আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় তালেবান দেশটির ক্ষমতা দখল করে নিয়েছে। তালেবানের হাত থেকে বাঁচতে যেভাবে সম্ভব সেভাবেই জন্মভূমি ছেড়ে পালাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে দেশটির অসংখ্য মানুষ। তাই মার্কিন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে নিন্দার ঝড়। সবার এক কথা- আফগান জনগণকে এভাবে তালেবানের সামনে ঠেলে দিয়ে চলে যাওয়া ঠিক হয়নি মার্কিনিদের। কিন্তু শুধু যুক্তরাষ্ট্র কেন? আফগানিস্তানের এ অবস্থার জন্য জাতিসংঘের কি কোনো দায় ছিল না?
তালেবানের হাতে কাবুলের পতনের এক দিনের মাথায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার প্রশাসনের সাফাই গাইতে মুখোমুখি হয়েছেন সাংবাদিকদের। সেখানে তিনি নিজ সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেছেন, তারা কোনো বিদ্রোহী দমনের জন্য আফগানিস্তানে যাননি; গিয়েছিলেন জঙ্গি দমনে। জঙ্গি দমন হয়ে গেছে। তাই তারা ফিরে গেছেন। সংবাদ সম্মেলনে জো বাইডেন আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন- আফগানিস্তানের জাতি গঠন কিংবা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা আমেরিকার কাজ নয়। আপাত বিবেচনায় জো বাইডেনের কথাকে কারও কারও কাছে যৌক্তিক মনে হতেই পারে। কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে তা কখনও হবে না। প্রথমত, বাইডেনের বক্তব্য অনুযায়ী তালেবান জঙ্গি নয়; বিদ্রোহী। তাহলে গত ২০ বছর ধরে আফগানিস্তানে কার বিরুদ্ধে তারা যুদ্ধে লিপ্ত ছিল? দ্বিতীয়ত, ২০০১ সালে দুই মাসের যুদ্ধেই সব জঙ্গি গর্তে ঢুকে পড়েছিল। তাহলে পরবর্তী ২০ বছর তারা সেখানে কী করছিল?
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে জো বাইডেনের এটা ভালোভাবেই জানার কথা, আফগানিস্তানে ২০০১ সালের ডিসেম্বরের পর থেকে যা ঘটেছে তার তাত্ত্বিক ভিত্তি হলো ৫ ডিসেম্বর ২০০১ সালে স্বাক্ষরিত প্রথম 'বন' চুক্তি। ওই চুক্তির ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ তার ১৩৮৬ নম্বর রেজুলেশনবলে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সহায়তা ফোর্স গঠনের অনুমোদন প্রদান করে। আর এই ফোর্সের নামেই মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তানে এত বছর অবস্থান করে। তাই আফগানিস্তান সম্পর্কিত কোনো আলোচনায় 'বন' চুক্তিকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। 'বন' চুক্তির প্রথমেই আফগান জাতি গঠনের কথা বলা হয়েছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা আর বিচারব্যবস্থা পুনর্গঠনের কথাও সেখানে আছে। তাই, সংবাদ সম্মেলনে তিনি যা বলেছেন, তা সত্যের বিকৃতি ছাড়া আর কিছুই নয়।
'বন' সম্মেলনের উদ্যোগ নিয়েছিল জাতিসংঘ। জাতিসংঘের উদ্যোগেই আফগান সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করতে জার্মানির বন শহরে ২০০১ সালের ৫ ডিসেম্বর এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় আফগানিস্তানে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি ছিলেন আলজিরিয়ান কূটনীতিক লাখদার ব্রাহিমি। যে ২৫ জন ব্যক্তি এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, লাখদার ব্রাহিমিও তাদের একজন। এর পর চলে গেছে ২০টি বছর। এই সময়ে আফগানিস্তানের জাতিসংঘ মিশনে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে সাতজন কাজ করেছেন। কিন্তু বন চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে কেউই তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেননি। বছর বছর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ আফগান মিশনের ম্যান্ডেট নবায়ন করেছে। কিন্তু নেতৃত্ব ব্যস্ত থেকেছে 'ফরজ' বাদ দিয়ে 'নফল' এজেন্ডা বাস্তবায়নে। বন চুক্তির মর্মার্থ অনুযায়ী আফগানিস্তানের জাতি গঠন এবং প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপনের কাজটি করার দায়িত্ব নিয়েছিল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, যা বরাবরই হয়েছে অবহেলিত। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক অবকাঠামো নির্মাণও তেমন গুরুত্ব পায়নি জাতিসংঘের কাছে। অবশ্য জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থাগুলো তাদের কাজ ঠিকই চালিয়ে গেছে। কিন্তু রাজনৈতিক মিশনের কাজটিই রয়ে গেছে প্রশ্নবিদ্ধ।
