বাঙালির জাতীয় জীবনে আগস্ট অত্যন্ত বেদনার, কষ্টের ও আর্তনাদের মাস। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বর্বর হত্যাকাণ্ড ঘটে। এই বীভৎস ও বিভীষিকাময় হত্যাকাণ্ডের পর খুনিচক্র বঙ্গবন্ধুর নাম-নিশানা মুছে ফেলার চেষ্টা করে। শাসককুলের এসব অপচেষ্টা সত্ত্বেও এদেশের মানুষ বঙ্গবন্ধু স্মরণে এগিয়ে আসে।
বাংলা ভাষাভাষি মানুষের রাষ্ট্র গঠন ছিল বঙ্গবন্ধুর কার্যক্রমের চূড়ান্ত পর্যায়। ইতোপূর্বে তিনি তাদের মানবিক মর্যাদা বা মানুষ হিসেবে স্বীকৃতির লড়াইয়ে ব্যাপৃত ছিলেন। এই বাংলা-বাঙালিকে অবাঙালিরা কখনও মানবিক মর্যাদা দেয়নি। আধুনিককালে শুধু নয়; প্রাচীনকালেও বাঙালিদের ইতর, ম্লেচ্ছ, অসভ্য, দানব, বর্বর বা পাপাচারী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থ 'ঐতেরেয় আরণ্যক'-এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, বঙ্গের (বাংলার) মানুষেরা পাখির মতো দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলে। এটি ভাষার অগম্যতার জন্য বলা হয়েছে তা নয়; বরং নিন্দার্থে এটি ব্যবহার করা হয়েছে। প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত গণিতবিদ বৌধায়ন তার 'ধর্মসূত্র' নামক গ্রন্থে বলেছেন যে, অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, মগধ (প্রাচীন বাংলার বিভিন্ন জনপদ বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল) প্রভৃতি দেশে শুধু তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যেই গমন করা যেতে পারে, অন্য কোনো কারণে কেউ গমন করলে তাকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। এ কথার মর্মার্থ হলো এ অঞ্চলের মানুষ অপবিত্র, এখানে ধর্মীয় উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোনো কারণে যাতায়াত করা যায় না। 'মহাভারতে' সমুদ্র-তীরবর্তী বাঙালিদের ম্লেচ্ছ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ম্লেচ্ছ শব্দের মাধ্যমে বাঙালিদের পাপিষ্ঠ বা পাপাচারে লিপ্ত মানুষ হিসেবে নিন্দা করা হয়েছে। এমনকি প্রাচীন জৈন গ্রন্থ 'আচারঙ্গ সূত্র'-এ রাঢ় জনপদের মানুষদের বন্য ও অসভ্য এবং তাদের ভাষাকে অসুর শ্রেণির ভাষা বলা হয়েছে। বৌদ্ধ ধর্মীয় গ্রন্থ 'আর্যমঞ্জুশ্রীকল্প'তেও বাংলা জনপদের মানুষের ভাষাকে অসুরের ভাষা বলে বিবৃত করা হয়েছে। অসুর বলতে দৈত্য বা দানব বোঝানো হয়। অর্থাৎ বাংলা জনপদের অধিবাসীরা মানুষ নয়, 'দানব'। বাংলায় আর্যরা যখন প্রথম আগমন করে তখন স্থানীয় অধিবাসীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এ জন্য আর্যরা বাঙালিদের অসভ্য ও বর্বর বলে গালি দিয়েছে। পরবর্তী সময়েও বাঙালিদের শুনতে হয়েছে যে, 'বাঙালিরা নিচু জাত'। মোগল ও সুলতানি শাসনে শুধু ইলিয়াস শাহী ও হোসেন শাহী আমলে বাঙালি কবি-সাহিত্যিকরা কিছুটা মর্যাদা পেয়েছেন। এখনও এ দেশে কোনো সাধারণ মানুষ, যার পোশাক-পরিচ্ছদ হয়তো কেতাদুরস্ত নয়, নিজের স্বাস্থ্য-চেহারার প্রতি উদাসীন এবং আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন তাকে হয়তো কোনো ভদ্রলোক শ্রেণির লোক বলে বসেন 'একেবারে বাঙাল'। অর্থাৎ নিন্দার্থে 'বাঙাল' শব্দটি ব্যবহূত হয়। চট্টগ্রাম এলাকায় একটি লোকছড়া প্রচলিত আছে; 'বাঁআল মনুষ্য নয় কেবল একটা জন্তু, গাধার মতো বোঝা বয় লেজ নাই কিন্তু'। এ ক্ষেত্রেও বাঙালিকে জন্তু হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, মানুষ হিসেবে নয়।
