ঢাকা মঙ্গলবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২৩

গাছ-কাটা বিশ্ববিদ্যালয়

অন্যদৃষ্টি

গাছ-কাটা বিশ্ববিদ্যালয়

.

আব্দুল্লাহ আল মামুন

প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০২৩ | ০০:১৪

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অনেকভাবেই দৃষ্টি কাড়ে। যেমন এর বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, তেমনই অপরূপ এর নিসর্গ। ৬৯৭ একরের সবুজ প্রকৃতি ও জলাশয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ। কিন্তু সেটিও এখন খোয়া যেতে বসেছে। আর তা ঘটাচ্ছে আর কেউ না, স্বয়ং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

সর্বশেষ ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ) একাডেমিক ভবন নির্মাণের জন্য ১ নভেম্বর রাতের আঁধারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) পেছনের ৫৬টি গাছ কাটা হয় (সমকাল, ১ নভেম্বর)। অথচ ‘সুন্দরবন’ নামে পরিচিত এই বনভূমিতে ভবন নির্মাণের বিরোধিতা করে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষার্থীরা। ‘গাছ কাটা নিষেধ’ লিখে ব্যানারও ঝোলান তারা।
অবস্থা এমন হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন হলে প্রশাসন যেন বনভূমি ছাড়া কিছুই দেখে না। প্রশাসনের গাছ কাটার এই অদম্য আগ্রহের গোড়ায় রয়েছে ২০১৯ সালে ১ হাজার ৪৪৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকার অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ আসা। তিন ধাপে বাস্তবায়ন হতে যাওয়া এ প্রকল্পের ২২টি ভবন ও একটি সার্কুলার রোড তৈরিতে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের প্রশাসনের পরিকল্পনা মানলে কাটা পড়ত সহস্রাধিক গাছ। এ নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আপত্তি জানালেও প্রশাসন ছিল অটল। ওই বছরের ২৩ আগস্ট প্রশাসনের সিদ্ধান্তে গাছে প্রথম কোপটি পড়ে। ছাত্রদের নতুন তিনটি হল নির্মাণের জন্য এদিন সকালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ হলের পাশের শান্তিনিকেতন নামে পরিচিত স্থানের অর্ধশত গাছ কেটে ফেলা হয়। অথচ এখানে হল নির্মাণ করতে হলে প্রায় ৭০০ গাছ কাটা পড়বে বলে আগে থেকেই প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিলেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। হঠকারী সিদ্ধান্তে ওই দিন গাছ কাটার পর তীব্র আন্দোলনে অবশ্য স্থান পরিবর্তনে বাধ্য হয় প্রশাসন। তবে গাছ না কেটে অবকাঠামো নির্মাণের পথ থেকে ফেরানো যায়নি তাদের। এর পর নানা অজুহাতে গাছ কাটা হয়েছে, হচ্ছে। 

ছাত্রদের হল নির্মাণের স্থান পরিবর্তন করলেও ছাত্রীদের নতুন তিনটি হল নির্মাণ করতে ঠিকই ২০৭টি গাছ কাটা হয় (সমকাল, ৪ জুন ২০২৩ )। এর পর ২০২২ সালের জুলাইয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলের সামনে ছয়তলা স্পোর্টস কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য শতাধিক গাছ কাটে প্রশাসন। একই সময়ে সমাজবিজ্ঞান অনুষদ ভবন সম্প্রসারণের জন্য পেছনে থাকা দীর্ঘদিনের বনভূমির ২০০টি গাছ কেটে ফেলা হয়। ছাত্রীদের খেলার মাঠ নির্মাণের জন্য ৬ নভেম্বর কাটা হয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে আরও প্রায় ১০০টি গাছ। এ ছাড়া জয় বাংলা ফটক-সংলগ্ন আবাসিক এলাকায় তিনটি ১০ তলা ভবন নির্মাণের জন্য কাটা পড়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ৫০টি গাছ। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ-প্রকৃতি বাঁচিয়ে উন্নয়ন কাজ চালাতে অংশীজন বারবার একটি পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান করার কথা বললেও প্রশাসন সে পথে হাঁটেনি। ১৯৬৭ সালে প্রথিতযশা স্থপতি মাজহারুল ইসলামের একটি লে-আউটকে মাস্টারপ্ল্যান বলে দাবি করে আসা প্রশাসন ২০১৯ সালে বুয়েট অধ্যাপক স্থপতি আহসান উল্লাহ মজুমদারের নেতৃত্বে আরেকটি লে-আউটকে রিভাইজড মাস্টারপ্ল্যান বলে হাজির করে। তবে জাবির নগরবিদরাই একে মাস্টারপ্ল্যান বলে মানেন না। তারা বলছেন, ডিটেইলড প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি)। এ ছাড়া মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নে যেখানে পরিবেশবিদ, ভূগোলবিদ, ভূতত্ত্ববিদ ও স্থপতিদের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন, এটিতে তাও করা হয়নি। 

অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের পর উপাচার্য হয়েছেন অধ্যাপক নূরুল আলম। তবে গাছ হন্তারক ভূমিকা থেকে একচুলও সরানো যায়নি 
জাবি প্রশাসনকে। 

আব্দুল্লাহ আল মামুন: সাংবাদিক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, জাবি

আরও পড়ুন