বিশ্বময় মহামারি করোনার মধ্যেই আমরা আরবি নতুন বছরে প্রবেশ করেছি। এখন চলছে আরবি বর্ষের প্রথম মাস মহররম। বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর সংস্কৃতিতে ও মুসলমানদের জীবনে হিজরি সনের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামী আরবি বর্ষপঞ্জিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের পুণ্যময় স্মৃতি। তাই যুগ যুগ ধরে মুসলমানদের কাছে হিজরি সাল অনেক গুরুত্ব বহন করে আসছে। পবিত্র কোরআন মাজিদে চারটি সম্মানিত মাসের কথা বলা হয়েছে। মহানবী (সা.) বলেন- সময়ের হিসাব যথাস্থানে ফিরে এসেছে, আসমান-জমিনের সৃষ্টির সময় যেমন ছিল। (কারণ, জাহেলি যুগে আরবরা নিজেদের স্বার্থ ও মর্জি মতো মাস-বছরের হিসাব কম-বেশি ও আগ-পিছ করে রেখেছিল।) ১২ মাসে এক বছর। এর মধ্য থেকে চারটি মাস সম্মানিত। তিনটি মাস ধারাবাহিকভাবে জিলকদ, জিলহজ ও মহররম। আরেকটি হলো রজব, যা জুমাদাল আখিরাহ ও শাবানের মধ্যবর্তী মাস। (সহীহ বুখারি)
যদিও মুসলমানদের রোজা, হজ, ঈদ, কোরবানিসহ ইসলামের বিভিন্ন বিধি-বিধান হিজরি সনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বর্তমান যুগে তা শুধু রমজান ও ঈদের হিসাব রাখার মধ্যেই যেন সীমিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই হিজরি সনের সূচনা হয়। ইসলামী সন তথা হিজরি সন মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মক্কা থেকে মদিনা হিজরতের ঐতিহাসিক তাৎপর্যময় ঘটনার অবিস্মরণীয় স্মারক।
আল্লামা শিবলি নোমানি রহমতুল্লাহ আলাইহি সুপ্রসিদ্ধ আল ফারুক গ্রন্থে উল্লেখ করেন, হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে ১৬ হিজরি সনের শাবান মাসে খলিফার কাছে একটি দাপ্তরিক পত্রের খসড়া পেশ করা হয়। পত্রটিতে মাসের উল্লেখ ছিল, সনের উল্লেখ ছিল না। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন খলিফা বললেন, পরবর্তী কোনো সময়ে তা কীভাবে বোঝা যাবে যে, এটি কোন সনে পেশ করা হয়েছিল? অতঃপর তিনি সাহাবায়ে কেরাম ও অন্যান্য শীর্ষ পর্যায়ের জ্ঞানী-গুণীদের পরামর্শে হিজরতের ১৬ বছর পর ১০ জুমাদাল উলা মুতাবিক ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে হিজরি সন প্রবর্তনের এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। হিজরতের বছর থেকে সন গণনার পরামর্শ দেন হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু। পবিত্র মহররম মাস থেকে ইসলামী বর্ষ শুরু করার পরামর্শ প্রদান করেন হজরত ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু। (বুখারি ও আবু দাউদ)
বর্ষ গণনার ক্ষেত্রে হিজরতের বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণ কী? অথচ মহানবী (সা.)-এর নবুয়তপ্রাপ্তিসহ আরও একাধিক বিষয়কে কেন্দ্র করে সন গণনা শুরু করা যেত। এ প্রশ্নের উত্তর আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানি (রহ.) এভাবে দিয়েছেন- সুহাইলি (রহ.) এ বিষয়ে রহস্য উন্মোচন করেছেন। তিনি বলেছেন, সাহাবায়ে কেরাম সন গণনার বিষয়ে হিজরতকে প্রাধান্য দিয়েছেন সুরা তওবার ১০৮ নম্বর আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে। সেখানে প্রথম দিন থেকে তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত মসজিদে নামাজ আদায় করতে বলা হয়েছে। এই 'প্রথম দিন' ব্যাপক নয়। এটি রহস্যাবৃত। এটি সেই দিন, যেদিন ইসলামের বিশ্বজয়ের সূচনা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিরাপদে, নির্ভয়ে নিজ প্রভুর ইবাদত করেছেন। মসজিদে কোবার ভিত্তি স্থাপন করেছেন। ফলে সন গণনার ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরাম সেই দিনকেই বেছে নিয়েছেন। (ফতহুল বারি :৭/২৬৮)
হিজরি বছরের প্রতিটি মাসেরই রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। ইসলামে এ মাসের অনেক গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে। মহররম মাস শুধু কারবালার ঘটনা স্মরণ করার মাস নয়, বরং মুসলিম বিশ্বকে নতুন করে গড়ে তোলার দৃঢ় প্রতিজ্ঞার মাস।
মহররম শব্দের অর্থ সম্মানিত। ইসলামের ইতিহাসে এই মাসটি এমন কতগুলো উল্লেখযোগ্য স্মৃতিবিজড়িত, যে স্মৃতিগুলোর সম্মানার্থেই এই মাসকে মহররম বা সম্মানিত বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাই তো এ মাসে রোজা ও নফল ইবাদত উত্তম।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে- হজরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রোজা রাখার জন্য এত অধিক আগ্রহী হতে দেখিনি, যত দেখেছি এই আশুরার দিন এবং রমজান মাসের রোজার প্রতি।' (বুখারি)
আমাদের প্রত্যাশা, হিজরি নতুন বছর বিশ্ববাসীর জন্য বয়ে আনবে শান্তি, নিরাপত্তা আর দূর হবে মহামারি করোনা এবং বন্ধ হবে ধর্মের নামে রক্তপাত। দয়াময় প্রভুর দরবারে আমাদের প্রার্থনা, হে প্রভু! আপনি আমাদের ক্ষমা করে নতুন বছরকে আমাদের জন্য কল্যাণময় করুন।
ইসলামী গবেষক

বিষয় : মহররম মহিমা মাহমুদ আহমদ

মন্তব্য করুন