এ ধরনের নিন্দাবাদ সত্ত্বেও বাঙালির সক্ষমতা আছে, শৌর্য-বীর্য আছে তা তারা বিভিন্ন সময়ে প্রমাণ করেছে। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ বাঙালিদের মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল। ব্রিটিশরা বাঙালিদের ভয় পেত বলে ১৯০৫ সালে বাংলাকে দুই ভাগ করেছিল। বাঙালিদের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য কুড়ি শতকে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে; প্রথমটি ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তি। এর মাধ্যমে বিশ্ববাসী প্রথম অনুধাবন করে ম্লেচ্ছ বাঙালিরা মানুষ হচ্ছে। এরপর রবীন্দ্রনাথ এক সময়ে বললেন- বিশ্বকর্মা এই কোটি কোটি বাঙালির মধ্যে একজন মানুষ তৈরি করেছেন। তিনি হলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। কারণ, রবীন্দ্রনাথের আগেই বিদ্যাসাগর বাঙালির ভাগ্য পরিবর্তনে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
এর পরের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ১৯৪৭-এ ভারত-পাকিস্তানের বাইরে শুধু বাংলা ভাষাভাষিদের জন্য একটি রাষ্ট্র গঠনের প্রয়াস। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শরৎ বসু, কিরণ শংকর রায় ও আবুল হাশিম এর পুরোভাগে ছিলেন। ছাত্রনেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু কাছ থেকে এই প্রচেষ্টাকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। পরের দুটি সংগ্রামে তিনি নেতৃত্বের পুরোভাগে ছিলেন। প্রথমটিতে তিনি অন্যতম নেতা; পরেরটিতে তিনি মহানায়ক। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্বে কখনও তিনি প্রত্যক্ষ নেতার ভূমিকায়, নতুবা জেলখানায় থেকে আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছেন। তবে তার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল পাকিস্তানের গণপরিষদে বাংলা ভাষা ও বাঙালিকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে। ১৯৫৫ সালের জুন মাসে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং বাংলা ও বাঙালির পক্ষে সর্বদাই সোচ্চার ছিলেন। গণপরিষদে পাকিস্তানের নতুন সংবিধান প্রণয়নের বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা হয়। ১৯৫৫ সালের ২৫ আগস্ট পূর্ব বাংলার নাম পূর্ব পাকিস্তান করার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তিনি স্পিকার আব্দুল ওয়াহাব খানের উদ্দেশে বলেন, পূর্ব বাংলার নিজস্ব ভাষা, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রয়েছে। পূর্ব বাংলার মানুষের মতামত না নিয়ে এই নাম পরিবর্তন করা যাবে না। প্রয়োজনে গণভোটের মাধ্যমে মানুষের মতামত নেওয়া হোক (শাহরিয়ার ইকবাল, শেখ মুজিব ইন পার্লামেন্ট ২০১৬, পৃ.১০)। একই বছরের ৯ নভেম্বরের অধিবেশনে কিছুক্ষণ ডেপুটি স্পিকার সি.ই. গিবন সভাপতিত্ব করেন। তখন শেখ মুজিব বাংলায় বক্তৃতা শুরু করলে তিনি মুজিবকে উর্দু বা ইংরেজিতে বক্তৃতা করতে বলেন। শেখ মুজিব এক্ষেত্রে অনড় অবস্থান নেন এবং বলেন যে, বাংলা ভাষায় কথা বলা আমার জন্মগত অধিকার এবং ইতোপূর্বে স্পিকারের এ বিষয়ে রুলিং রয়েছে। ডেপুটি স্পিকার শেখ মুজিবকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি ইংরেজিতে বলতে পারেন কিনা। বঙ্গবন্ধু উত্তর দেন, তিনি অবশ্যই ইংরেজিতে বলতে পারেন, তিনি বলবেন না। কারণ, এই ভাষার জন্য বাংলার মানুষ রক্ত