শিবকে ডাকা হয় মহাদেব নামে। মহাদেব, নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে তিনি দেবতাদের বোর্ড অব ডিরেক্টর! দুর্গাপূজায় ঠাকুর দেখতে গিয়ে আমরা কি কখনও খেয়াল করেছি দুর্গাপ্রতিমার ওপরে ছোট্ট করে একটি মূর্তি থাকে শিবের? শিব যেন উঁকি দিয়ে কৈলাস থেকে দেখছে- বাপের বাড়িতে বউ ঠিকঠাক যত্নআত্তি পাচ্ছে তো? 'না পেলে' কী হবে বা হতে পারে সেজন্য বেশিদূর যেতে হবে না। তারও উপমা রয়েছে শ্বশুড়কুলকে ধ্বংস করতে শিব কী তা বনৃত্যই না করলেন পার্বতীর জন্য! রবীন্দ্রনাথেই দারুণভাবে লিখেছেন- 'প্রলয়-নাচন নাচলে যখন আপন ভুলে/ হে নটরাজ, জটার বাঁধন পড়ল খুলে'।
শিব এক মহাবিচিত্র দেবতা। 'কৈলাস বিপ্লবী পার্টি'র বিপ্লবী সাধারণ সম্পাদক শিব শ্রেণিগতভাবে জাতীয় বুর্জোয়া হলেও যার হৃদয়ে উদার মানবতাবাদের ধ্বনিই প্রতিধ্বনিত হয়। তার গলায় বাসুকী নাগ, জটায় অর্ধচন্দ্র। সেই জটার ওপর থেকে প্রবাহিত হচ্ছে গঙ্গা। হাতে তার অস্ত্র ত্রিশূল ও বাদ্য ডমরু। এসব নিয়ে তিনি দেবতাদের দেবতা, মানে মহাদেব। চাট্টিখানি কথা নয়! হিন্দু পুরাণের কী বিচিত্র এক জটাধর চরিত্র এই শিব। সংসারে এমন খুব কমজনের সাক্ষাৎ মিলবে যিনি সংসার রক্ষায় নিজের কণ্ঠে বিষ ধারণ করে নীলকণ্ঠ হয়ে থাকতে পারেন? সংহার আর সেবা দুটোই যার সমান নীতি, এমনই দেবতা তিনি। অথচ, অদ্ভুত হলেও সত্যি- 'মহা দেবতা' হয়েও স্বর্গের 'রাজ আসন' নেননি তিনি। শ্মশান আর পাহাড়-জঙ্গলকেই করেছেন বসতি। এই দুর্গাপূজায় শিবের শিক্ষা কী? শিবের দেবরাষ্ট্র তত্ত্বের ভিত্তি হলো নিপীড়িতদের জন্য সর্বহারার একনায়কত্ব। মানে, শিব হলেন বুর্জোয়া দেবতা প্রজাপতি ব্রহ্মার বিরুদ্ধে বল প্রয়োগের অসামান্য এক বিপ্লবী ব্যক্তিত্ব। যিনি পুঁজিবাদী দেবত্বের হাত থেকে ত্রাণের কর্তা হিসেবে উৎপীড়নের শক্তিশালী সামরিক, বেসামরিক, সুশীল ও আমলাতান্ত্রিক যন্ত্রকে তুচ্ছ জ্ঞান করতে জানেন। কার্ল মার্কসের ভাষায় প্যারি কমিউন যদি হয় প্রথম শ্রেণিহীন রাষ্ট্র, তবে শিবের কৈলাস হিন্দু মিথোলজির প্রথম 'সর্বহারার রাজত্ব'। কারণ, অহংকারে ভরা শ্বশুরের দর্প নাশ করতে এক শিবই যথেষ্ট।
কী রকম ব্যাপারটা? আমাদের মনে অনেক আশা। আশায় বসতি আমাদের। কিন্তু আশা যখন মাত্রা ছাড়িয়ে বেপরোয়া আকার নেয়, তার নাম আকাঙ্ক্ষা! মানুষের মনের অবদমিত ইচ্ছা হলো আকাঙ্ক্ষা। আকাঙ্ক্ষা থাকে চাপানো। আকাঙ্ক্ষা অধীর করে, হৃদয়রুদ্ধ করে। আকাঙ্ক্ষা তীব্র, এর এমনই স্বভাব যে, আমরা নিজেরাই জানি না 'কী জানি পরান কী যে চায়!' মহাভারতের যুধিষ্ঠিরের 'গর্ব' আর 'অহংকার' ছিল তার 'ধর্মের আকাঙ্ক্ষা'। ধর্মের আকাঙ্ক্ষার ওপর এমনই তার অহংকার, এমনই তার গর্ব যে, শকুনির চালে পাশা খেলায় ছল হচ্ছে, সেটা জেনেও যুধিষ্ঠির নিজের স্ত্রী দ্রৌপদী আর পা ব ভাইদের পণ রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন! মহাভারত