনে হামাসের গেরিলারা সীমান্তের কাছে মহড়া দিয়েছে, প্রশিক্ষণ নিয়েছে। ইসরায়েল টের পায়নি। এ ধরনের হামলা দীর্ঘদিনের সতর্ক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ এবং মারাত্মক গোপনীয়তা ছাড়া করা অসম্ভব। গাজা তো মাত্র ১০ কিলোমিটার চওড়া এবং ৩৭ কিলোমিটার লম্বা ঘনবসতিতম এক দরিদ্র শহর। চারদিক থেকে বিচ্ছিন্ন এই শহরের যোদ্ধারা যেভাবে পরাশক্তিসমান ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থা তছনছ করে দিতে পারল, সেটা যুদ্ধবিজ্ঞানের পাঠ্য বিষয় হয়ে থাকবে।

অথচ এক দিন আগেও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর দম্ভের প্রতিধ্বনি ভাসছিল মিডিয়ায়। জাতিসংঘের গত অধিবেশনে তিনি ইসরায়েল ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন মানচিত্র আঁকার ঘোষণা দেন। মিসর, সুদান, জর্ডান, আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মরক্কোর পরে সপ্তম আরব দেশ হিসেবে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পাতানোর পাঁয়তারা চূড়ান্ত করে এনেছিল সৌদি আরব। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ফিলিস্তিন প্রশ্ন হারিয়ে যেতে বসেছিল।

হামাসের বিজলি চমক এক ধাক্কায় সৌদি-ইসরায়েলি আঁতাতকে হিমঘরে পাঠিয়ে দিল। নেতানিয়াহুর দম্ভকে হাস্যকর করে তুলল। প্রমাণ করে দিল, ইসরায়েল অপরাজেয় নয়, আয়রন ডোম দুর্ধর্ষ দুর্গ নয়। ইসরায়েলি গোয়েন্দা ব্যর্থতা কতটা ব্যাপক, তা দুনিয়ার সামনেও খোলা হয়ে পড়ল। ইসরায়েলি গোয়েন্দা প্রযুক্তির বাজারে কিছুটা টান লাগতে পারে এ ঘটনায়। কিন্তু মূলত নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব রাজনৈতিক হুমকিতে পড়ে গেল। ১৯৭৩-এর ইয়ম কিপুর যুদ্ধের পরে সেই সময়কার বিখ্যাত প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার টিকতে পারেননি। নেতানিয়াহুকেও তেমন পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে। ইসরায়েল এখন গাজায় স্থলাভিযান চালাবে, বিপুল ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাবে। নেতানিয়াহু তাঁর সেনাদের শুধু হামাসের পাতা ফাঁদের ভেতরই পাঠাবেন না, তাদের এমন অবস্থায় পাঠাবেন, যখন তারা মনে মনে ভাববে, বিপর্যয়কর গোয়েন্দা ব্যর্থতার তদন্তে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে কঠিন-কঠোর কোনো তদন্ত কমিটি। এমন উদ্বেগ নিয়ে যুদ্ধ করা কঠিন।

জেরুজালেম ও পশ্চিম তীর এখনও অধিকৃত এলাকা। পঁচাত্তর বছরের দখলদারি, গণহত্যা, দেশছাড়া করা, জেরুজালেম নগরী কেড়ে নিয়ে পবিত্র আল-আকসা মসজিদকে ইচ্ছা হলেই অপবিত্র করা– কী করেনি ইসরায়েল! এ সপ্তাহেও বারে বারে আল-আকসা মসজিদে ঢুকে পড়েছে ইসরায়েলি নাগরিকেরা। পৃথিবী কিচ্ছু বলেনি। বিবৃতি দেননি বাইডেন।

গত বছর আলজাজিরার জনপ্রিয় ফিলিস্তিনি সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহকে দায়িত্বরত অবস্থায় ঠান্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। কিন্তু ইসরায়েল নির্বিকার– তারা বলেছে, সাংবাদিক হত্যার বিচার তারা করবে না। শিরিনের জন্য যে মাতম তখন উঠেছিল, সেটাই এখন ঘৃণা হয়ে আছড়ে পড়ছে ইসরায়েলের বর্ণবাদী দেয়ালে।

