করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এখনও নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই সংক্রমণের তীব্রতার পরিপ্রেক্ষিতে করোনার টিকার চাহিদা প্রবল। আমরাও যখন টিকার সংকটে রয়েছি, তখন করোনার টিকা দেশে উৎপাদনের বার্তা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত স্বস্তির। মঙ্গলবার সমকালসহ অন্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, তিন মাসের মধ্যে চীনের সিনোফার্মের টিকা দেশেই উৎপাদন করবে বেসরকারি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ইনসেপ্‌টা ভ্যাকসিন লিমিটেড। যৌথভাবে উৎপাদিত এ টিকা সরকার কিনবে ইনেসেপ্‌টার কাছ থেকে। সোমবার ঢাকায় সিনোফার্ম, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ইনসেপ্‌টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা চুক্তি হয়। আমরা জানি, দেশে গত ফেব্রুয়ারিতে টিকা প্রদান কার্যক্রম শুরু হলে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার প্রথম ডোজ দেওয়ার পর স্বল্পতার কারণে দ্বিতীয় ডোজে সংকটের সৃষ্টি হয়। সেই সংকট কিছুটা দূর হলেও টিকার সরবরাহ এখনও পর্যাপ্ত নয়। আমরা দেখেছি, দেশব্যাপী গণটিকাদান কার্যক্রম মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগালেও টিকার স্বল্পতার কারণে আপাতত তা বন্ধ। তবে ইতোমধ্যে বিভিন্ন উৎস থেকে বেশকিছু টিকা দেশে এসেছে, পাইপলাইনেও রয়েছে আরও। টিকা উৎপাদনকারী দেশগুলো চাহিদা অনুযায়ী টিকা সরবরাহ করতে পারছে না। দেশে প্রথম যখন টিকা কার্যক্রম শুরু হয় আমরা দেখেছি, অনেকেই তখন টিকা নেওয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহী ছিলেন। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেকেই করেননি নিবন্ধনও। কিন্তু এখন টিকা নিতে মানুষের মধ্যে যে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তাতে প্রতীয়মান হয়, মানুষের মধ্যে সচেতনতাবোধ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা জানি, করোনা প্রাণঘাতী হলেও সচেতনতা-সতর্কতাই তা প্রতিরোধের অন্যতম উপায়। আমাদের এখনও বিপুলসংখ্যক ডোজ টিকা প্রয়োজন। এত টিকা কত দিনে পাওয়া সম্ভব বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় তা অনিশ্চিত। এমতাবস্থায় দেশে টিকা উৎপাদনের পথ খুলে যাওয়ার বিষয়টি আমাদের অনেকাংশেই নিরুদ্বিগ্ন করেছে। একই সঙ্গে এর মধ্য দিয়ে করোনার টিকা উৎপাদনের বৈশ্বিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হলো বাংলাদেশ। আমরা মনে করি, দেশে করোনা নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থা আরও একধাপ অগ্রগতি। আশা করা হচ্ছে, এই যৌথ উদ্যোগে মাসে চার কোটি ডোজ টিকা উৎপাদন সম্ভব। যদি তা-ই হয় তাহলে দেশে মানুষের টিকার প্রাপ্যতা সহজ হবে। আমরা জানি, করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে টিকা অত্যন্ত জরুরি। সারাদেশের মানুষকে টিকার আওতায় আনতেই হবে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, সোমবার পর্যন্ত টিকার জন্য নিবন্ধন করেছেন প্রায় ৩ কোটি ২৬ লাখ ৬২ হাজার ৫০১ জন। এর মধ্যে ১ কোটি ৫৬ লাখ ৩৬ হাজার ৪৬৩ জন প্রথম ডোজ ও ৫৬ লাখ ৯৪ হাজার ২৮০ জন দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন। আমরা জানি, দেশে সরকারিভাবেও টিকার যৌথ উৎপাদনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা রয়েছে। সংবাদমাধ্যমেই প্রকাশ, রাশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে টিকা উৎপাদনের আলোচনাও এগিয়েছে। তবে রাশিয়ায় ফের করোনার সংক্রমণ তীব্রতায় এই প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত রয়েছে। চীন কভিড-১৯ মহামারির বিরুদ্ধে বৈশ্বিক লড়াইয়ে যে কার্যকর ভূমিকা রাখছে আমরা এ জন্য সাধুবাদ জানাই। আমরা মনে করি, চীনের প্রতিষ্ঠান সিনোফার্মের করোনার টিকা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান ইনসেপ্‌টার সঙ্গে যৌথ উৎপাদনের ত্রিপক্ষীয় চুক্তি চীন-বাংলাদেশের মধ্যে মৈত্রী ও অসাধারণ অংশীদারিত্বেরই দৃষ্টান্ত। আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই লিখে ছিলাম, বিদ্যমান বাস্তবতায় দেশে দ্রুত টিকা উৎপাদন নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। এখন যেহেতু সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়েছে, সেহেতু সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দ্রুত টিকা উৎপাদন শুরু করা দরকার। উৎপাদন বেশি করতে পারলে আমাদের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি করার সুযোগও রয়েছে। ইতোমধ্যে টিকা প্রদান কার্যক্রমে কিছু ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি লক্ষ্য করা গেছে। অব্যবস্থাপনা দূর করতেই হবে। করোনা থেকে রক্ষা পেতে সচেতনতার পাশাপাশি জোর দিতে হবে টিকা কার্যক্রমেই।