পাঠের পাশাপাশি তাই আমাদের প্রশ্ন তুলতে হয়, এ কেমন আকাঙ্ক্ষা? এ কেমন পরম্পরা, যে ধর্মের গর্বে গর্বিত আর ধর্মের অহংকারে বলীয়ান যুধিষ্ঠিরের জন্যই স্ত্রী-ভাই-মা সবাই বছরের পর বছর কষ্ট পেয়েছে? ধর্ম নামক যে আকাঙ্ক্ষার জন্য যুধিষ্ঠির গর্ব করতেন, সেই ধর্মই সারাজীবন তার ওপর হয়ে পড়ল বোঝা। শিব তেমনটি নন। দক্ষিণ ভারতে হিন্দু মিথলজির মহাদেবতা শিবের ভিন্ন এক রূপ দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। তা ব ও ধ্বংসাত্মক নৃত্যের দেবতা শিব বা নটরাজন। যিনি কাল-মহাকাল বেশে বিশ্ব ধ্বংসের উদ্দেশ্যে প্রলয় নাচ নাচেন। অহংকারী শ্বশুরের কবল থেকে পার্বতীকে উদ্ধারে শিবের এই নৃত্য নটরাজন নৃত্য নামে খ্যাত। মিথলজি মতে, নটরাজনের মনে ছিল অনেক আশা। সেই আশা না মিটতেই মধুর ও সুচারু নৃত্যকলা পরিণত হয় তা ব নৃত্যে। নটরাজনের এই আবেগময় নৃত্যকে পার্বতীর নাচ রূপে কল্পনা করা হয়। নটরাজন তাই মিথলজিতে 'আশা'র দেবতা। আশা পূর্ণ করতেই হিন্দু নারীদের দলে দলে নটরাজনের (মহাদেব) পূজা দিতে দেখা যায়। মিথলজি থেকে চোখ ফেরাই সাহিত্যে। কবি মাইকেল মধুসূদন বলছেন, 'আশার কুহক-ছলে!' কবি নবীনচন্দ্র সেন পলাশীর যুদ্ধের পরাজয় বেদনাভরা মন নিয়ে লিখলেন- 'ধন্য আশা কুহকিনী'। কথায় আছে, 'অতি আশা নিষ্ফম্ফল'। এই বঙ্গের গায়ক গেয়েছেন- 'কী আশায় বাঁধি খেলাঘর, বেদনার বালুচরে'। কখনও হতাশ প্রেমিকের উদাস মনে সুর ওঠে- 'বেশি কিছু আশা করা ভুল বুঝলাম আমি এতদিনে'। নৈরাশ্যবাদীরা বলেন, 'আশা সে তো মরীচিকা'। আমরা কি জানি, আমাদের আশা (গর্ব আর অহংকার) একসময় আমাদের ওপর বোঝা হয়ে পড়ে? বোঝা কিন্তু নিজে চলতে পারে না, তাকে বয়ে নিতে হয় সারাজীবন। মহাদেব জানতেন, আর জানতেন বলেই নিরাসক্ত থেকে হিমালয়ের ওপর গভীর মৌনী ধ্যানী হয়ে থাকতেন, প্রয়োজন মতো প্রলয় নাচও দিতে পারতেন। তাই তিনি মহান, এতটাই মহান যে, যিনি স্বর্গকে তুচ্ছ করে নন্দী ও ভৃঙ্গিকে সঙ্গে নিয়ে শ্মশানে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছেন। তাকে অস্বীকার করারও উপায় নেই, আবার স্বীকার করলেও পদে পদে দেবতাদের বিপদ। যিনি নিজে বিষ খেয়ে হজম করতে পারেননি (কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন, তাই শিবের আরেক নাম নীলকণ্ঠ), তাকে হজম করবে কে?
শিবকে উদ্দেশ করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, 'শুনিয়ে দিল অভয়বাণী ঘর-ছাড়ারে (অর্থাৎ সর্বহারাদের), আপন স্রোতে আপনি মাতে, সাথি হল আপন-সাথে, সব-হারা সে সব পেল তার কূলে কূলে ...।' অতএব, শিব যেমন জলের মতো তরল, তেমনি বরফের মতো কঠিন। যার তা বনৃত্য থামাতে করজোড়ে গাইতে হয়- 'প্রলয়-নাচন নাচলে যখন আপন ভুলে/ হে নটরাজ, জটার বাঁধন পড়ল খুলে'।
শিক্ষক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়