শোকের এই মাসে বাংলাদেশের মানুষ ও প্রকৃতি খুবই বেদনাহত থাকে। কবিরা আমাদের মনের কথা জানতে পারেন। তারা আগামীর কথাও নান্দনিকভাবে বলতে পারেন। প্রকৃতির মনের কথাও তারা বুঝতে পারেন। বঙ্গবন্ধু তাদের প্রাণের বিষয়। কেননা, তিনিই যে বাংলাদেশ। আর সেই বাংলাদেশের নদী, সমুদ্র, পাহাড়, গাছ, পাখি ও বিশাল সবুজ প্রান্তর নিরন্তর তাকেই স্মরণ করে। সে কারণেই বিশ্বাসঘাতকের দল বঙ্গবন্ধুকে শারীরিকভাবে আমাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করার পরপরই এই বলে দুঃসাহস দেখাচ্ছিল- তিনি কেউ নন। সময়টা ছিল নিকষ কালো। বাংলাদেশ চলছিল মুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতনার উল্টো দিকে; 'অদ্ভুত এক উটের পিঠে'। এর উত্তরে কবি মহাদেব সাহা 'এই নাম স্বতোৎসারিত' নামে একটি হৃদয়গ্রাহী কবিতা লিখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতার বরাত দিয়ে তিনি ওই কবিতায় লিখেছিলেন, 'তিনি বাংলাদেশের হৃদয়।' আর আগস্টের কালরাতে ঘাতকরা সেই বাংলাদেশের হৃদয়কেই গুলিবিদ্ধ করেছিল। সেই বুক থেকে বয়ে যাওয়া পবিত্র রক্ত সারাবাংলার প্রকৃতির বুককে রক্তাক্ত করেছিল। সে রক্তধারা আজও বয়ে চলেছে নিরবধি। আর সে কারণেই কবির উচ্চারণ ছিল- 'তুমি এই বাংলার নদী, বাংলার সবুজ প্রান্তর/ তুমি এই চর্যাপদের গান, তুমি এই বাংলা অক্ষর,/ বলে ওরা, তুমি কেউ নও, কিন্তু তোমার পায়ের শব্দে নেচে ওঠে পদ্মার ইলিশ।'

প্রায় একই ভাষায় ওই অন্ধকার সময়ে কবি নির্মলেন্দু গুণ তার 'আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি' কবিতায় করেছিলেন সাহসী উচ্চারণ- 'সমবেত সকলের মতো আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি,/ রেসকোর্স পার হয়ে যেতে সেইসব গোলাপের একটি গোলাপ/ গতকাল আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।'

কবি শামসুর রাহমান তার 'ধন্য সেই পুরুষ' কবিতায় বলেছেন, তার 'নামের ওপর কখনো ধুলো জমতে দেয় না হাওয়া।' তিনি আরও লিখেছেন, 'যাঁর নামের ওপর পাখা মেলে দেয়/ জ্যোৎস্নার সারস।' প্রকৃতি কতই না সদয় তার প্রতি! কেননা, তিনিই যে বাংলাদেশের আরেক নাম। আমাদের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ। তিনি বাঙালি জাতির পিতা। মানুষ ভালোবেসে তাকে জনউপাধি দিয়েছেন 'বঙ্গবন্ধু'। এই নাম তাই আমাদের সামাজিক জীবনের অংশ। স্বততই এই নাম নানাভাবে হয় উচ্চারিত। প্রকৃতিই বলে দিচ্ছে, তিনি বেঁচে আছেন আমাদের নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে। তিনি চিরকালই বেঁচে থাকবেন 'বাংলাদেশের হৃদয়' হিসেবে। কবি মহাদেব সাহার কথাই ঠিক- 'লিখি বা না লিখি শেখ মুজিব বাংলা ভাষায় প্রতিটি নতুন কবিতা।' তিনি আরও জানিয়েছেন, 'মুজিব গোলাপ হয়ে ফোটে, লাল পদ্ম হয়ে ফোটে হৃদয়ে হৃদয়ে।' কেউ চাইলেই কি সেই হৃদয়কে অস্বীকারের উপায় আছে? তিনি যে রয়েছেন সর্বত্র। কেননা, তিনি যে আমাদের অস্তিত্বেরই অংশ।

তিনি তার নান্দনিক নেতৃত্বের গুণে বাংলাদেশ ও বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের মুক্তি এবং উন্নয়নের সংগ্রামে ভরসার ছায়া হয়ে আছেন। সংগ্রামী এই রাজনৈতিক শিল্পীর ক্যানভাসে উদ্ভাসিত হয়ে আছে বাংলাদেশ নামক এক রঙিন মানচিত্র। এই শিল্পীর ক্যানভাসে লেপ্টে আছে মানবপ্রেম, দেশপ্রেম, মুক্তিসংগ্রাম এবং দরদি নেতৃত্বের অসামান্য সব প্রতিচ্ছবি। শুধু কথায় নয়, তিনি ছিলেন অক্লান্ত কর্মবীর। চিন্তা ও কর্মের এমন সাযুজ্য সত্যি অবাক করার মতো। একটি স্বাধীন দেশের জন্ম দিয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি। সেই দেশটিকে কী করে সমৃদ্ধ এবং জনবান্ধব করা যায়, সেই অর্থনৈতিক মুক্তিসংগ্রামেও তিনি ছিলেন অবিচল। আর তার পরিকল্পিত উন্নয়নের কৌশলে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ফিনিক্স পাখির মতো উঠে দাঁড়িয়েছিল। ছিল খাদ্যাভাব, ছিল অভাব, ছিল দারিদ্র্য, ছিল দুর্নীতি। কিন্তু তিনি পুরো সমাজ ও প্রশাসনের খোলনলচে বদলে দেওয়ার আমূল সংস্কারবাদী সাহসী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু ঘরে ও বাইরে সাহসের সঙ্গে তার গণমুখী রাজনীতি, অর্থনীতি ও কূটনীতি সচল রেখেছিলেন। বিচক্ষণ মুদ্রানীতি, ডিমানিটাইজেশন, খাদ্য ও নিত্যব্যবহার্য পণ্যের সরবরাহ বাড়িয়ে তার শাসনামলের শেষদিকে উচ্চ মূল্যস্ম্ফীতি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছিলেন। আর কিছুদিনের মধ্যেই ম্যাক্রো-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুরোপুরি অর্জনের সুদৃঢ় ভিত্তি তিনি স্থাপন করে ফেলেছিলেন।

আমাদের বড়ই দুর্ভাগ্য যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাত্রিতে এ দেশেরই কিছু ক্ষমতালোভী কুসন্তান-পিশাচ বাঙালির মুক্তির এই মহানায়ককে নির্মমভাবে হত্যা করে। ওরা ভেবেছিল, এই হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে বাঙালি জাতির হৃদয় থেকে চিরদিনের জন্য তাকে মুছে ফেলা যাবে। কিন্তু এমন একজন অফুরান প্রাণশক্তির রাজনীতির অমর কবিকে কি আসলেই হত্যা করা যায়? মোটেও না। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়নি। এখন চলছে তার নির্দেশিত অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম। তাই অঙ্গীকারবদ্ধ থাকতে হবে তার সামাজিক সুবিচার ও মানবিকতানির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথেই হাঁটার। 'সোনার বাংলা' অভিমুখে বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে যে জয়যাত্রার সূচনা হয়েছে, তাতে যেন আমরা যুক্ত ও অবিচল থাকি। তার বিদেহী আত্মার প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর