তুমি নিস্কাম হও এবং কাজ করে যাও। ফলের আশা করো না- কৃষ্ণ এবং অর্জুনের এই মিথলজিক্যাল সংলাপটি যোগাযোগবিদ্যার জায়গা থেকে ভীষণ শক্তিশালী একটি উক্তি। করোনাকালের সংগনিরোধ গৃহবন্দিত্ব জীবনে এলো জন্মাষ্টমী। অর্থাৎ, কৃষ্ণের জন্মতিথি।

কৃষ্ণ মথুরার রাজপরিবার যাদব বংশের বসুদেব ও দেবকীর অষ্টম পুত্র। 'কৃষ্ণ' একটা জেনেরিক নাম। যেমনটি ঈশ্বর, ভগবান, মালিক- সবই তার নাম। কৃষ্ণের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা, তিনি ছিলেন প্রখর কূটবুদ্ধিসম্পন্ন পুরুষ এবং মহাভারতের ইতিহাসে মোড় ঘোরানো যুদ্ধ কুরুক্ষেত্র ও তার পরিণতিতে 'চতুর প্রভাব বিস্তার' করতে পারা। কৃষ্ণের মতো বিরাট এক ব্যক্তিত্বের পাশে সনাতন মিথলজির সব বড় বড় রাজা বড় অসহায়। কৃষ্ণের মহিমা নানা ব্যঞ্জনায় নানাভাবে মহাভারতে প্রকাশিত। কংস নামক 'অত্যাচারী বুর্জোয়া সরকারে'র পতনের মাধ্যমে নিপীড়িতের শাসন প্রতিষ্ঠা করে তিনি যে বিপল্গবের সূচনা করেছিলেন, তা রীতিমতো 'সোভিয়েত মথুরা ইউনিয়ন' প্রতিষ্ঠার চেয়ে কম কী! কালে কালে যদিও সংশোধনবাদীদের হাতে কৃষ্ণ ভক্তিহীন পূজা আর মহিমাহীন স্তুতিতে পরিণত হয়েছেন বেশি।

গজেন্দ্রকুমার মিত্র তার 'পাঞ্চজন্য' গ্রন্থে বলেছেন, কৃষ্ণ চরিত্রের ঐতিহাসিক পারম্পর্য, পৌরাণিক অতিশয়োক্তি বা মুগ্ধ স্তুতিগান খুঁজতে গেলে হয়তো হতাশ হতে হবে। 'কৃষ্ণচরিত' রচনায় শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকের পরিচয় দিয়েছেন মহাত্মা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি লিখেছেন, 'সম্পূর্ণ কৃষ্ণচরিত্র প্রকাশ করিয়াও আমি সুখী হইলাম না'।

রাধা তার সখা কৃষ্ণকে বলতেন- তুমি এত কাঁদো কেন? কৃষ্ণ উত্তর দিলেন, আমার চোখ থেকে যা গড়ায়, তা আমার কান্না নয়, এ হলো যমুনার জলে আমার মুরলি বাঁশির সুর। রাধা খুব স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড অথচ কৃষ্ণ সবসময় হেঁয়ালি করতেন। তাই হেঁয়ালির চোটে সৃষ্ট বিরহের কারণে রাধা তাকে ডাকতেন হেঁয়ালির রাজা। যুগে যুগে কবিরা গেয়েছেন রাধার বিরহগীতি। রাধা-বিরহের গানে উত্তর খোঁজা হয়েছে 'রাধাহীন কেমন আছে কৃষ্ণ' কিংবা 'কৃষ্ণের বাঁশিতে সুর কেন এমন করুণ'। কুরুক্ষেত্রের মহারণের পর সারা ভারত কৃষ্ণের পদতলে এলে তিনি হয়ে ওঠেন রাজাদের রাজা। তার আগে তিনি অবশ্যই সাধারণ একজন মানুষ, যিনি ভাদ্রের এই অষ্টমী-রাতে জন্ম নিয়েছিলেন। তাই আজ জন্মাষ্টমী।

কৃষ্ণকে পাওয়ার উপায় কী? আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে চারপাশের সব রহস্য উন্মোচনই হলো কৃষ্ণ-অন্বেষণ; যার শাস্ত্রীয় নাম- প্রার্থনা; লৌকিক নাম- গবেষণা। গবেষণায় যেমন একটি লক্ষ্যের দিকে ছুটে যেতে হয়, তেমনি কৃষ্ণকে লাভ করতে প্রয়োজন একাগ্রচিত্ত আরাধনা। কোনো কিছু লাভের জন্য সেই লক্ষ্যমুখী ধাবমান যাত্রাই হলো আরাধনা।

কৃষ্ণ বড় রহস্য! কৃষ্ণ মানে আঁধার, ব্ল্যাকহোল। যার শেষ নেই। প্রেম-যুদ্ধ-বন্ধুত্ব-রাজ্যশাসন-বাৎসল্য-দায়িত্ব-ছলনা-লীলা; কৃষ্ণের পরতে পরতে একেক খোসা। আমরা মুগ্ধ ভক্তরা একটি খোসা খুলি, ভেসে উঠে নতুন খোসা। এজন্যই কৃষ্ণকে বোঝা ভার, তাই বলা হয় ভগবানকে পাওয়া এত সহজ নয়। কৃষ্ণ ছিলেন রতিরসিক, ছিলেন বর্ণময়, অতি অবশ্যই রমণীমোহন। তার চেয়েও বড় কথা তিনি 'সখা কৃষ্ণ'। কৃষ্ণ মানে 'অজানা'! জন্মাষ্টমী তিথিতে কৃষ্ণের জন্মকে স্মরণ করা মানে অজানা জ্ঞানের অন্বেষণে নিজেকে ধীরস্থির রাখার শপথ। কৃষ্ণের জন্মদিন পালন মানে, নতুন কিছুর মুখোমুখি হওয়ার সাহস অর্জন। শ্রীকৃষ্ণ ছলনাও করেছেন, নিজেই নীতি ভেঙেছেন যুগের প্রয়োজনে। তাই জন্মাষ্টমীতে কৃষ্ণের প্রতি ভক্তিভাব জাগ্রত হওয়ার পাশাপাশি যুক্তিবাদও প্রতিষ্ঠা করা চাই। কৃষ্ণকে পাওয়া মানেই তো অনাদায়ী হক আদায়। আমরা যখন কৃষ্ণের আরাধনা করি, তখন আসলে অজানা জ্ঞানের মোকাবিলা করি। মোকাবিলার সংসারে যখন আমরা কিছু পাই, তখন আসলে জ্ঞানপ্রাপ্ত হই। কৃষ্ণগহ্বরের রহস্যের যেমন কোনো কূলকিনারা নেই, তেমনি শেষ নেই জ্ঞানান্বেষণেরও। জ্ঞান আর আলোমুখী যাত্রা অব্যাহত রাখতে কৃষ্ণের দিকে ধাবিত হতে হয়। এই ধাবমান যাত্রাই কৃষ্ণপ্রেম। শুভ জন্মাষ্টমী!

শিক্ষক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়