বাঙালি বীরের জাতি হিসেবে ইতিহাসে খ্যাতি আছে। বাঙালির গৌরবের অধ্যায় অনেক বিস্তৃত তাও সত্য। কিন্তু বাঙালির ইতিহাসেই মীরজাফর, খন্দকার মোশতাকদের মতো মানুষরূপী অমানুষের অস্তিত্বও রয়েছে। রয়েছে কিছু কলঙ্কচিহ্নও। এর মধ্যে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের সেই বাড়িটি, যে বাড়ি বাঙালি জাতির আন্দোলন-সংগ্রামের সূতিকাগার বলা যায়, সেখানেই রচিত হয় আমাদের ইতিহাসের ঘৃণিত-কলঙ্কিত-বর্বরোচিত অধ্যায়। ওই অধ্যায়ের মর্মন্তুদতার বিস্তৃত ছায়াবৃত ইতিহাসের প্রেক্ষাপট কি শুধুই ক্ষণিকের চক্রান্তের কোনো কুফল কিংবা হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া কোনো পৈশাচিক ঘটনার নীলনকশার বাস্তবায়ন? এই প্রশ্নগুলো ১৫ আগস্টের ঘটনা সংলগ্নই শুধু নয়, সময়ের প্রেক্ষাপটে ফিরে ফিরে জিজ্ঞাসাও বটে।

বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা, বাঙালির রাজনীতির ইতিহাসের মহানায়ক, দেশনায়ক, রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে যারা ১৫ আগস্ট হত্যা করল তাদের ঘাড়ে আরও মাথা নিশ্চয় ছিল। এ কথাটি বারবার আলোচনায় এসেছে। ওই মাথাগুলোরও হয়তো আরও মাথা ছিল দেশ-বিদেশে। কোনো সভ্য রাষ্ট্র কিংবা সমাজে মানুষ হত্যা করে এর বিচারের পথ আইন করে রুদ্ধ করে রাখার ইতিহাস কি আছে? ওই নৃশংসতার-বর্বরতার ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্য শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় অসীন হলে 'ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ' বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ উন্মুক্ত করা এবং নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে বিচার সম্পন্ন করার কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। চারদলীয় জোট সরকারের শাসনামলে কী প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি এ ক্ষেত্রে হয়েছিল তা তো সচেতন মানুষ মাত্রই জানা। আমরা জানি, দীর্ঘ অপেক্ষার পর ভয়াবহ ওই অপরাধের মাঠ পর্যায়ের হোতাদের বিচার সম্পন্ন হলেও আজও অনুন্মোচিত রয়ে গেছে অন্তরালের শক্তি।

শুধু তা-ই নয়, এখন পর্যন্ত দণ্ডিত খুনি সবার দণ্ডও কার্যকর করা যায়নি। দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েক খুনি পালিয়ে আছে বিভিন্ন দেশে। ক'জন মারাও গেছে। পালিয়ে থাকা খুনিদের অবস্থান অজানা নয়। তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে দণ্ড কার্যকরের জরুরি কাজটি অসম্পন্ন থাকায় নিরুদ্বিগ্ন থাকার অবকাশ নেই। কারণ, বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ওই সময় দেশে না থাকায় ঘাতকদের হাত থেকে প্রাণে তখন রক্ষা পেলেও বিগত তিন দশকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর কয়েক দফা আক্রমণের ঘটনা বা হত্যাচেষ্টা চালিয়েছে সভ্যতা-মানবতার শত্রুরা। এসব ক্ষেত্রেও তিনি সৌভাগ্যক্রমেই প্রাণে বেঁচে গেছেন বলা যায়। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত না পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের মাঠ পর্যায়ের কুশীলবদের ঘাড়ের মাথা কিংবা অন্তরালের শক্তির পরিচয় অনুন্মোচিত থেকে যাবে, কিংবা তারা রয়ে যাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে, ততক্ষণ আমরা অধিকতার উদ্বিগ্ন না থেকে পারি কি? বারবার শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা ১৫ আগস্টের  অন্তরালের শক্তির সন্ধানের তাগিদই দিয়েছে। অনেক দেশি-বিদেশি দলিলপত্রে ও সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে ইতোমধ্যে ১৫ আগস্টের নৃশংসতার পূর্বাপর অনেক কিছুই উঠে এসেছে। কিন্তু ওই পৈশাচিকতার অন্তরালের শক্তির পরিচয় নানা আকার-ইঙ্গিত কিংবা ধারণায় উঠে এলেও আইনি পন্থায় তা আজও নির্ণয় করা যায়নি। এই বিষয়টি অনুন্মোচিত রেখে আমাদের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পথ কতটা মসৃণ করা যাবে- এই প্রশ্নটি উপেক্ষণীয় নয়। এ দেশের মানুষ তো একসময় নিরাশা-হতাশার সাগরেই হাবুডুবু খাচ্ছিল এই প্রশ্নে- ১৫ আগস্টের বর্বরোচিত, সভ্যতা-মানবতা কাঁপানো বিশ্বনিন্দিত ঘটনার বিচার হবে কি? সেই হতাশা-নিরাশা দূর হয়েছে। কলঙ্করেখা মোছা গেছে, কিন্তু পুরোটা যায়নি জাতির স্বার্থ ও প্রয়োজনে, দেশের স্বার্থ-প্রয়োজনে এবং আনুষঙ্গিক প্রয়োজনে ১৫ আগস্টের মাঠ পর্যায়ের কুলীলবদের ঘাড়ের মাথাগুলোর পরিচয় নির্ণয় এবং সেই নিরিখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

