আজ জাতির ইতিহাসের ভয়াবহ সেই দিন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে জাতির পিতা ও বাঙালি জাতি-রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ পরিবারের প্রায় সবাই শাহাদাতবরণ করেন বিপথগামী কতিপয় সেনা কর্মকর্তা ও সদস্যের নৃশংসতা-বর্বরতায়। জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে দেশবাসীর সঙ্গে আমরাও শোকাহত চিত্তে বিনম্র শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের নিহত সবাইকে। এ ঘটনার ধারাবাহিকতায় পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বর জেলখানায় নিহত জাতীয় চার নেতাকেও আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি।

আমাদের স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর চলমান জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী-পরবর্তী এ দুই ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে চলমান করোনা-দুর্যোগে জাতীয় শোক দিবস সীমিত পরিসরে পালিত হলেও বঙ্গবন্ধুকে বাঙালি জাতি স্মরণ করবে কৃতজ্ঞচিত্তেই। জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে প্রতি বছর মাসব্যাপী আওয়ামী লীগ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করলেও এবার করোনার কারণে তা-ও সীমিত করা হয়েছে। ক্ষণজন্মা এই সিংহপুরুষ সদ্য স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিকে কীভাবে তার লালিত স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়তে চেয়েছিলেন এবং তিনি বাঙালির জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় প্রত্যয়ী থেকে কীভাবে এগিয়ে গিয়েছিলেন, তা বুদ্ধিজীবী-সাংবাদিক-অর্থনীতিবিদ-সাহিত্যিকরা এবারও সমকালের বিশেষ আয়োজনে তাদের গবেষণা-পর্যবেক্ষণে তুলে ধরেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যার পুরো দেহটাই বলা যায় ছিল রক্তস্নাত বাংলাদেশের হূৎপিণ্ড, সেই বাংলাদেশ আজ কোন পথে- তাও বর্ণিত হয়েছে তাদের পর্যালোচনায়। এবারের ১৫ আগস্টের বিশেষ আয়োজনে আমরা বোঝার চেষ্টা করেছি বঙ্গবন্ধুর হত্যার পেছনের ষড়যন্ত্রকে; যে ষড়যন্ত্র ছিন্ন করে এখনও এগোতে হচ্ছে আমাদের। বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে যেমন রাজনৈতিক মুক্তি এনে দিয়েছিলেন, তেমনি চেয়েছিলেন অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তিলাভ করে বাংলাদেশ মর্যাদার সঙ্গে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

জাতির পিতার দেখানো পথেই এগিয়ে চলেছে তারই কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ধারাবাহিক সরকার। বাংলাদেশ আজ স্বল্পোন্নত দেশের গণ্ডি পেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুসহ অনেক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে। স্বজাতদ্রোহীরা ১৫ আগস্ট কালরাতে নৃশংসতা ও কলঙ্কের যে ঘৃণ্য অধ্যায় রচনা করেছিল, বিলম্বে হলেও তাদের বিচার ও অনেকেরই চূড়ান্ত দণ্ড কার্যকর হয়েছে- এটা স্বস্তির বিষয়। কিন্তু এখনও দণ্ডিত কয়েকজন ঘাতক বিদেশে পলাতক। আমরা মনে করি, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও আইনের শাসন কার্যকরের স্বার্থে এবং জরুরি প্রয়োজনে পলাতকদের দেশে ফিরিয়ে এনে দণ্ড কার্যকরের উদ্যোগ আরও জোরালো করতেই হবে। আমরা জানি, রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জাতি বিজয় ছিনিয়ে এনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সুখী-সমৃদ্ধ, অর্থাৎ কাঙ্ক্ষিত সোনার বাংলা গড়ার প্রয়াস যখন চালাচ্ছিল, তখনই তা ভণ্ডুল হয় ইতিহাসের নৃশংসতম চরম ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডে। তারপর দীর্ঘদিন বাংলাদেশ চলতে পারেনি সুস্থ-স্বাভাবিক পথে। রাজনীতির নামে ষড়যন্ত্রের গর্ভে অপরাজনীতি অনেক অর্জনের বিসর্জন ঘটায়।

পঁচাত্তরের খুনিদের বিচার-শাস্তি তো নয়ই, উপরন্তু তাদের সুরক্ষার জন্য ইনডেমনিটি আইন করার পাশাপাশি খুনিদের পুরস্কৃত করা হয় নানা অপপ্রক্রিয়ায়। স্বাধীন দেশের সেই কালো অধ্যায় কদর্যতা-অনাচার-দুরাচারের পরিসর বিস্তৃত করে। আমরা মনে করি, দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থে, কাঙ্ক্ষিত সোনার বাংলা গড়ার সব পথ নিস্কণ্টক করতে ১৫ আগস্টের অন্তরালের শক্তির সন্ধান করে যথাযথ আইনানুগ প্রতিকার নিশ্চিত করার কোনোই বিকল্প নেই। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন; যে বাংলাদেশ ছিল তার অন্তর্লোকে; সেই গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন সমৃদ্ধ দেশ গড়ার অঙ্গীকার পূরণে গোটা জাতিকে থাকতে হবে দৃঢ়প্রত্যয়ী।

বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য যার জীবনটাই ছিল উৎসর্গিত এবং যার স্থান ইতিহাসে সুনির্দিষ্ট ও আপন মহিমায় ভাস্বর; আমরা দেখেছি, পঁচাত্তর-পরবর্তী দীর্ঘ সময় স্বার্থান্বেষী শাসকরা তাকে অস্বীকারের দৃষ্টতা দেখিয়েছেন। তাদের দুরভিসন্ধি সফল হয়নি; বরং বঙ্গবন্ধুর অবিস্মরণীয় অবদানই তাকে সুমহান ও ইতিহাসের উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে শুধু দেশে নয়, বিশ্বেও তুলে ধরেছে। মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী প্রেরণা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ এখন বিশ্বঐতিহ্যের অংশ। আমরা মনে করি, বঙ্গবন্ধু নির্দিষ্ট কোনো দলের নন। তার দেখানো পথই জাতির পাথেয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ ধারণকারী সবাই দেশ গড়ায় অধিকতর প্রত্যয়ী হলে তা-ই হবে জাতির পিতার প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা প্রদর্শন।