৬ অক্টোবর ভোরে রকেটবৃষ্টি হয়েছে ইসরায়েলজুড়ে। ইসরায়েল বলছে ২ হাজার, হামাস বলছে যুদ্ধের প্রথম প্রহরে ৫ হাজার রকেট ছোড়া হয়েছে। ভূমি, আকাশ ও নৌপথে একযোগে আক্রমণ চলেছে। ১ বিলিয়ন ডলার খরচে তৈরি করা ইসরায়েলি সীমান্ত নিরাপত্তা ভেদ করে ঢুকে গেছে শত শত ফিলিস্তিনি যোদ্ধা। এখনও সেখানে লড়াই চলছে। বিমান হামলা চলছে গাজার ওপর। এই যুদ্ধের ফল যা-ই হোক, যতক্ষণ না ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, ততক্ষণ ইসরায়েলের কেউই নিরাপদ নয়– এই সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। যুদ্ধের ধোঁয়া পরিষ্কার হয়ে গেলে, শান্তির জন্য ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তার কথাটা তখন সবার মনে বাজতে বাধ্য।

হামাসের এবারকার বিস্ময়কর দুঃসাহস ও নিখুঁত পরিকল্পনাকে ইয়ম কিপুর যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। ১৯৭৩ সালের ৬ অক্টোবর মিসর ও সিরিয়া একযোগে ইসরায়েল আক্রমণ করে। উদ্দেশ্য অধিকৃত সিনাই উপদ্বীপ ও গোলান মালভূমি পুনরুদ্ধার। হতচকিত ইসরায়েল অনেক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। পরিণাম সিনাই ও গোলান ফেরতের বিনিময়ে মিসর ও সিরিয়ার সঙ্গে শান্তি স্থাপন। এ রকম বিস্ময়ের শিকার ইসরায়েল আরও হয়েছিল।

১৯৮২ সালে লেবাননে আগ্রাসন চালাতে গিয়ে ফাঁদে পড়ে যায় ইসরায়েলি বাহিনী। আগে থেকে প্রস্তুত ফিলিস্তিনি গেরিলাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে ইসরায়েল সরে আসে। আসার আগে রেখে যায় কুখ্যাত শাবরা শাতিলা গণহত্যার নজির। ২০০৬ সালেও লেবাননে আগ্রাসন চালাতে গিয়ে মার খেয়ে ফিরে আসতে হয় ইসরায়েলকে। প্রতিবারই বোঝা গেছে, ইসরায়েলের সেনারা একমাত্র বিমান হামলার সময়েই নিরাপদ। মাটিতে গেরিলা যোদ্ধাদের মোকাবিলা কোনোবারই তারা ঠিকমতো করতে পারেনি। গাজায় বিমান হামলা করা এক কথা, কিন্তু সেনা পাঠানোর আগে তাদের ভাবতে হবে।

মনে রাখতে হবে, ফিলিস্তিনিদের লড়াই তাদের একার লড়াই নয়। তারা লড়ছে পৃথিবীর শেষ ও একমাত্র দখলদার রাষ্ট্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। ইসরায়েলের বর্ণবাদী দখলদারি যতদিন দুনিয়ায় থাকবে, যতদিন রাষ্ট্রটি তাদের আরব প্রতিবেশীদের ন্যায্য হক বুঝিয়ে দিয়ে শান্তির অংশীদার না হবে, ততদিন বিশ্ব মানবসভ্যতার বড়াই করতে পারবে না। পারার কথাও না।

এটা ঠিক, শত শত বছরজুড়ে ইহুদিরা ইউরোপজুড়ে নির্যাতিত হয়েছে। ফ্রান্স, ব্রিটেন, রাশিয়া, পোল্যান্ড– কোথায় তারা অন্যায়ের শিকার হয়নি! সেই ধারাবাহিকতাতেই এসেছে হিটলারের ইহুদি নিধন কর্মসূচি। কিন্তু মধ্যযুগ থেকেই সিরিয়া, ইরান, বাগদাদ, আন্দালুসিয়া, ইস্তাম্বুলে নির্যাতিত ইহুদিরা আশ্রয় পেয়েছে, সম্মান পেয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন ইউরোপে ভয়ংকর হলোকাস্ট চলছে, তখন সিরিয়া ছিল পলাতক ইহুদির শরণভূমি।