শেখ মুজিবুর রহমান কর্মী থেকে নেতা, নেতা থেকে রাজনীতির ইতিহাসের মহানায়ক ও বঙ্গবন্ধু অন্যতম একজন বিশ্ববরেণ্য রাষ্ট্রনায়ক এবং সময়ের ধাপে ধাপে স্রোতের প্রবাহের বাঁকে বাঁকে এক একটি ঘটনা তাকে সেভাবে নির্ণয় করেছে, তা স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় এবং এজন্যই ইতিহাসে তার স্থানও ঠিক সে রকমভাবেই নির্ধারিত হয়েছে। সেই কবে রাজনীতির ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রবেশ, তারপর ধাপে ধাপে আন্দোলন-সংগ্রাম ও অধিকার আদায়ের অনন্য একজন হিসেবে অর্জনের পাহাড়ের চূড়ায় আহরণ। তাকে বিপথগামী কতিপয় সেনা কর্মকর্তা ও সদস্য সপরিবারে হত্যা করেছে শুধু তাদের শক্তি বলে। এটুকু মেনে নেওয়া কি সহজ? কাজেই এ কথাটা সন্দেহাতীতভাবেই বলা যায়, বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার বিচার সম্পন্ন হলেও কাজ আরও অনেক বাকি রয়েছে এবং কাজগুলো নিষ্পন্ন না করলে আমাদের কাঙ্ক্ষিত সমাজ গঠনের কাজটি আইনের শাসনের ভিত্তিতে করা হবে কঠিন।

আমরা যদি সমাজে-রাষ্ট্রে সভ্যতা-মানবতার আলোকোজ্জ্বল দ্যুতির আলোয় পূর্ণাঙ্গভাবে আলোকিত হতে চাই, তাহলে প্রশ্নাতীতভাবেই অসভ্যতার ইতিহাস জনসমক্ষে তুলে ধরার প্রয়াস চালাতে হবে এবং তাতে সফলও হতেই হবে। রক্তস্নাত বাংলাদেশকে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট পুনর্বার জাতির পিতা ও তার পরিবারের সদস্যদের রক্তে স্নাত করে যারা রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত হয়েছিল এবং তাদের যে বা যারা পুরস্কৃত করেছিলেন, তারা কীভাবে দায় এড়াবেন নৃশংস ১৫ আগস্টের? সাম্প্রদায়িকতা-বৈষম্যসহ নেতিবাচক অনেক কিছুর কবর রচনা করে একাত্তরে এই রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু অঙ্গীকার ও প্রত্যয় ছিল। সেই অঙ্গীকার ও প্রত্যয়ের মূলে যারা কুঠারাঘাত করেছেন, যারা একে একে রক্তস্নাত সংবিধান থেকে আমাদের প্রত্যয়ের স্তম্ভগুলো ধসিয়ে দিয়েছেন, তাদের পরিচয় গোপন কিংবা অজানা-অচেনা নয়।

স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে কত রকম ক্ষতই তো হীনস্বার্থবাদীরা নিজেদের লাভালাভের অঙ্ক কষে সৃষ্টি করেছেন। এই ক্ষতের ওপর আরও ক্ষত সৃষ্টি করা হয়েছে। কেন হয়েছে, কীভাবে হয়েছে, কাদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ যোগসাজশ এসবের পেছনে ছিল- এরও পুরো অধ্যায় উন্মোচন করা যায়নি। প্রতিকারও করা যায়নি। এই জরুরি বিষয়গুলো অনুন্মোচিত রেখে আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মাণ কি সহজ কাজ? ১৫ আগস্টের বিচারের রায় এখনও পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি তা সচেতন মানুষ মাত্রই জানা। এই না পারার কারণেই অন্ধকারের কীটগুলো সক্রিয় রয়েছে। যারা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে পঁচাত্তর-পরবর্তী আমাদের অনেক অর্জনের বিসর্জন দিয়েছেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাল্টে দিতে চেয়েছেন ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অনেক এবং তাজা প্রাণ প্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছেন, এরও অনেক কিছু রয়ে গেছে অনুন্মোচিত।

