ঢাকা শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪

নতুন কারিকুলাম নিয়ে বিতর্ক কেন

শিক্ষা

নতুন কারিকুলাম নিয়ে বিতর্ক কেন

লোগো

মুহাম্মদ ইয়াসীন ইবনে মাসুদ

প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০২৩ | ০০:১৭

রাইয়ানের (কাল্পনিক নাম) মা তাঁর স্বামীর সঙ্গে এক ছুটির দিন বিকেলে বাসায় বসে টিভিতে আমির খানের ‘তারে জমিন পার’ ছবি দেখছেন, মুগ্ধ হচ্ছেন আর বলছেন, ‘ওয়াও! পড়ানোর কত ভালো কায়দা; এমন যদি আমাদের দেশে থাকত!’ এই সময়ে রাইয়ানের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া ছোট বোন তার আঁকা একটি ছবি নিয়ে মায়ের কাছে এসে ছবিতে কী রং করা যায় জিজ্ঞেস করার সঙ্গে সঙ্গে একটি চড়ের শব্দ শুনতে পান রাইয়ানের বাবা। সঙ্গে যা শুনতে পান তিনি– ‘পড়া বাদ দিয়ে ছবি আঁকা চলছে? পাশের বাসার ভাবির মেয়ে গত পরীক্ষায় তোমার চেয়ে দেড় নম্বর বেশি পেয়েছে; সেটি মনে নেই? এভাবে ছবি আঁকলে এবারও আমার মুখ দেখানোর অবস্থা থাকবে না। যাও, আঁকা ছেড়ে পড়ালেখা করো।’ এর পর রাইয়ানকে কাদামাখা জামা নিয়ে ফুটবল হাতে বাইরে থেকে ফিরতে দেখে তার পিঠেও কঠিন দু’ঘা বসিয়ে দেন তিনি। বলেন, ‘ফুটবল খেলে বিকেল বেলার দুই ঘণ্টা সময় নষ্ট করলে এবার আর ক্লাসে প্রথম হতে পারবে না।’ 

এই হলো আমাদের অভিভাবকদের মানসিক বিকাশের নমুনা। বিদেশের সিনেমায় শিশুদের স্কুলে বা স্কুলের বাইরে বিভিন্ন সৃজনশীল কাজ করতে দেখে খুব হিংসা করি, প্রশংসা করি এবং আফসোস করি আমাদের শিশুরা সেই সুযোগ পায় না বলে। কিন্তু সেই আমার কাছেই যখন আমার শিশু খেলতে যাওয়ার অনুমতি চায় বা ছবি আঁকার অনুমতি চায়, তখন আমিই আতঙ্কিত হয়ে পড়ি এই ভেবে, এটি করলে আমার শিশু গোল্লায় যাবে। তার ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে। যেখানে ফিনল্যান্ডের মতো দেশগুলো বিদ্যালয়ে শিশুদের তাদের পছন্দ অনুযায়ী কাঠের কাজ, সেলাই, বুনন ইত্যাদি ভোকেশনাল কাজ শেখে। ব্রিটিশ, জাপানি বা আমেরিকান শিশুরা বিদ্যালয়ে খাবার বানানো শেখে এবং বিভিন্ন খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করে। সেখানে আমাদের অনেক অভিভাবক এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। সরকার যখন উন্নত দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অনুকরণে একটি ভালো কারিকুলাম তৈরি করে এতে শিশুদের বিভিন্ন জীবনমুখী বিভিন্ন কাজ শেখাতে চাচ্ছে; পরীক্ষার বোঝা কমাতে চাচ্ছে; গাইড বইনির্ভর পড়ালেখা বন্ধ করতে চাচ্ছে; সেখানে আমাদের অনেক অভিভাবক কোনো রকম বিচার-বিশ্লেষণ না করে সরবে এর বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। এর বিপক্ষে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য প্রচার করে ভাইরালও হচ্ছেন অনেকে। তাদের বক্তব্য– বিদ্যালয় শুধু পড়াবে। পড়ার বাইরের সব কিছু শেখানোর দায়িত্ব তারা নিজেরাই নিতে চান। শিশুরা বিদ্যালয় থেকে ফেরার পর তাদের বিভিন্ন প্রাইভেট টিউটরের কাছে পাঠিয়ে বা কোচিংয়ে পাঠিয়ে এগুলো শেখাতে চাচ্ছেন তারা। এ চিন্তাটি যে সম্পূর্ণভাবে অজ্ঞানতাপ্রসূত, তা সহজেই বোঝা যায়। বিদ্যালয়ের কর্মপরিধি, উন্নত দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, কারিকুলাম ইত্যাদি বিষয়ে একদম অজ্ঞ থাকার কারণে এমন মতবাদ প্রচার করছেন তারা। 

অনেক বিশেষজ্ঞ আবার কারিকুলামের সমালোচনা না করে বইয়ের মান, বিষয়বস্তুর উপযুক্ততা, লেখার মান, অনলাইন মাধ্যম থেকে কপি করা ইত্যাদি বিষয়ে সমালোচনা করছেন। এ সমালোচনার পেছনে যুক্তি আছে নিশ্চয়। তবে কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে এ ধরনের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে সেগুলো সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে দৃঢ়সংকল্প প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ আবার মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে এবং মূল্যায়নে নিয়োজিত শিক্ষকদের দক্ষতা ও সততা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন। তাদের মতে, প্রজেক্টভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতা যেমন আমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নেই, তেমনি ধারাবাহিক মূল্যায়নের কার্যকরী অভিজ্ঞতাও নেই। ফলে এ মূল্যায়নের কার্যকারিতা নিয়ে তারা সন্দিহান। তবে এ বিষয়ে উন্নয়ন ঘটাতে সরকার একটি বড় প্রকল্পের মাধ্যমে সারাদেশের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এ প্রশিক্ষণ চলমান। আশা করা যায়, প্রশিক্ষণ সমাপ্ত হলে শিক্ষকরা প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করবেন।

সততার চর্চা একটি সামাজিক বিষয়। পুরো সমাজে সততার চর্চা হলেই কেবল শিক্ষকদের কাছ থেকে পুরোপুরি সততা আশা করা যায়। কেউ কেউ আবার আমাদের ভৌত অবকাঠামোর অপ্রতুলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, বর্তমান অবকাঠামো এ প্রজেক্ট ও অ্যাসাইনমেন্টভিত্তিক কার্যক্রম এবং সহপাঠক্রমিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একেবারেই অপ্রতুল। তাদের কারও কারও মতে, ভোঁতা ছুরি দিয়ে মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচারের মতো হবে এ বিষয়টি। আশা করা যায়, অচিরেই অবকাঠামোর দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারব আমরা। 

যত আলোচনাই করা হোক; সারাবিশ্বে অপ্রচলিত সৃজনশীল পদ্ধতির তুলনায় বর্তমান কারিকুলাম যোগ্যতর এ বিবেচনায়– এর বহুল প্রচলন রয়েছে উন্নত দেশগুলোতে। পৃথিবীর সব উন্নত দেশ এমন কারিকুলাম বাস্তবায়ন করেই শিক্ষায় উন্নতি করেছে। আশা করি, আমাদের দেশও এই ব্যবস্থার সুফল পাবে শিগগিরই। তবে সব প্রসবেরই যেমন একটি বেদনা থাকে, তেমনি এই কারিকুলাম বাস্তবায়নের পথেও কিছু বেদনা সহ্য করতে হবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে। এ ব্যবস্থাটি যেহেতু বহুল প্রচলিত এবং পরীক্ষিত, তাই আগের ব্যবস্থাগুলোর মতো এটিকে বাদ দিয়ে আবার নতুন কারিকুলাম প্রণয়নের চিন্তা কোনোক্রমেই না করে বরং বিভিন্ন সময়ে নজরে আসা দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার মাধ্যমে এটিকে স্থায়ী রূপ দেওয়া উচিত। আমাদের দেশের উপযোগী করার জন্য কিছু পরিমার্জনও করা যেতে পারে। 

মুহাম্মদ ইয়াসীন ইবনে মাসুদ: শিক্ষক, সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ, জামালপুর

আরও পড়ুন

×