গত মাসে ইউরোপে যাওয়ার উদ্দেশ্যে মৃত্যুঝুঁকি মাথায় নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে অভিবাসীপ্রত্যাশী অন্তত ১৭ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। ২০২১ সালের প্রথম ছয় মাসে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যাওয়ার পথে ৯৩৭ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যুর তথ্য রেকর্ড করেছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর। তাদের মধ্য উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি রয়েছেন। সংস্থাটি জানিয়েছে, ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপযাত্রার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। এই বাস্তবতায় স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, অভিবাসনে ভাগ্য গড়ার আর কোনো রাস্তা কি আমাদের খোলা নেই? এ কথা মাথায় রেখেই আমার কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সফরের অভিজ্ঞতা এখানে উপস্থাপন করতে চাই।
পশ্চিম আফ্রিকার যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশ সিয়েরা লিওনের প্রেসিডেন্ট ড. আলহাজ টেজান কাব্বা আর কৃষি ও বনমন্ত্রী এবং কৃষিবিজ্ঞানী ড. সামা মন্ডে ২০০৪ সালে সে দেশের কৃষি উন্নয়নে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা জানতে ঢাকায় এসেছিলেন। বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর শান্তি মিশনে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের কথা মনে রেখে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্দেশ্যও ছিল সফরের অন্যতম লক্ষ্য। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কথা বলে এদেশের একটি বিশেষজ্ঞ গ্রুপ পাঠানোর প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে একই বছরের জুলাই মাসে বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে ১২ দিনের জন্য আমি ও বাংলাদেশ রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (বিআরআরআই) সাবেক মহাপরিচালক দেশের স্বনামধন্য মৃত্তিকাবিজ্ঞানী ড. এন আই ভূঁইয়া সিয়েরা লিয়ন ভ্রমণ করি।
আমরা সিয়েরা লিওনের গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপ্রধান এলাকা সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করি এবং কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলি। সেসব এলাকা হচ্ছে দক্ষিণের বো, পুজেহান, উত্তরের টঙ্কলিলি, উপকূলের ম্যানগ্রোভ এলাকা, জলাভূমি অঞ্চল, রোকপুর ধান গবেষণা কেন্দ্র, কাজুবাদাম প্রক্রিয়া কেন্দ্র, চিনি কারখানা ইত্যাদি। বো শহরের প্রধান কর্ণধারের সঙ্গে সাক্ষাতে তার বৈঠকখানায় বিরাট বাঁধানো সেনা পোশাকে এক ছবিতে চোখ আটকে গেল। তা দেখে তিনি অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে পরিচয় করালেন সে ছবিটার মানুষের সঙ্গে। তিনি সে সময়কার আমাদের সেনাপ্রধান হাসান মশহুদ চৌধূরী (আমার যদ্দূর মনে পড়ে)। তার মুখে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূয়সী প্রশংসায় সীমাহীন গৌরব অনুভব করলাম। সে প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো যে, আমাদের শান্তিরক্ষা বাহিনীর মাধ্যমেই আমাদের দেশের উন্নত বীজ এবং প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির অন্যান্য বিষয়ে জানতে পেরেছেন তিনি। বাংলাদেশের ভূমিকার কথা বিবেচনা করেই বাংলাভাষাকে সিয়েরা লিওনের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করা হয়।
স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, অল্প জনসংখ্যা এবং বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ সিয়েরা লিওনের দারিদ্র্যের হার এত বেশি কেন? স্থানীয় বাজারে গুটি কয়েক সবজি এবং অপ্রতুল সরবরাহ প্রত্যক্ষ করলাম। কৃষির অবস্থা দেখে ধারণা হলো, প্রচুর অনাবাদি জমি এবং পশ্চিম আফ্রিকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুপেয় পানি থাকা সত্ত্বেও প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নেই। ফসলের উৎপাদনশীলতা ও বৈচিত্র্য যথেষ্ট কম। এমন কি প্রাণিসম্পদেরও লক্ষণীয় উন্নয়ন নেই।
বিদেশ থেকে প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে খাদ্য আমদানি করতে হয়। দেশটির তৎকালীন সরকারের ক্ষুধামুক্তির প্রচেষ্টা এবং বর্তমান সরকারের দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়ার প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ করতে কৃষি গবেষণা, সম্প্রসারণ, বিপণন, ঋণ, উপকরণ সরবরাহে বিরাট পরিবর্তন করতে হবে। প্রয়োজন হবে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ। তবে সাধারণ মানুষের বিশেষ করে যুবকদের মধ্যে কৃষিতে আগ্রহ কম বলে মনে হলো। বরং স্বল্প সময়ে অধিক লাভের আশায় তাদের ডায়মন্ড শিল্পের মালিকদের সহযোগিতার দিকে ঝোঁক রয়েছে। তা ছাড়া কৃষিতে প্রযুক্তি এখনও বেশ অনুন্নত বলে ধারণা হলো। আমাদের সফরের শেষে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশসহ একটি রিপোর্ট পেশ করি। উন্নত বীজ, সার, যন্ত্রপাতির প্রচলন, শিক্ষা প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সহযোগিতায় জোর দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্থানীয় পরিবেশের উপযোগী প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে দ্রুত প্রয়োগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের আইন এবং আমাদের সক্ষমতা বিষয়ে ধারণা দেওয়া হলে সে দেশের গবেষণা জোরদার করার জন্য বিএআরসি আইন সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করেন সিয়েরা লিওনের কৃষিমন্ত্রী।
লক্ষ্য করলাম, পার্শ্ববর্তী দেশ ঘানাতে শ্রীলঙ্কার বেশ কিছু যুবক জমি লিজ নিয়ে সবজি চাষ করে ইউরোপে রপ্তানি করে উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করেছে। ব্র্যাকের উদ্যোগে বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা রয়েছে পশ্চিম আফ্রিকার কয়েকটি দেশে বলে জানতে পেরেছি।
সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি বেসরকারি সংস্থা সিয়েরা লিওনে দেশের কৃষি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে, যা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক একটি ঘটনা। আমাদের দেশের সেনাবাহিনীর সাফল্যকে ব্র্যান্ডিং করে এবং আমাদের কৃষির সক্ষমতা বিবেচনা করে পশ্চিম আফ্রিকায় কৃষিতে বিনিয়োগের সুযোগ নেওয়া প্রয়োজন।
ইদানীং প্রচুর বাংলাদেশি যুবকের উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপ যাত্রাপথে ভূমধ্যসাগরে হারিয়ে যাওয়া মনে কষ্ট জাগায়। এভাবে আমাদের ছেলেদের স্বপ্টম্ন হারাতে পারে না। বাংলাদেশের অর্থনীতির কলেবর এখন বেশ শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ, কৃষি বিশেষজ্ঞ সেবা আর সর্বোপরি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা দিয়ে যুব সম্প্রদায়কে এসব দেশের উন্নয়ন কাজে নিয়োগ করা যেতে পারে। ইতোমধ্যে চীনসহ বেশকিছু উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা সিয়েরা লিওনে কৃষিতে বিনিয়োগ করছে।
পরিশেষে বলতে চাই, আমাদের শিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত উন্নয়নকামী যুবশক্তিকে আফ্রিকার উন্নয়নে অংশগ্রহণ এবং মর্যাদাপূর্ণ আয়-উপার্জনে ব্যবহার করতে এখন প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে হাই হ্যাংগিং ফ্রুট হার্ভেস্ট করার সময়। প্রয়োজন শুধু দক্ষতা অর্জন আর তা কাজে লাগানো।
সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল