সড়ক কিংবা নদীপথে যানবাহন চালনায় দুর্ঘটনা অস্বাভাবিক নয়; কিন্তু পদ্মা সেতুর পিলারে বারংবার ফেরির ধাক্কা নিছক 'দুর্ঘটনা' হিসেবে মেনে নেওয়া কঠিন। আমাদের মনে আছে, জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে একাধিকবার একই ধরনের অঘটনে তোলপাড় উঠেছিল। ফেরি চালনার সঙ্গে সংশ্নিষ্টদের নেওয়া হয়েছিল আইনের আওতায়। এর দুই সপ্তাহ না যেতেই সোমবার সন্ধ্যায় আবার ধাক্কা অবিমৃষ্যকারিতা ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এটাও স্পষ্ট, এবারের ধাক্কায় ক্ষয়ক্ষতি আগের তুলনায় বেশি। মূল পিলার যদিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, এর 'ক্যাপ' অন্তত দুই ফুট ভেঙে গেছে। সন্দেহ নেই, এ ক্ষতি মেরামতযোগ্য। কিন্তু বারংবার ধাক্কা লাগার সুরাহা হবে কীভাবে? এ ঘটনার পর সেতুর নিচ দিয়ে ভারী যানবাহন নিয়ে ফেরি চলাচল বন্ধের যে ঘোষণা নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে, তা বিলম্বে হলেও সঠিক সিদ্ধান্ত। যদিও আমরা মনে করি, আরও আগেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল। এখন দেখতে হবে, কেন বারবার এমন 'দুর্ঘটনা' ঘটছে। মনে রাখা জরুরি, পদ্মা সেতুর পিলারের সঙ্গে ফেরির ধাক্কা লাগার এসব
ঘটনা এমন সময় ঘটছে, যখন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি মূল কাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হয়ে শেষ পর্যায়ের কাজও সম্পন্ন হওয়ার পথে। জাতি যখন দেশের বৃহত্তম যোগাযোগ স্থাপনা এবং কূটনৈতিক মর্যাদা ও
অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রতীক এই সেতুর নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ সম্পন্ন হওয়ার প্রহর গুনছে, ঠিক তখনই কেন এমন ঘটছে? এটা ঠিক যে, বর্ষাকালের প্রমত্ত পদ্মায় ফেরির মতো নৌযান পরিচালনা কঠিন। কিন্তু পদ্মা সেতুর মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিচ দিয়ে নৌযান চলাচলে বাড়তি সতর্কতা অবশ্যই থাকতে হবে। এই স্থাপনার প্রতি নৌচালকদের সমীহ থাকতেই হবে। কিন্তু আমরা দেখছি, একবার দুর্ঘটনার পরও সেখান থেকে সংশ্নিষ্টরা কোনোই শিক্ষা গ্রহণ করেনি। বস্তুত এর মধ্য দিয়ে কেবল এটাই স্পষ্ট হয়- ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের অবহেলা ও অসাবধানতায় জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটির অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের মতো সরকারি সংস্থার ফেরিই যদি এমন অসতর্ক থাকে, তাহলে বাকিদের ওপর ভরসা রাখব কীভাবে? আমরা মনে করি, এ ব্যাপারে আর ছাড় দেওয়ার অবকাশ নেই। সেতু ঘিরে যেমন কাঠামোর ওপরে, তেমনি সমতলে গড়ে তুলতে হবে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা। গত দুর্ঘটনার সময় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এবার দুর্ঘটনার সময়ও তার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। আমাদের প্রশ্ন- একেকটি দুর্ঘটনা ঘটবে আর তদন্ত কমিটি গঠন করেই সংশ্নিষ্টরা দায় সারবে? এবার তদন্ত কমিটি গঠনের পর এই প্রশ্নও সংগত- গত তদন্ত প্রতিবেদনের কী হয়েছে? সেটা কি যথাসময়ে সম্পন্ন ও উপস্থাপিত হয়েছিল? হয়ে থাকলে এর সুপারিশমালা বাস্তবায়নে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? আমাদের দেশে যে কোনো দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করে পরবর্তীকালে তা 'ডিপ ফ্রিজে' রেখে দেওয়াই রেওয়াজ।
কিন্তু পদ্মা সেতুর মতো স্থাপনার ক্ষেত্রেও তার পুনরাবৃত্তি কাম্য হতে পারে না। আমরা দেখতে চাই, এবারের তদন্ত প্রতিবেদন যথাসময়ে জমা দেওয়ার পাশাপাশি তা জনপরিসর বা সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশ করা হয়েছে। যাতে নাগরিকরাও দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ ও এর পুনরাবৃত্তি রোধে করণীয় নজরে রাখতে পারে। মনে রাখতে হবে, পদ্মা সেতু আমাদের বহু সংগ্রামের ফসল। পদ্মা সেতু আমাদের জাতীয় সাহসের পাশাপাশি ভবিষ্যতের সমৃদ্ধিরও প্রতীক- ভুলে যাওয়া চলবে না। আমরা জানি, সড়ক ও রেলপথ সংযুক্ত দেশের দীর্ঘতম এ সেতু চালু হলে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি বাড়বে ১ দশমিক ২ শতাংশ। আর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের প্রাপ্তিযোগ কেবল অর্থনীতিতে সীমিত থাকবে না। এই সেতুর মাধ্যমে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক সড়ক ও রেল নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে বাংলাদেশ। ফলে এই স্থাপনা কেবল আবেগের উৎস নয়, প্রত্যয়েরও দীপ্ত শিখা।

বিষয় : পদ্মা সেতুর পিলারে ধাক্কা

মন্তব্য করুন