দিয়েছে, পৃথিবীর ইতিহাসে আর এ ধরনের নজির নেই (ওই,পৃ. ২৯, ৯৪-৯৭)। এভাবে ম্লেচ্ছ বাঙালিকে মানুষে পরিণত করার জন্য তিনি নিরন্তর লড়াই করেছেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, শুধু পশ্চিম পাকিস্তানি ভূস্বামী রাজনীতিবিদ নন, বাংলাদেশের অভিজাত শ্রেণিও ভাষা আন্দোলনকালে বাংলা ভাষার বিপক্ষে অংশ নেয়। ১৯৫২ সালে 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই'-এর পাশাপাশি 'বাংলা ভাষার রাষ্ট্র চাই' নামে আরও একটি স্লোগান উঠেছিল। পরবর্তীকালে 'তুমি কে আমি কে বাঙালি বাঙালি', 'তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা' স্লোগানকে বঙ্গবন্ধু হৃদয়ে ধারণ করেন এবং তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন যে, এই নদীবিধৌত বাংলার জল, স্থল ও অন্তরীক্ষ শুধু বাঙালির; অন্য কেউ এখানে ভাগ বসাতে পারবে না। কাজী নজরুল ইসলামের 'বাঙালির বাংলা' শুধু বাঙালিই শাসন করবে- এটা বঙ্গবন্ধুর অস্থিমজ্জায় ঢুকে যায়। সেজন্য তিনি ষাটের দশকের গোড়াতেই কমরেড মণি সিংহকে বলেন, বাংলাদেশ করতে হবে (খোকা রায়, সংগ্রামের তিন দশক, ২০০৮, পৃ.১৫৮)। তিনি এ সময় তার স্বপ্টেম্নর বাংলাদেশ গঠনে সহায়তার জন্য জহরলাল নেহরুর সঙ্গেও যোগাযোগ করেন (শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি, 'ভারত, মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও পাকিস্তান', ২০১৩, পৃ. ৫০-৫১)। সবাই তার এই ইচ্ছার সঙ্গে একমত হলেও সবাই তাকে ধৈর্য ধরার পরামর্শ দেন। তবুও তিনি অধৈর্য হয়ে পড়েন এবং ভারতের জবাবের জন্য ত্রিপুরায় যান। এটি সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা জেনে যায় এবং পরবর্তীকালে আগরতলা মামলা জারি করে।
যাই হোক, পশ্চাৎপদ, নিষ্পেষিত এবং 'মহাভারতে'র ম্লেচ্ছ বাঙালিকে মানুষ বানাবার অভিযাত্রা থেকে তিনি পিছপা হননি। মামলা দিয়ে, জেলে রেখে তাকে দমানো যায়নি। ১৯৬৯-এর ফেব্রুয়ারিতে জেল থেকে বেরিয়েই আবার তিনি স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হন এবং '৭০-এর নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেন। তিনি তার প্রিয় বাঙালিদের বলেন, আপনারা যদি ৬ দফার পক্ষে থাকেন তাহলে নৌকায় ভোট দিন। কারণ ৬ দফা অসুর ও ম্লেচ্ছকে মানুষ বানাবার সিঁড়ি। বাঙালিরা সায় দিল এবং ৩ জানুয়ারি '৭৩-এ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের তিনি শপথ করালেন যে, জীবন দেব কিন্তু ৬ দফা ও এই বুকের পাজরের হাড় বের হওয়া বাঙালির সঙ্গে বেইমানি করব না। মোশতাকগং এই শপথ ভঙ্গ করেছে। কিন্তু তার বিশ্বস্ত সহচরেরা অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় ছিনিয়ে আনে। ৭ মার্চ তিনি যে বলেছিলেন, 'কেউ আমাদের দাবায়া রাখতে পারবে না' তা অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়। তিনি '৭২-এর ১০ জানুয়ারি প্রিয় বাংলায় ফিরে এসে রবীন্দ্রনাথকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন, তিনি বলেন কবিগুরুর কথা মিথ্যা প্রমাণ হয়ে গেছে, 'আমার বাঙালি আজ মানুষ'। এইভাবে ম্লেচ্ছকে মানুষের মর্যাদায় এবং বিশ্ব মানচিত্রে স্থান করে দেওয়ার জন্য এই বাংলার নীলাকাশ, নিঃসীম দিগন্ত ও প্রবহমান নদীর বুকে তিনি বেঁচে থাকবেন। চেষ্টা করেও তাকে আড়াল করা যাবে না। কারণ, তিনি যে আমাদের মানুষ বানাবার কারিগর !
শিক্ষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়