মাস্ক বা মুখোশ কখনও ইতিবাচক অর্থ বহন করত না। মুখোশ মানুষের আসল পরিচয় লুকিয়ে রাখার কাজেই ব্যবহূত হতো। প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট রনবী (রফিকুন নবী) তার কার্টুনচিত্রে অপরাধী বোঝানোর জন্য একটি কালো মুখোশ লাগিয়ে দিতেন। সেই মুখোশ এখন আমাদের অত্যাবশ্যকীয় ও নিত্যব্যবহার্য জিনিসে পরিণত হয়েছে। করোনা নামক ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে মুখে মাস্ক বা মুখোশ ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলে যাচ্ছে। মানুষের আচার-আচরণ, কথাবার্তা, কাজকর্ম সবকিছুতেই পরিবর্তনের ছোঁয়া। এ পরিবর্তন ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচকই বেশি। জীবনকে নিরাপদ রাখতে মানুষ ব্যবহার করে কাপড়ের মাস্ক, যা দৃশ্যমান। কিন্তু এমন কিছু মাস্ক বা মুখোশ আছে, যেগুলো খালি চোখে দেখা যায় না। ওইসব মুখোশ পরে কিছু মানুষ নিজেদের আসল পরিচয় বা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য লোকচক্ষুর অন্তরালে রাখে। মুখোশের পেছনে লুকিয়ে থাকে তাদের কদাকার মুখ। এসব মুখোশধারী সমাজে ভদ্রজন হিসেবে পরিচিত। যতক্ষণ তাদের আসল রূপটি প্রকাশ না পায়, ততক্ষণ তারা সমাজে সম্মান ও মর্যাদার আসনে উপবেশনের সুযোগ পান। তারা রাজনীতি, সমাজসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রশাসন, ধর্ম, শিল্প-সংস্কৃতি সবখানেই বিরাজ করেন। এমন নিপুণতার সঙ্গে মুখোশের আড়ালে তারা তাদের মুখটি ঢেকে রাখেন; সাধারণ মানুষ তাদের ভালোমানুষ ভেবে বিভ্রান্ত হয়। সাধারণের এই বিভ্রান্তিকে পুঁজি করে তারা একটি সময় পর্যন্ত বিচরণ করেন দোর্দণ্ড প্রতাপে।
করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর মাস্ক নিয়েও জাল-জালিয়াতিতে মেতে উঠেছিল এক শ্রেণির মুখোশধারী মানুষ। তারা নকল মাস্ক সরবরাহ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তাদের অনেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে পাকড়াও হয়েছে। তাদের কর্মকাণ্ডে হতভম্ব হয়ে গেছি। রিজেন্ট সাহেদের কথাই ধরুন। টিভি টকশোতে তার কথাবার্তা, চালচলন, ওপর মহলে ওঠাবসা আর ঠাটবাট দেখে কি কস্মিনকালেও কেউ ভাবতে পেরেছিলেন- তার ওই ভালোমানুষের মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে ছিল একটি অর্থলোভী শকুন! সম্প্র্রতি আলোড়ন সৃষ্টিকারী আরেক ব্যক্তি হেলেনা জাহাঙ্গীর। ব্যবসায়ী এ নারী রাজনীতির মুখোশ পরে স্থান করে নিয়েছিলেন সমাজের ওপরতলায়। আইপি টেলিভিশন চ্যানেল আর জনকল্যাণমূলক সংগঠনের নামে তার রমরমা চাঁদাবাজির তথ্য উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যমে। কিন্তু বিধিবাম হলে যা হয়। যে মুখোশের আড়ালে তিনি অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তা খসে পড়ল। উন্মোচিত হলো তার প্রকৃত চেহারা।
