ঢাকা শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪

কিসিঞ্জার: শতাব্দীর সেরা যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যু

পররাষ্ট্র নীতি

কিসিঞ্জার: শতাব্দীর সেরা যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যু

কিসিঞ্জার

ট্রেভিস ওয়ালড্রন ও জর্জ জরনিক

প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০২৩ | ২৩:০৯

বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটের নিজ বাড়িতে ১০০ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হেনরি কিসিঞ্জার। তিনি আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির শীর্ষ ব্যক্তি হিসেবে অনেক যুদ্ধ তত্ত্বাবধান করেছেন। কোনোটা হয়তো এড়িয়ে গেছেন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের হয়ে ভয়ংকর কিছু যুদ্ধাপরাধের কাজ করেছেন। 

হেনরি কিসিঞ্জার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সময়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এসব পদে থাকায় তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে বৃহত্তর শীতল যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। মার্কিন স্বার্থ ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সফলতাই ছিল তাঁর অগ্রাধিকার। এমনকি এ ক্ষেত্রে নৃশংসতা দেখাতেও পরোয়া করতেন না। কিসিঞ্জারের কুখ্যাত অপরাধের মধ্যে অন্যতম ছিল কম্বোডিয়ায় গোপনে বোমা হামলার মাধ্যমে কয়েক লাখ মানুষকে হত্যা করা। যদিও দেশটি নিরপেক্ষ ছিল; কম্বোডিয়ার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্টের সরাসরি যুদ্ধ ছিল না।

আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের দায়িত্বে থাকাকালে কিসিঞ্জার পাকিস্তানের কাছে অবৈধ অস্ত্র বিক্রির নির্দেশও দিয়েছিলেন। পাকিস্তান ১৯৭১ সালে বাঙালি নাগরিকদের ওপর নৃশংসতা চালিয়েছিল। তিনি ১৯৭৩ সালে চিলির সামরিক অভ্যুত্থানে সমর্থন দিয়েছিলেন, যে কারণে দেশটিতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সমাজতান্ত্রিক সরকারের পতন ঘটেছিল। কিসিঞ্জার ১৯৭৫ সালে ইন্দোনেশিয়াকে পূর্ব তিমুরে আক্রমণের অনুমতি দেন। তিনি ১৯৭৬ সালে আর্জেন্টিনার সামরিক স্বৈরতন্ত্রকে সমর্থন দিয়েছিলেন। জেরাল্ড ফোর্ড যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট তখন কিসিঞ্জারের বৈদেশিক নীতি আফ্রিকায় গৃহযুদ্ধ উস্কে দিয়েছিল। এ ক্ষেত্রে অ্যাঙ্গোলার গৃহযুদ্ধ বিশেষভাবে উল্লেখ্য, যাতে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। 

আট বছর ধরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্বকালে কিসিঞ্জার যে অপরাধ করেছিলেন, তার জন্য তিনি কখনও অনুশোচনা করেননি কিংবা তাঁর কোনো সাজাও হয়নি। যারা তাঁর কর্মকাণ্ডের সমালোচক ছিলেন, বিশেষ করে তাঁর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় সোচ্চার ছিলেন, তিনি সারাজীবন তাদের উপহাস করে গেছেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমেরিকার রাজনৈতিক সমাজে তাঁর কদর ছিল। ১৯২৩ সালে জার্মানিতে হেনরি কিসিঞ্জারের জন্ম। নাৎসিরা যখন জার্মানিতে ইহুদিদের ওপর নিপীড়ন চালায় তখন ১৯৩৮ সালে কিসিঞ্জার ও তাঁর পরিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, কিসিঞ্জারের জীবনে যা ঘটেছিল তা তিনি খুব একটা গুরুত্ব দেননি। তবে ইতিহাসবিদরা বলেছেন ভিন্ন কথা: শিশু হিসেবে কিসিঞ্জারের অভিজ্ঞতা সম্ভবত তাঁর মধ্যে ‘ব্যাপক নিরাপত্তাহীনতা, মানসিক বৈকল্য এবং সমালোচনার প্রতি চরম অসংবেদনশীলতা’ তৈরি করেছিল এবং তাঁর মধ্যে ‘বিপ্লব ও বিশৃঙ্খলা সম্পর্কে ভয় ঢুকেছিল।’ 

