আমরা চরম দুঃসময় অতিক্রম করছি। ক্ষয়ের মধ্য দিয়ে চলেছি। দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে করোনা সংক্রমণের ভয়াবহতায় মানুষের জীবনযাত্রা বিপন্ন-বিপর্যস্ত। চলমান করোনা-দুর্যোগের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আরও বেড়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ এর প্রতিরোধে আগাম কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ না নেওয়ায় আজকের এই পরিস্থিতি। ঢাকা-চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি হলেও এর বাইরেও ডেঙ্গু রোগীর সন্ধান মিলেছে। সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীলরা প্রচার কিংবা ফটোসেশনে যতটা উৎসাহী, আসল কাজে তেমনটা দেখা যায় কি? যদি তা-ই হতো তাহলে পরিস্থিতি এতটা উদ্বেগের কারণ হতো না।
১৩ আগস্ট 'নিয়ন্ত্রণে আসছে না ডেঙ্গু' শিরোনামে সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে যে তথ্য উঠে এসেছে তা স্বস্তির নয়। বলা হয়েছে, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের জীবাণুবাহী এডিস মশা নিয়ন্ত্রণেই আসছে না। প্রায় প্রতিদিনই রাজধানীতে দুই শতাধিক মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত ২২ জনের মৃত্যুর খবরও জানা গেছে। এক গবেষণায় জানা গেছে, রাজধানীর নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানিতেই বেশি জন্মাচ্ছে এডিস মশা। উভয় সিটি করপোরেশনেই এডিস মশার লার্ভা মিলছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় বেশি মাত্রায় মিলছে এডিসের লার্ভা। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়রের এ নিয়ে রয়েছে দুই রকমের বক্তব্য। যারা হাসপাতালে ভর্তি হন তাদের খবরই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে আসে, কিন্তু যারা বাড়িতে কিংবা প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা নেন, তাদের খবর জানার উপায় নেই। সংগতই ধারণা করা যায়, এ ক্ষেত্রে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। করোনার সঙ্গে আমরা ২০২০ সালের মার্চের আগে পরিচিত ছিলাম না। এ কারণে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের স্বাস্থ্য বিভাগকে প্রথমে বেশি বেগ পেতে হয়েছে। কিন্তু ডেঙ্গু সম্পর্কে তো আমরা অপরিচিত ছিলাম না। তাহলে কেন এক্ষেত্রে নির্লিপ্ততা দেখা গেল? কেন করোনাকালে ডেঙ্গু প্রতিরোধে আগাম যথাযথ সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়নি। বিগত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় নিশ্চয় আমাদের অজানা নয়, বর্ষা মৌসুমে এর প্রকোপ বাড়ে। এর অন্য কারণগুলোও অজানা নয়। তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা দৃষ্টিগ্রাহ্য হলো কেন?
ডেঙ্গুর নায়ক দু'জন, এক মশা, নাম- এডিস এজিপটি, দ্বিতীয় নায়ক ভাইরাস। এতদিন মানুষ জানত মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া হয়। এখন জানা যায় মশার কামড়ে শরীরে ভাইরাস সংক্রমিত হলে ডেঙ্গু হয়। ডেঙ্গুর উপসর্গের মধ্যে রয়েছে তীব্র জ্বর, তাপমাত্রা ১০৩-১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট। জ্বর থাকে পাঁচ থেকে সাত দিন। প্রথম দু-তিন দিন জ্বরের উপসর্গ বাড়তে থাকে। তারপর একটু অবদমিত হয়। তারপর চতুর্থ বা পঞ্চম দিনে আবার উপসর্গ বৃদ্ধি পায়। মাথাব্যথা, চোখ ব্যথা, শরীরের বিভিন্ন অস্থি-গ্রন্থিতে প্রদাহ এবং প্রচণ্ড ব্যথা, মাংসপেশির ব্যথা তীব্র হবে। জ্বরে গলা ফুলে যেতে পারে।