অভিযোগ রয়েছে, আফগানিস্তানের জাতিসংঘ মিশন তার আসল কাজ বাদ দিয়ে বিশেষ বিশেষ দু-একটি রাষ্ট্রের দূতাবাসের পরামর্শ বাস্তবায়নেই ব্যস্ত থেকেছে বেশি। এ কাজ করতে গিয়ে জাতিসংঘ তার অভ্যন্তরীণ প্রশাসন বিন্যাস এবং পুনর্গঠনেও সময় দিয়েছে বেশি। এ কথা আজ স্পষ্ট- আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সহায়তা ফোর্স বা ন্যাটোকে প্রভাবিত করার মতো শক্তি কিংবা ইচ্ছা দুটির কোনোটিই জাতিসংঘ মিশনের ছিল না। উল্টো ওই দুটি সংস্থার নেতৃত্ব যা বলেছে, জাতিসংঘ তা-ই করেছে।
প্রতিষ্ঠাকালীন কিছু সময় ছাড়া জাতিসংঘ মিশন আফগানিস্তানে কখনোই তেমন বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারেনি। এমনকি, যখন ন্যাটো বা আমেরিকান সৈন্যরা নির্বিচারে বোমা ফেলে মানুষ হত্যা করেছে, তখনও তারা তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। অন্যদিকে, আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে যদি কোনো সন্ত্রাসী আহত হতো; জাতিসংঘ তোলপাড় শুরু করে দিত এই বলে- সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।
গত ২০ বছরে এটা লক্ষ্য করা গেছে, যখনই দেশটির জাতিসংঘ মিশনে কোনো নতুন নেতৃত্ব যোগ দিতেন, তাদের প্রথম কাজই হতো হাতেগোনা চার-পাঁচটি দেশের কূটনীতিকের আস্থা অর্জন করা; আফগান জনগণের আস্থা অর্জন নয়। গত এক দশক ধরে মিশন নেতৃত্বের মাঝে দুটি ধারা প্রবহমান। একটি সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ধারা, অন্যটি পশ্চিমা ধারা। এই দ্বন্দ্ব্বে পড়ে অনেক সময়ই মিশন ম্যান্ডেট বাস্তবায়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মারাত্মকভাবে।
জাতিসংঘের এসব দুর্বলতার কারণে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সহায়তা ফোর্স বা ন্যাটো হয়ে উঠেছিল বেপরোয়া। তাদের কোনো কাজের জন্য কারও কাছে জবাবদিহি করতে হয়নি। শুধু তাই নয়, এসব কারণে আফগানিস্তানে জাতি গঠন এবং প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের কাঠামো নির্মাণ কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে দারুণভাবে। যার সুযোগ নিয়েছে তালেবান, হাক্কানি নেটওয়ার্কসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী।
দুঃখজনক হলেও এটাই সত্যি, আফগানিস্তানে জাতিসংঘ সব সময় দূরদৃষ্টির অভাব দেখিয়েছে। তাদের দূরদৃষ্টির অভাবেই ১৯৯৬ সালে ড. নাজিবুল্লাহকে জাতিসংঘ আঙিনা থেকে ধরে নিয়ে তালেবান হত্যা করতে পেরেছিল। এবারও জাতিসংঘ তার দূরদৃষ্টির অভাবের প্রমাণ দিয়েছে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সহায়তা ফোর্স বা ন্যাটো বাহিনী চলে গেলে কী অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে, তা আগে থেকেই বোঝা উচিত ছিল এবং সে অনুযায়ী সাবধানতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ আবশ্যক ছিল। কিন্তু জাতিসংঘ তা করেনি। কাজেই আফগানিস্তানে যে অরাজক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, এর দায় কমবেশি জাতিসংঘকেই নিতে হবে।
বাইডেন না হয় তার নিজ দেশের স্বার্থে আফগান জনগণকে তালেবানের মুখে ছেড়ে দিয়ে গেছেন। কিন্তু জাতিসংঘ? কার স্বার্থে? এর জবাব আজ হোক আর কাল হোক; মিশনপ্রধান দেবারা লায়নসকে দিতেই হবে।
সাবেক রাজনীতি বিষয়ক কর্মকর্তা জাতিসংঘ, আফগানিস্তান