দুটি ঘটনা কিসিঞ্জারের ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলো কিসিঞ্জারকে নিক্সন প্রশাসন এবং আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম তারকা বানিয়েছিল। সেগুলো হলো, সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে অস্ত্র সীমিতকরণ চুক্তি এবং চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের ঘটনা। এ দুটি ঘটনা কিসিঞ্জারের দীর্ঘস্থায়ী বিজয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অনেকটা ভিয়েতনাম যুদ্ধের সমাপ্তির মতোই চীনের সঙ্গে সম্পর্কের সূচনা হয় নৃশংসতার মাধ্যমে। পাকিস্তানিরা ১৯৭১ সালে বর্তমান বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করে, সে সময় বাংলাদেশের নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান। পশ্চিম পাকিস্তান যখন পূর্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অভিযান শুরু করে, তখন চীনকে কেন্দ্র করে রিচার্ড নিক্সন ও হেনরি কিসিঞ্জার ব্যস্ত ছিলেন এবং তারা পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি। কারণ পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষে ছিল চীন। নিক্সন ও কিসিঞ্জার তখন পাকিস্তানকে ‘চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক সূচনার দরজা’ হিসেবে দেখেছিলেন। সে জন্য নিক্সন প্রশাসন বাঙালিদের ওপর নিপীড়নের পশ্চিম পাকিস্তানের অপরাধের নিন্দা করেনি। এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানে সম্ভাব্য অবৈধ অস্ত্রের চালানের অনুমোদন দেন। বাঙালি সৈন্যরা অবশেষে ভারতের সহায়তায় পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছিল। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিরা তাঁকে গোপন সফরের জন্য চীন যেতে সহায়তা করেছিল, যা নিক্সনের সাংহাইতে চূড়ান্ত ভ্রমণের পথ প্রশস্ত করতে সহায়তা করে। প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুসারে, কিসিঞ্জার ১৯৭২ সালে নিক্সনকে বলেছিলেন, ‘ভারত-পাকিস্তানে আমরা কী করেছি এবং রক্তাক্ত রাশিয়ানদের জন্য যে চীনা বিকল্প আমাদের প্রয়োজন ছিল, তা আমরা কীভাবে রক্ষা করেছি– সেটি এখনও কেউ বুঝতে পারেনি।’ তবে ‘কেন আমরা বাংলাদেশকে গুরুত্ব দেব?’

১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে কিসিঞ্জার ইসরায়েলকে অস্ত্র দিয়ে পরাজয়ের হাত থেকে বাঁচান। কিসিঞ্জারের উদ্যোগেই রুশপন্থি মিসর মার্কিন সামরিক বলয়ে চলে আসে। 
হেনরি কিসিঞ্জার তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক প্রেসিডেন্ট, পররাষ্টমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারকদের অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁকে ওয়াশিংটনের সবচেয়ে জমকালো ডিনার পার্টিতে স্বাগত জানানো হয়েছিল, উভয় প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতা এবং বৃহৎ থিঙ্কট্যাঙ্কের পণ্ডিতরা সেখানে ছিলেন। তাঁকে পরামর্শ দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ সংবাদপত্রের পাতায় এবং সবচেয়ে বড় টিভি ও রেডিওতে জায়গা দেওয়া হয়। তিনি সেসব সংবাদমাধ্যম ব্যবহার করেন বটে, সেগুলোতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক যুদ্ধের সিদ্ধান্তকে বাহবা দেন। ২০০২ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের এক বছর আগে তিনি বাগদাদে শাসন পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে কিসিঞ্জার ‘অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টা’ হিসেবে কাজ করেছিলেন। ইতিহাসবিদ গ্র্যান্ডিন যেমনটা বর্ণনা করেছেন, প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ, ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি এবং শীর্ষ সহযোগী কার্ল রোভ যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তাতে দুই লাখ ইরাকি বেসামরিক মানুষ মারা যায়। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার লঙ্ঘনের নতুন ঘটনা হিসেবে পরিগণিত।

হেনরি কিসিঞ্জারের প্রভাব কখনও শেষ হয়নি। তিনি না থাকলেও তাঁর অনুসারীরা রয়েছে। এই ধারণারও সম্ভবত কিছু সত্যতা আছে যে, কিসিঞ্জার আমেরিকার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারক। এ ক্ষেত্রে ইতিহাসে স্থান নিশ্চিত করার জন্য কিসিঞ্জার সেই প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। 

ট্রেভিস ওয়ালড্রন ও জর্জ জরনিক: হাফপোস্টের (সাবেক হাফিংটন পোস্ট) সাংবাদিক; হাফপোস্ট থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক

আরও পড়ুন

×