ডেঙ্গু আক্রান্ত খুব অল্পসংখ্যক রোগী (১ থেকে ২ শতাংশ) হেমোরেজিক জ্বরে আক্রান্ত হতে পারে। অনেকেরই ধারণা, ডেঙ্গু আক্রান্ত সব রোগী হেমোরেজিক জ্বরে আক্রান্ত হয়, এ ধারণা ঠিক নয়। মশার কামড়ের পাঁচ-সাত দিনের মধ্যে ডেঙ্গুর উপসর্গগুলো দৃশ্যমান হবে। সংক্রমণের জন্য দায়ী ভাইরাসের ইনকিউবেশন সময় (রোগ সঞ্চার থেকে প্রথম লক্ষণ দেখা দেওয়া পর্যন্ত) হলো পাঁচ-সাত দিন। এ জন্য পাঁচ-সাত দিন অপেক্ষা না করে তড়িঘড়ি প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা করা হলে তাতে কিছুই বোঝা যাবে না। ডেঙ্গুতে জ্বর ও তীব্র ব্যথা-বেদনা ছাড়া অন্য কোনো উপসর্গ থাকে না। কিন্তু হেমোরেজিক জ্বরে মারাত্মক কিছু উপসর্গ দেখা যায়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ডেঙ্গুর উপসর্গ জ্বর ও ব্যথা-বেদনা ছাড়াও পেটে তীব্র ব্যথা; নাক, মুখ ও দাঁতের মাড়ি থেকে রক্তক্ষরণ, রক্তবমি, কালো কয়লার মতো পায়খানা ইত্যাদি। এ ধরনের ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে সজাগ দৃষ্টিতে রাখা বাঞ্ছনীয়। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় রক্তক্ষরণের উপসর্গ দেখা দিলে জরুরি ভিত্তিতে রোগীকে হাসপাতালে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বরে রূপান্তরিত না হলে ভয়ের বিশেষ কারণ নেই। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার দু-তিন দিনের মধ্যে রক্তক্ষরণের উপসর্গ পরিলক্ষিত হবে। শিশুদের জন্য হেমোরেজিক জ্বর ভয়ংকর হতে পারে। এবার ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে আনুপাতিক হারে শিশুর সংখ্যা বেশি।
ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রমণের কারণে হয়ে থাকে বলে এর প্রতিকারে কোনো ওষুধ কার্যকর নয়। এই ডেঙ্গুতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার একেবারে অযৌক্তিক। জ্বর ও ব্যথা-বেদনার জন্য সচরাচর অ্যাসপিরিন প্রয়োগের বিধান থাকলেও ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে অ্যাসপিরিন ব্যবহার নিষিদ্ধ। কারণ অ্যাসপিরিন ও আইবোপ্রুফেন জাতীয় ওষুধগুলো রক্তক্ষরণের প্রবণতা ও মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। এর ফলে অবস্থার আরও অবনতি ঘটতে পারে। আমাদের মনে রাখা উচিত, সব রোগে ওষুধের প্রয়োজন হয় না। বরং কোনো কোনো রোগের বেলায় ওষুধ প্রয়োগ করলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। তবে হেমোরেজিক জ্বরের ক্ষেত্রে অবশ্যই অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। হেমোরেজিক ডেঙ্গু রোগীকে হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে এবং প্রচুর পানীয় পান করতে দেওয়া উচিত।
মশা ম্যালেরিয়ার বাহক। আবার মশা ডেঙ্গু ভাইরাসেরও বাহক। শুধু এডিস মশা কেন, সব মশাই আমাদের শত্রু, সব মশাই আমাদের টার্গেট। ম্যালেরিয়ার মশা, ডেঙ্গুর মশা- সব নির্বংশ করতেই হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর দেহ থেকে এই ভাইরাস অন্য সুস্থ লোকের দেহে সংক্রমিত করে এডিস মশা। তাই সংক্রমণ বন্ধ বা প্রতিরোধ করার জন্য ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীকে মশার কামড় থেকে রক্ষা করা অতি জরুরি। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে না কামড়ালে এবং মশা ডেঙ্গু ভাইরাস বহন না করলে তার কামড়ে ডেঙ্গু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। মশা কোথায় জন্মায়, কীভাবে এর বংশ বিস্তার ঘটে- এসব আমরা অনেকেই জানি। মশার প্রজনন জায়গাগুলোর মধ্যে রয়েছে পানিসমৃদ্ধ ড্রাম, মাটির ভাঙা হাঁড়ি-পাতিল বা তার ভগ্নাবশেষ, বিভিন্ন ছোট-বড় পাত্র, বালতি, ফুলের টব, ফুলদানি, পরিত্যক্ত বোতল, টায়ার, পলিথিন ব্যাগ, ছোট-বড় গর্ত, নালা বা পুকুর ইত্যাদি। এ জন্য প্রয়োজনমতো মশার ওষুধ ছিটাতে হবে। পরিবেশ দূষণ থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্যকেও বিরত রাখতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সব উদ্যোগ-আয়োজন শুরু হয় সমস্যা দেখা দিলে, তার আগে নয়।