অন্ধকারের অন্তরালের সবকিছু উন্মোচন করতেই হবে দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থে। আবারও বলি, এই জরুরি বিষয়গুলো অনুন্মোচিত রেখে আমরা শঙ্কামুক্ত হতে পারব না। বাংলাদেশ আজ স্বল্পোন্নত দেশের গণ্ডি পেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর নীতি-আদর্শের পথ ধরে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাংলাদেশ আজ এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। গোটা বিশ্ব করোনা মহামারির দোর্দণ্ড প্রতাপে বিপর্যস্ত। আমরাও এর বাইরে নই। ভয়াবহ ক্ষয়ের মধ্য দিয়ে চলেছি আমরা। জীবনের ক্ষয় তো আছেই। যা কোনো কিছু দিয়েই পূরণ করা যাবে না, এর পাশাপাশি ক্ষয়ের খতিয়ান আরও অনেক বিস্তৃত। জানি না কবে কাটবে এই আঁধার, কবে কাটবে ক্রান্তিকাল। কিন্তু এটুকু জানি- মানুষ হেরে যাবে না, অনেক ক্ষয়ের মধ্য দিয়েই হয়তো মানুষই জয় ছিনিয়ে আনবে।

বিশ্ববরেণ্য কত নেতা, রাষ্ট্রনায়ক, দেশনায়ক, রাজনীতির নীতিনির্ধারক বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, মানবিকতা, ব্যক্তিত্বের কথা কতভাবেই না উপস্থাপন করেছেন। এসবই বিশ্ব ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। গণমানুষের অধিকার-স্বপ্নের বাস্তবায়নকারী সিংহ পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যারা ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যা করে মুছে ফেলতে চেয়েছিল, তারা আমাদের অপরিসীম ক্ষতি ঘটিয়েও তা পারেনি। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ আজ আন্তর্জাতিক বক্তৃতা হিসেবে স্বীকৃত। আরও কতকিছুই তো আমাদের গৌরবের স্মারক। বঙ্গবন্ধুকে দেশের সীমানার বাইরের যারা স্বীকৃতি দিয়েছেন, সম্মান দেখিয়েছেন, শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন, তারা একেকজন বিশ্বে এককভাবে আলোকিত। এই ভূখণ্ডের রাজনীতির বাতিঘর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটির সিঁড়ি জাতির পিতা ও তার পরিবারের সদস্যদের রক্তস্নাত। আজ এই বাড়িটি শুধু একটি স্মৃতি জাদুঘরই নয়, নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উৎসও।

সমকালেই নিকট অতীতে একটি সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কয়েকবার প্রত্যক্ষ দেখার স্মৃতিচারণ করেছিলাম। আজ এই শোকাবহ দিনে পুনর্বার বলি, দুঃসাহসী, ক্ষণজম্মা এই মানুষটি ইতিহাসের অক্ষয় অধ্যায়। কত দুর্ভাগা জাতি আমরা! যার কল্যাণে আমরা একটি জাতিরাষ্ট্র পেলাম, তাকেই হত্যা করল বিপথগামীরা! তার নেতৃত্বে এর পূর্বাপরের আরও অনেক ঘটনা না-ই বা উল্লেখ করলাম। সংবাদমাধ্যমেই জেনেছিলাম, কোনো কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা বঙ্গবন্ধুকে সতর্ক করে দিয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তা আমলে নেননি। তিনি বিশ্বাসই করতে পারেননি, কোনো বাঙালি সন্তান তার হন্তারক হতে পারে। যেদিন আইন করে তার বিচারের পথ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, যেদিন সভ্যতা-মানবতাবিরোধী এই দুস্কর্মের বীজ বপন করা হয়েছিল, সেদিন চোখের কোণে জল জমেছিল অনেক। মনে হয়েছিল, আবারও কি ফিরে গেলাম পাকিস্তানে! সামনে আর কী ভয়াবহতা অপেক্ষা করছে কে জানে! কিন্তু না বিলম্বে হলেও কেটেছে শঙ্কার ছায়া। তবে পুরোটা কাটেনি এবং কেন কাটেনি তা আগেই উল্লেখ করেছি।

ইতিহাসের চাকা থেমে থাকে না। আমার দেখা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ণাঙ্গভাবে এক বিশাল স্তম্ভ। এই ১৫ আগস্টে পুনর্বার বলি, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ গভীর করা জরুরি ১৫ আগস্টের অন্তরালের শক্তির আইনানুগ প্রক্রিয়া সন্ধান ও চিহ্নিত করে জাতির সামনে তাদের মুখোশ উন্মোচন করা। ১৫ আগস্টের অন্তরালের শক্তির মুখোশ উন্মোচন না হওয়া পর্যন্ত শঙ্কাযুক্ত নানা প্রশ্ন উঠবেই। শুধু শোকাবহ আগস্টেই নয়, সব সময়। ১৫ আগস্টকে শুধু আমরা জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করব তা-ই নয়, একই সঙ্গে অনাচার-দুরাচারের মূলোৎপাটনের সংকল্পও করব। গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি বঙ্গবন্ধুকে।