ঢাকাই চলচ্চিত্রের উঠতি নায়িকা পরীমণি। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার বাসায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ তাকে গ্রেপ্তার করে। অভিযোগ আছে, অভিজাত ফ্ল্যাটে জলসায় অংশ নিতেন সমাজের উচ্চস্তরের অনেকেই। তাদের একটি তালিকাও নাকি এখন পুলিশের হাতে। এই তালিকা জনসমক্ষে আসবে কিনা জানি না। তবে ইতোমধ্যে একজনের পরিচয় আমরা জানতে পেরেছি। তিনি ডিবি পুলিশের এডিসি গোলাম সাকলায়েন শিথিল। পরীমণির সান্নিধ্য পেতে তিনি তার দায়িত্ব-কর্তব্যেই শুধু শিথিলতা দেখাননি; ডুব দিয়েছেন অনৈতিকতার সরোবরেও। কর্তৃপক্ষ তাকে ডিবি থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। পরীমণি ও গোলাম সাকলায়েন দু'জনই মুখোশ পরে ছিলেন। একজন চলচ্চিত্রশিল্পীর, আরেকজন পুলিশের।
চোখ-কান একটু খোলা রাখলে দেখবেন, আপনার আশপাশে যারা ব্যবসায়ী-সমাজসেবী, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, পীর-মুর্শিদ-মাওলানা, পুরোহিত-যাজক, শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীরূপে অনেকেই বিচরণ করছেন মুখোশ পরে। যে রাজনৈতিক নেতাকে দিনের বেলায় দেখা যায় সমাজবিরোধী অপরাধীদের উৎখাতের বক্তৃতা দিতে, রাতের বেলায় তিনিই হয়ে যান সন্ত্রাসীদের গডফাদার। সমাজ থেকে অন্যায়-অনাচার-দুর্নীতি নির্মূল করতে যিনি জীবনপাত করার ঘোষণা দেন; দিন শেষে তাকে দেখা যায় দুর্নীতির হোতা হিসেবে। না, এটা বলা যাবে না- যারা রাজনীতি করেন সবাই ওই ক্যাটাগরির। তবে রাজনীতিতে পচন ধরার যে কথাটি শোনা যায়, তার উৎপত্তি হয়েছে এই শ্রেণির রাজনৈতিক নেতার কারণেই। সংখ্যায় তারা কমও নয়। আমাদের সৎ ও নিষ্ঠাবান রাজনীতিক এখনও আছেন। তবে তারা কোণঠাসা। রাজনীতির মুখোশের আড়ালে তারা স্বার্থসিদ্ধির জন্য বিপথে যান না। তাদের মুখে কোনো মুখোশ নেই।
সমাজসেবীর অভাব আমাদের দেশে আগেও ছিল না, এখনও নেই। এই সমাজসেবীদের দেখা আমরা পাই বিশেষ করে নির্বাচন এলে। পোস্টারের নিচে তারা লিখে থাকেন- 'ভোট দিয়ে জনগণের সেবা করার সুযোগ দিন'। যদি সে সুযোগ তারা পেয়ে যান, তখনই তাদের মুখোশটি উধাও হয়। তখন আর জনসেবা বা দেশসেবার কথা স্মরণে থাকে না। আত্মসেবাই হয়ে ওঠে মুখ্য। ব্যবসায়ীদের মধ্যেও মুখোশধারীর অভাব নেই। তারা সব সময় বিড়ালতপস্বীর রূপ ধরে থাকেন। কর ফাঁকি, চোরাকারবার, টাকা পাচার করে দেশের অর্থনীতিকে ফোকলা করে দেন। সরকারি অফিসে বসে যে লোকগুলো নীতিকথা বলেন; রাজনীতিকরা দেশকে উচ্ছন্নে দিল বলে ক্ষোভ ঝাড়েন, তাদের অনেকেই নগদ নারায়ণ না পেলে ফাইলে সই করেন না। অসৎ রাজনীতিকদের যোগসাজশে সরকারি অর্থ লোপাট করেন।
১৯৭৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'দস্যু বনহুর' ছবিতে নায়ক সোহেল রানার মুখে প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক (প্রয়াত) আজাদ রহমানের কণ্ঠে একটি গান ছিল- 'ডোরাকাটা দাগ দেখে বাঘ চেনা যায়/ বাতাসের বেগ দেখে মেঘ চেনা যায়/ মুখঢাকা মুখোশের এই দুনিয়ায়/ মানুষকে কী দেখে চিনবে বলো ...।' বাস্তবিক আমাদের সমাজে মুখোশধারীরা এমন পরিপাটি সাজে চলাফেরা করেন; বুদ্ধিসুদ্ধিতে খাটো আমজনতার পক্ষে তাদের চেনার উপায় থাকে না। আর সে সুযোগে তারা তাদের অপকর্ম ধরা না পড়া পর্যন্ত চালিয়ে যান। মুখোশধারীদের এ রাজত্ব কতকাল অব্যাহত থাকবে, কে জানে!
সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্নেষক