ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

যোগ্য তরুণরা কেন দেশ ছাড়তে চান

মেধা পাচার

যোগ্য তরুণরা কেন দেশ ছাড়তে চান

.

জাকির হোসেন

প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০২৩ | ২২:৪৯

২৫ লাখ বেকারের দেশে থাকতে চাইছেন না ৪২ শতাংশ তরুণ। তারা বিদেশে পাড়ি জমাতে চান। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে অনেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে বাইরের দেশে যান। দেশে ফিরে মেধাবী তরুণরা সেই শিক্ষার প্রসার ঘটাতে চান। কিন্তু তাদের অনেকেই তা করতে পারছেন না। তাই ‘বাধ্য হয়ে’ অপরিচিত জায়গায় জীবন কাটাতে হচ্ছে তাদের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে প্রথম হওয়া এক তরুণের ফেসবুক স্ট্যাটাস সম্প্রতি অনেকে শেয়ার করেছেন ও মন্তব্য করেছেন। সেখানে ওই তরুণ লেখেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ও মাস্টার্স দুটোতেই প্রথম হওয়ার পর সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে ভাইভা দিই নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ততদিনে আমার তিনটা পাবলিকেশনও ছিল। ...ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ থেকে ৫-এর মধ্যে ছিলাম, এ রকম আমরা ২০ জনের ওপরে ভাইভা দিয়েছি। তাদের মধ্যে আমরা দু’জন এখন ইউএসএতে পিএইচডি করি, একজন ইউএসএতে পোস্ট-ডক করছেন, একজন কানাডায় পিএইচডি করছেন। পজিশনে ছিলেন এমন কেউই সেই বোর্ডে নিয়োগ পাননি। নিয়োগ বোর্ডে থাকা একজনও বলেননি– মেরিটোক্রেসির ভিত্তিতে অন্তত একজনকে নিয়োগ দিন। সেদিনের সেই ভাইভার পর আমি বুঝে গিয়েছিলাম, এই দেশ কারা চালায়; এ দেশের উচ্চশিক্ষা কাদের হাতে জিম্মি। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম– আর কোথাও ভাইভা দেব না।’

ওই তরুণের মতো ‘তিক্ত অভিজ্ঞতা’ হয়তো অনেকের আছে। তাদের অনেকেই দেশ থেকে ‘মুখ ফিরিয়ে’ বিদেশে থাকার চিন্তা করছেন। গত ১৬ নভেম্বর প্রকাশিত বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টার (বিওয়াইএলসি) ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের পিস অ্যান্ড জাস্টিস সেন্টারের ‘‌ইয়ুথ ম্যাটার্স সার্ভে ২০২৩’ শীর্ষক যৌথ সমীক্ষায় আরও ‘ভয়াবহ’ তথ্য উঠে এসেছে।

দেশের ৫ হাজার ৬০৯ তরুণ-তরুণীর মধ্যে পরিচালিত ওই জরিপ বলছে, শিক্ষিত তরুণদের প্রায় অর্ধেক সংখ্যক বা ৪২ শতাংশ দেশ ছাড়তে চান। এর কারণ হিসেবে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তাকে দায়ী করেছেন ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশ। ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ তরুণ মনে করেন, তাদের দক্ষতা অনুযায়ী দেশে চাকরি নেই। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই বলে মনে করছেন ৪২ দশমিক ৩ শতাংশ। ৪০ দশমিক ৮ শতাংশ মনে করেন, দেশে উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ কম। আর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কারণে দেশ ছাড়তে চাইছেন ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ তরুণ-তরুণী। (বণিক বার্তা, ১৭ নভেম্বর ২০২৩) বিদেশে পাড়ি জমাতে চাওয়া এই তরুণরা দেশের সম্পদ। তাদের মেধাকে সঠিক পদ্ধতিতে কাজে লাগাতে পারলে দেশ এগিয়ে যায়। তারা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় দেশকে আলোর পথে নিয়ে যাবেন। কিন্তু ‘সোনার বাংলা’ গড়ার সেই কারিগরদের দেশে রাখতে না পারার দায় আমাদেরই। মেধাবী তরুণদের একটি বড় অংশ কেন দেশে থাকতে চাইছে না– সংশ্লিষ্টদের ভেবে দেখার সময় এসেছে।

তরুণ সমাজ যে রাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ– সম্প্রতি এরই যেন জানান দিলেন ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক। তবে মেধার যোগ্যতার চাইতে ভোটের মাঠেই তরুণদের বেশি দরকার বলে তাঁর কথায় স্পষ্ট। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যেই তিনি বললেন, ‘আমার টার্গেট একটাই– ফার্স্ট টাইম ভোটার্স। এরা আমাদের টার্গেট। আমি নাম্বার ওয়ান গুরুত্ব ফার্স্ট টাইম ভোটারদের ব্যাপারেই দিচ্ছি।’
তরুণদের শুধু ভোটার হিসেবে গুরুত্ব দিলে সামনের দিনে বাংলাদেশকে কঠিন সময় পার করতে হবে। মেধাবীরা এভাবে দেশ ছাড়তে চাইলে অদূর ভবিষ্যতে দেশ পরিচালিত হবে কাদের মাধ্যমে! স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে চাইলে দেশের মেধাবীদের শুধু থাকার পরিবেশ করলেই হবে না; পাশাপাশি বিদেশে থাকা উচ্চশিক্ষিতদের দেশে ফেরানোরও ব্যবস্থা করতে হবে।

পাকিস্তানি সেনারা এই দেশকে মেধাশূন্য করতে চেয়ে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা চাই না, আর কোনো থাবা দেশকে মেধাশূন্য করার সুযোগ নিক। সেটি ঠেকাতে হলে দেশে শিক্ষার বাজেট বাড়ানোর পাশাপাশি মেধাবীদের গুরুত্ব দিতে হবে। রাজনীতির চোখ দিয়ে মেধাবীর অবস্থান যাচাই করলে পাকিস্তানি চিন্তার প্রসার ঘটবে বৈ কি।

স্বাধীন বাংলাদেশকে এখন গিলে খাচ্ছে পাচার নামক এক ‘ব্যাধি’। টাকা পাচারের প্রভাব তাৎক্ষণিক দেশের অর্থনীতিতে পড়ছে। লুটেরা গোষ্ঠীর এমন ‘অপকর্ম’ ভোগাচ্ছে দেশের সবাইকে। ‘অর্থনীতির চোরাবালি’তে ডুবে যাচ্ছে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ। অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধ করার তেমন কোনো উদ্যোগ মানুষের সামনে আসেনি। এতে সেই ‘অপরাধজগৎ’ দিন দিন প্রসারিত হচ্ছে। তেমনি মেধা পাচার একটি দেশকে দীর্ঘ মেয়াদে গভীর সংকটে ফেলে দেয়। দেশের শাসন কাঠামো থেকে শুরু করে সব খাতের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দেয়। এর তাৎক্ষণিক প্রভাব না থাকায় মেধা পাচার নিয়ে খুব একটা আলোচনা হয় না। মাঝেমধ্যে পত্রপত্রিকায় ঠাঁই পায়। পৃথিবীর কোনো জাতিই যে মেধা ছাড়া রাষ্ট্রের ভিত শক্ত করতে পারেনি– সে কথা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না।

জাকির হোসেন: সাংবাদিক ও গবেষক
tomal.bd91@gmail.com

আরও পড়ুন

×