ঢাকা শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪

মনোনয়ন মৌসুম: এমপি যদি হতে চান

ক্ষমতা

মনোনয়ন মৌসুম: এমপি যদি হতে চান

ইকরাম কবীর

ইকরাম কবীর

প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০২৩ | ০০:১৯ | আপডেট: ২৯ নভেম্বর ২০২৩ | ১৫:১৫

আমরা যখন জানতে পারি, নৌকার টিকিট পেতে একই পরিবার থেকে ভাবি ও দেবর মনোনয়নপত্র কিনেছেন, তখন বুঝতে পারি, এটি এক কৌশলগত সিদ্ধান্ত। একই পরিবার থেকে ভাই-বোনসহ মোট পাঁচজন মনোনয়নপ্রত্যাশীও দেখলাম। এক আসনে দেখলাম প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র কিনেছেন সাবেক এক সংসদ সদস্যের (প্রয়াত) তিন ছেলে।

আপাতদৃষ্টিতে এ চিত্রকে খুবই স্বাভাবিক ও আনন্দদায়ক মনে হয়। নির্বাচনের সময় হয়েছে। দেশের যে কোনো নাগরিক নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারেন। তবে একই পরিবার থেকে একাধিক ব্যক্তির এমপি হতে চাওয়ার বিষয়টি আমাদের একটু অন্যরকম ভাবায় এবং মনে বেশ কিছু প্রশ্নের উদয় হয়।

পরিবারের কেউ না কেউ মনোনয়ন পেয়েই যাবেন– এ আশা তাদের নিশ্চয় আছে। আমরা বুঝতে পারি, এই পরিবারগুলো ক্ষমতা চায়। নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায়িত হয়ে আর্থসামাজিকভাবে প্রভাবশালী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়। পরিবারের একজন প্রভাবশালী হলে বাকি সবাই যে তেমনটা হন, তা আমরা ৫২ বছর ধরে দেখছি। আমাদের রাজনীতি হয়তো আগামী ৫০ বছরেও পরিবারকেন্দ্রিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না। কারণ বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির চর্চায় আমরা পরিবারের সদস্য ছাড়া আর কাউকে বিশ্বাস করি না।

মনোনয়ন চাইছেন খেলা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের তারকারাও। সেটাও খুব স্বাভাবিক– নিউ নরমাল। আমরা যেসব নিবেদিত রাজনীতিক অতীতে দেখেছি বা ইতিহাসে পড়েছি, তেমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখন আর বাংলাদেশে নেই। মানুষে যুবকবেলা থেকে সক্রিয় রাজনীতি করে তারপর এমপি হবেন, তেমন পরিস্থিতি এখন নেই। বর্তমানে যে কোনো পেশায় অনেক সময় কাটিয়ে হঠাৎ রাজনীতিবিদরূপে আবির্ভাব হওয়া সম্ভব। তবে আমরা শুনতে পাচ্ছি (ভুলও হতে পারে), এই তারকা কারও কারও সন্তানকে স্বেচ্ছায় বিদেশে ভূমিষ্ঠ করানো হয়েছে, যাতে সেই শিশু জন্ম থেকেই ওই দেশের নাগরিক হতে পারে।
শুধু এরা নন; আমাদের অনেকেরই এক পা বিদেশের মাটিতে। এখন ‘সেই’ আমরা যদি বাংলাদেশের আইনপ্রণেতা হতে চাই; লাখ-কোটি মানুষের ভাগ্যের দায়িত্ব নিতে চাই; তাহলে তা কতটা শোভন হবে বা ‘বিদেশে এক পা দেওয়া আমরা’ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের (যাদের দুই পা-ই এই মাটিতে) জীবন কতটা শুভ করতে পারব– তা নিয়ে সংশয় এবং প্রশ্ন রয়েই যায়। এবং সেই প্রশ্নের উত্তর 
বাতাসে ওড়ে।

পত্রিকান্তরে একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের কথা জানতে পেরেছি, তিনি মনোনয়নপ্রত্যাশী। আবার কুষ্টিয়ার কুমারখালী-খোকসা আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র কিনে সাড়া ফেলে দিয়েছেন একজন সরকারি নৈশপ্রহরী। এই নিরাপত্তাকর্মী ১৯ হাজার টাকার ট্রেজারি চালান জমা দিয়ে মনোনয়নপত্রটি তুলেছেন।

শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী মানুষটার এমপি হতে চাওয়ার প্রত্যাশার খবর আমাদের মনকে আন্দোলিত করে। আমরা খুশি হই। খুশি হই এই ভেবে যে, বাংলাদেশে এখন শ্রেণি অন্তর্ভুক্তির একটা পরিবেশ কিছুটা হলেও তৈরি হয়েছে। প্রতিবন্ধীদের নিয়ে আমরা এখন কথা বলছি। তাদের পড়ালেখা এবং আয়ের সুযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা করছি। তারা ধীরে ধীরে নিজেদের স্বাভাবিক মানুষের মতো ভাবতে শিখছেন। অতীতে তারা নিজেদের পূর্ণ মানুষ ভাবতে পারতেন না। এক সময়ের অসহায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যখন মূল জনস্রোতে আসতে শুরু করলেন, তখন আমরা বুঝলাম, তারা ‘মূল’-এর চেয়ে অধিকতর সৎ ব্যক্তি। যখন এই সৎ ব্যক্তিদের মনে মনোনয়নের আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয় তখন আমাদের ভালো লাগে। মনে হয়, আকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসতে পারে।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে: এই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কি মনোনয়ন পাবেন? আমাদের বিশ্বাস, তিনি পাবেন না। আমাদের দেশের রাজনৈতিক কোনো দলের বুকে এখনও সেই পাটা হয়নি যে, একজন প্রতিবন্ধীকে মনোনয়ন 
দেবে। প্রতিবন্ধীদের পেশি থাকে না, অর্থ থাকে না। আমাদের দেশে এখন এমপি হওয়ার জন্য আর্থসামাজিক পেশি প্রয়োজন।
তবে সরকারি নৈশপ্রহরী যখন এমপি হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ১৯ হাজার টাকা জমা দেন, তখন মনে প্রশ্ন জাগে। ‘সরকারি’ শব্দটা আমাদের মনে জনবান্ধব আবেগের জন্ম দেয় না, তা সবাই জানেন। ১৯ হাজার টাকা এই বাজারে অনেক কম হলেও তা জমানো কঠিন, অন্তত একজন সরকারি নিরাপত্তাকর্মীর পক্ষে।

আমাদের অনেকেরই হিরো আলমের কথা মনে থাকার কথা। হিরো আলম জীবনে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে একসময় এমপি হতে চেয়েছিলেন। পরিবর্তন আনবেন; বলেছিলেন। আমরা হেসেছি, ভর্ৎসনা করেছি; টেলিভিশনে লাইভ করে কনটেন্ট বানিয়েছি; তাঁর পিটুনি খাওয়ার দৃশ্য দেখিয়েছি; ভিউ বাড়িয়েছি। এবার হিরো আলমের কথা আর শোনা যাচ্ছে না। ধারণা করা যায়, তাঁকে কেউ এমন কিছু বলেছেন, তিনি আর মনোনয়নপত্র কিনতে সাহস পাচ্ছেন না। কিংবা যারা তখন হিরো আলমকে সামনে এগিয়ে দিয়েছিলেন, তারা এবার তাঁর পেছন থেকে সরে গেছেন।

প্রশ্ন হচ্ছে: এবার এমপি হতে চাওয়া মানুষের সংখ্যা কি একটু বেশি, নাকি পত্রিকাগুলো এবার মনোনয়নের খবর বেশি বেশি ছাপছে?
হ্যাঁ, আসলে একটু বেশিই মনে হচ্ছে। সবাই যেন ভাবছেন, এবার সরকারি দল থেকে মনোনীত হয়ে গেলেই নির্ঘাত এমপি হয়ে যাব। এই মনস্তত্ত্বে যদি বিন্দুমাত্র সত্যতা থেকে থাকে, তাহলে ক্ষমতাসীন দলের ভাবমূর্তির জন্য তা শুভ নয়। আমাদের সবার যদি মনে হয়, আওয়ামী লীগের টিকিট পাওয়া মানেই আমার জয়, তাহলে তা এই দলের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। যে কেউই যেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না চান, সেই বিষয়ে দলটা ভবিষ্যতে আরও সজাগ হবে বলে আমরা আশা করি। একটি কমিউনিকেশন দলের হাইকমান্ড থেকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিলে ভালো হয়।
মনে রাখতে হবে, রাজনীতি করতে দম প্রয়োজন; জনমানুষের সঙ্গে সারাদিন মেলামেশা করতে হয়। যারা এমপি হতে চলেছেন, তাদের যেন সেই দম থাকে।

ইকরাম কবীর: গল্পকার ও যোগাযোগ পেশায় নিয়োজিত

আরও পড়ুন

×