শেকসপিয়রের মার্চেন্ট অব ভেনিস নাটকে ইহুদি বণিক শাইলকের অভিযোগ তো মিথ্যা ছিল না। গর্বিত ভেনিসবাসীর উদ্দেশে শাইলক বলছে, ‘সে আমাকে অপদস্থ করেছে, ঠকিয়েছে; আমার লোকসানে হেসেছে, মশকরা করেছে আমার অর্জনে, হেয় করেছে, আমাকে বন্ধুহীন করেছে, তাতিয়ে দিয়েছে আমার শত্রুকে? কী এর কারণ? কারণ, আমি একজন ইহুদি।
শাইলকের জায়গায় একজন ফিলিস্তিনিকে আর ইহুদির জায়গায় মুসলমানের নাম বসালে যে বাস্তবতা ফুটে ওঠে, সেটাই কি ফিলিস্তিন নামের দুনিয়ার বৃহত্তম ছাদখোলা কারাগারের সত্যিকার ছবি নয়?

হামাস হয়তো হঠকারী। কারণ, একজন ইসরায়েলির মৃত্যুর বদলায় অগণিত ফিলিস্তিনিকে হত্যা করাই ইসরায়েলি রেওয়াজ। ফিলিস্তিনিরা তা জানে। জানে বলেই মৃত্যুর সংখ্যায় তারা ভীত হয় না। কিন্তু ইসরায়েলের জন্য একজন ইসরায়েলি নাগরিকের জীবনও অনেক মূল্যবান। রোববার বিকেল পর্যন্ত নিহত ইসরায়েলির সংখ্যা কমপক্ষে ছয়শ। এদের মৃত্যৃর দায় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের গাফিলতি। এক বন্দি সেনা গিলাদ শালিতের বিনিময়ে ১০০ ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল ইসরায়েল। এবার শতাধিক ইসরায়েলি, যাদের মধ্যে সেনা কমান্ডাররাও আছেন, তাদের বিনিময়ে ইসরায়েলের কারাগার খুলে দেওয়ার দাবি তুলেছে হামাস। মিসর বলেছে, ইতোমধ্যে বন্দি বিনিময়ের মধ্যস্থতার কথা বলছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ।

নিহত গাজাবাসীর সংখ্যা এখন পর্যন্ত ২৬৬; আহত পৌনে দুই হাজার। গাজাবাসীরা তো শান্তিতেও মরে, যুদ্ধেও মরে। তাই টিভিতে দেখা যায়, আসন্ন মহা হামলার মুখেও তারা উল্লসিত। তারা জানে, নিজে মরলেও জাতিকে টিকিয়ে রাখতে হবে। জানে বলেই বোমা-বারুদের ধ্বংসস্তূপে সেখানেও যুবক-যুবতীরা প্রেমে পড়ে। গণবিবাহ হয় হাজারো যুবক-যুবতীর। তাদের সন্তান হয়। সন্তানের পিতা শহীদ হলে সন্তান তার জায়গায় এসে দাঁড়ায়।

এমন ত্রাস যে, গর্ভের শিশুও জন্মাতে ভয় পায়! এই জীবন খাঁচায় বন্দি প্রাণীর জীবন। ভাগ্য বদলাতে তারা তখন পাথর, রাইফেল বা রকেট হাতে নেয় কিংবা নিজেকেই বোমা বানায়। বন্দিশালায় শৈশব বলে কিছু থাকে না। তবু সেই শিশুরা বলে না, ‘মা, আমাকে তুই আনলি কেন? ফিরিয়ে নে।’ বোমা-বারুদ আর মৃত্যুর আবহে নারী-পুরুষের মিলন তবু হয়, সন্তানের আশায়। হায় সন্তান! এত জন্মায় তবু কমে যায় জাতির আকার। ধ্বংসপ্রায় ফিলিস্তিনি জাতিকে টেকাতে, অজস্র মৃত্যুর সঙ্গে পাল্লা দিতে তাই আরও আরও জন্ম চাই; শহীদদের শূন্যস্থান ভরাট করার জন্য। জন্ম আর মৃত্যুর এ কোন অঙ্ক কষে যাচ্ছে আজ ফিলিস্তিন! কোনো কালো অক্ষর, কোনো সংখ্যা দিয়ে কি সেই হিসাব নির্ণয় করা যাবে?

ফারুক ওয়াসিফ: লেখক ও সমকালের পরিকল্পনা সম্পাদক
farukwasif0@gmail.com

আরও পড়ুন