প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ ভালো- এ কথাটি আমরা প্রায়ই বলে থাকি। কিন্তু মুখে যতই বলি না কেন, বাস্তবে আমরা তা প্রয়োগ করি না। কোনো কোনো রোগ বা আপদ-বিপদ আমাদের বিবেক-বুদ্ধিকে নাড়া দিয়ে যায়, আতঙ্কিত করে। তখন আমরা অনন্যোপায় হয়ে হলেও কিছুটা সচেতন হই। ডেঙ্গুর কথাই ধরা যাক। এই রোগের প্রতিকার ও প্রতিরোধে কমবেশি সবাই জানেন মশার ওষুধ ছিটানো এ ক্ষেত্রে জরুরি। কিন্তু যতই ওষুধ ছিটানো হোক আর কামান দাগানো হোক, মশা মরবে সামান্য ও সাময়িককালের জন্য। এটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়। কয়েকদিন পর আবার মশা হবে। আবার ডেঙ্গু হবে।
মানুষ মরবে। মশা মারার জন্য আমরা ওষুধ ছিটানোর কথা বলছি। কিন্তু মশা প্রতিরোধের জন্য আমাদের পরিবেশ সংরক্ষণের কথা সেভাবে কি বলা কিংবা কাজ করা হচ্ছে? প্রশ্ন হচ্ছে- কর্তৃপক্ষইবা কী করছে। এই ঢাকা শহরসহ পুরো দেশটাকে নোংরা, আবর্জনাময় ও অস্বাস্থ্যকর করার পেছনে আমাদের সবার কমবেশি অবদান রয়েছে। আমি বলি না হাজার চেষ্টা করেও মশামুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা যাবে। কিন্তু তা মনে করি আমরা সচেষ্ট হলে, যুক্তিসংগত আচরণ করলে, বিবেক-বুদ্ধি খাটালে, এত বেশি স্বার্থপর না হলে, অন্যের সুবিধা-অসুবিধার প্রতি মমত্ববোধ থাকলে, পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সচেতন হলে পরিস্থিতি অনেক নিয়ন্ত্রণে থাকত।
পরিবেশের সুরক্ষা কিংবা পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজটি তো এক বা দুই দিনের নয়; এটি বছরের ৩৬৫ দিনই করতে হবে। তাছাড়া আমাদের এখানে অনেক দায়িত্বশীল কিংবা বড় পদে অধিষ্ঠিতরাই যেখানে কাজের কাজ করেন না, সেখানে ছোটদের কথা কী আর বলার আছে। যারা মশার ওষুধ ছিটান, তাদের প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। অভাব রয়েছে পরিস্থিতি বোঝার মতো জ্ঞানের। মশা নিধনের নামে এ পর্যন্ত কত টাকা খরচ হলো এর হিসাব মেলানো ভার, কিন্তু সুফল নেই। নিম্নমানের ওষুধ, মশার ওষুধ কেনা ও ব্যবহার নিয়ে দুর্নীতি ইত্যাদিও কম হয়নি। দুর্নীতির ডালপালা ছড়ানো। এর অপচ্ছায়া নানা দিকে। এমতাবস্থায় যে কোনো কিছুরই সুফল দুরাশার নামান্তর। আমাদের স্মরণে আছে, ২০১৯ সালে ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতায় ও নাগরিক সমাজের অনেকেরই অসচেতনতার কারণে আমরা ফের সেই রকম পরিস্থিতিতে যাতে না পড়ি, এ জন্য সবারই দায় রয়েছে কমবেশি। তারপরও সব রকম প্রস্তুতি নিয়ে রাখা দরকার। আমাদের স্বাস্থ্য খাত কতটা ভঙ্গুর এর নজির মিলেছে করোনাকালে। ডেঙ্গুর চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিশেষ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার। পরীক্ষা ও চিকিৎসার পরিসর শুধু বাড়ানোই নয়, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় গভীর মনোযোগ দিতে হবে। দায়িত্বশীলরা বাগাড়ম্বর বন্ধ করে কাজের কাজ করুন। আমাদের সমস্যাগুলো অচিহ্নিত নয়। তাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে সবাই দায়িত্বশীলতা, স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহির পরিচয় দিলে সমস্যা নিরসন না হওয়ার কারণ নেই। দায়িত্বশীলরা যেন অতীত ভুলে না যান। সময়ের কাজ সময়ে করতে তারা যেন সজাগ থাকেন।
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল ফার্মাসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
drmuniruddin@gmail.com