ঢাকা শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪

পথশিশুরা অবহেলিতই থাকবে?

অন্যদৃষ্টি

পথশিশুরা অবহেলিতই থাকবে?

প্রতিকী ছবি

ওসমান এহতেসাম 

প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০২৩ | ০০:১৫

পথশিশু হলো সেসব শিশু, যারা দারিদ্র্য, গৃহহীনতা বা উভয় কারণে শহর, নগর বা গ্রামের রাস্তায় বসবাস করে। কেউ কুলির কাজ করে, ইট ভাঙে; ফুল, চকলেট বা টুকটাক কিছু বিক্রি করে; কাগজ কুড়ায়; ভিক্ষা করে। এদের পথই ঘর, পথই আশ্রয়। কারও বাবা আছে, মা নেই। কারও মা আছে, বাবা নেই। আবার কারও বাবা-মা কেউ নেই।

মানুষের কিল-ঘুসি-লাথি খেয়ে, হোটেলের উচ্ছিষ্ট চেটে এরা বড় হয়। খুব কম বয়স থেকেই বিভিন্ন রকম অপরাধীকে দেখে দেখে এরা বেড়ে ওঠে। ভালোমানুষরূপী দানবদের ভয়ংকর চেহারার সঙ্গেও এদের পরিচয় হয়। এরা ব্যবসায়ীদের অপকর্ম, রাজনীতিবিদদের ছলচাতুরী, পুলিশের দু’মুখো রূপের খবরও রাখে। হাল আমলের নায়ক-নায়িকা, গানের শিল্পীদের খুব পছন্দ করে। তাদের চলন-বলন নকল করে আনন্দ পায়। খারাপ মানুষ এদের খারাপ পথে নিয়ে যায়। অবৈধ ব্যবসায়ীরা মাদকদ্রব্য বহন ও বিক্রিতে এদের ব্যবহার করে। ফলে এরাও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত পথশিশু জরিপ ২০২২-এর তথ্য বলছে, এসব শিশুর ৬৪ শতাংশই পরিবারের কাছে ফিরে যেতে চায় না। তাদের ৯২ দশমিক ১ শতাংশ ছেলে এবং ৮৪ দশমিক ৫ শতাংশ মেয়ে বিভিন্ন শ্রমে জড়িত। ২০ দশমিক ৯ শতাংশ পথশিশু বর্জ্য কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। এ ছাড়া ভিক্ষা করে বা ভিক্ষায় সহায়তা করে ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ পথশিশু। জরিপের এসব তথ্যে পথশিশুদের চরম দুর্দশার চিত্র উঠে এসেছে। 

তারা পাবলিক বা খোলা জায়গায় থাকে ও ঘুমায়। প্রায় অর্ধেক সংখ্যক শিশু মাটিতে ঘুমায় শুধু একটি পাটের ব্যাগ, শক্ত কাগজ, প্লাস্টিকের টুকরা বা একটি পাতলা কম্বল নিয়ে। পথশিশুর ৮২ শতাংশই নানা ধরনের পেটের অসুখে আক্রান্ত। এর পেছনে যে অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ দায়ী, তা বলাই বাহুল্য। পাশাপাশি নোংরা পরিবেশে থাকার কারণে এদের মধ্যে চর্মরোগের হার অনেক বেশি। ভাসমান এসব শিশুর ৬১ শতাংশই কোনো না কোনো চর্মরোগে আক্রান্ত। রোগাক্রান্ত এই শিশুদের জন্য নেই চিকিৎসার ব্যবস্থা। তাদের নিয়ে সমাজ কিংবা সরকারের নেই কোনো চিন্তাভাবনা। তাদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও মাথাব্যথা নেই কারও। 

পথশিশুর একটি বড় অংশের নেই অক্ষরজ্ঞান। যারা এনজিও কিংবা অন্য কোনো সহায়ক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাথমিক শিক্ষা নেয়, তাদের অবস্থাও সুখকর নয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাবে পরবর্তী সময়ে সমাজের মূলধারায় মিশে যাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় এই শিশুরা। দু’বেলা খাবারের অভাবে অদক্ষ শ্রমিক, বাসের হেলপার, ড্রাইভারসহ নানা ধরনের পেশায় যুক্ত হতে বাধ্য হয় বেশির ভাগই। 
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্যমতে, পথশিশুর ৮৫ শতাংশই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মাদকে আসক্ত। অন্যদিকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পথশিশুর ৫১ শতাংশ ‘অশ্লীল কথার শিকার’ হয়। শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হয় ২০ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি যৌন হয়রানির শিকার হয় মেয়েশিশু। কেউ কেউ বিভিন্ন চক্রের মাধ্যমে পাচার হয়ে যায়। কোনো কোনো গ্যাং তাদের যৌনকর্মী হতে বাধ্য করে। 

সারাদেশে অনেক বেসরকারি সংগঠন পথশিশুদের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়ালেও দিন শেষে তাদের পথেই ফিরে যেতে হয়। তাদের পুরোপুরি পুনর্বাসনের জন্য খুব বেশি উদ্যোগ নেই। সরকারি কিছু উদ্যোগ আছে বটে, তবে তা টেকসই নয়। এটি ঘায়ে মলম দেওয়ার মতো। 
আসলে তাদের দরকার স্থায়ী পুনর্বাসন; পারিবারিক সান্নিধ্য। সেটা কীভাবে করা যায়, তা সরকারকে ভাবতে হবে।

ওসমান এহতেসাম: সাংবাদিক, চট্টগ্রাম
osmangonistudent5@gmail.coma
 

আরও পড়ুন

×