তথ্যপ্রযুক্তির ইন্টারনেট জনপ্রিয় ও সহজলভ্য হয়ে ওঠায় আমাদের দেশেও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা ইন্টারনেটভিত্তিক ই-কমার্সের ব্যবসার পরিধি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। মূল্য পরিশোধও করা হচ্ছে অনলাইনে। এই মাধ্যম এখন মানুষের দৈনন্দিন কেনাকাটার অংশ। কভিডকালে ঝুঁকি এড়াতে অনলাইনে বাজার করায় আগ্রহ বেড়েছে। বিশ্বের সেরা ধনীর তালিকায় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন, আলিবাবা, ই-বে প্রভৃতির নাম অনেকের জানা। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি ব্যবসা শুরু করা অ্যামাজন অনলাইন ব্যবসার পথিকৃৎ। চীনে খুচরা ব্যবসার এক-পঞ্চমাংশই হয় অনলাইনে। এখন অনলাইনেই বেচাকেনা হচ্ছে কোরবানির গরু। প্রথম দিকে হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ই-বাণিজ্য করলেও এখন বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান অনলাইনে ব্যবসা করছে চুটিয়ে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেই পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ইতোপূর্বে এমএলএম ব্যবসার নামে ডেসটিনি, যুবক, ইউনিপেটুসহ হাজার রকমের প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল অর্থ আত্মসাতের কোনো সুরাহা হয়নি।

বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অংশ হিসেবে সব ক্ষেত্রে ডিজিটাইজেশন দ্রুত এগিয়ে চলেছে। সেই সুযোগ নিয়ে গড়ে উঠেছে প্রচুর ই-কমার্স বা অনলাইন ক্রয়-বিক্রয় প্রতিষ্ঠান। এই ব্যবসা শুরু করার জন্য কিছুরই প্রয়োজন নেই। একটা ওয়েবসাইট থাকলেই চলে। এর বাইরে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সদস্য হলেই আর কোনো সমস্যা থাকে না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও দেশে ই-কমার্স প্রসারে একটি প্রকল্পে ই-ক্যাবকে বিপুল অর্থ সহায়তা প্রদান করছে। এ সুযোগে বেশকিছু কুরিয়ার, ই-কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানও ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই ই-ক্যাবের সদস্য হিসেবে ব্যবসা পরিচালনা করে যাচ্ছে। মূলধারার ব্যবসা করতে হলে একটি দোকান বা পজেশন, অবকাঠামো, ট্রেড লাইসেন্স, মূলধনসহ অনেক কিছুর প্রয়োজন হয়। এ কারণে যত্রতত্র বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের গৃহিণী, বেকার যুবকরাও এখন এই অনলাইন ব্যবসায় নেমে পড়েছেন। নানা প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার তথ্য পত্রপত্রিকার উঠে আসছে। কিন্তু সুষ্ঠু নজরদারি ও বিদ্যমান নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান ই-কমার্স বা অনলাইন শপিং ব্যবসার নামে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করছে। তারা লাখ লাখ গ্রাহকের শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, সেই অর্থ বিদেশে আবার পাচারও করেছে এবং নিজেরাও বিদেশে পালিয়ে যাচ্ছে। বিপদে পড়ছেন তাদের সঙ্গে বিনিয়োগ করতে আসা শত শত তরুণ উদ্যোক্তা। কোনো কোনো তরুণ উদ্যোক্তা ৮০-৯০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করে এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন।

তবে আশার কথা, সরকার এগুলো বন্ধে নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় প্রচুর মানুষ ঘরে বসেই নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য কিনছেন। কিন্তু ভয় সৃষ্টি করছে এমন কিছু প্রতারক প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাৎ, পণ্য সরবরাহে বিলম্ব, বিদেশে টাকা পাচারসহ নানা ধরনের অপকর্মের অভিযোগ উঠছে। ইভ্যালি ও ই-অরেঞ্জ নামের প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধেও রয়েছে এমন অনেক অভিযোগ। এরই মধ্যে এ রকম আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠানগুলো চটকদার কিছু অফার দিয়ে গ্রাহকদের ফাঁদে ফেলার তথ্য পেয়েছে। এরপর গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে পণ্য সরবরাহে গড়িমসি করছে। আবার কেউ কেউ ই-কমার্সের নামে নিষিদ্ধ এমএলএম ব্যবসাও চালিয়ে যাচ্ছে। দেশে পুরো অনলাইন প্ল্যাটফর্মজুড়ে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। এর মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আবার ইভ্যালিকে আরও দুই মাসের সময় দিয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে ধীরগতির ফল ভালো হবে কি?

অনলাইনে প্রতারণা ঠেকাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত নীতিমালায় প্রতারণার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। কিন্তু এখন দেখার পালা এই নীতিমালা কীভাবে প্রয়োগ হবে। এককভাবে লজিস্টিক ও লোকবলহীন ভোক্তা অধিদপ্তরের ওপর দায়িত্ব দিয়ে এ সমস্যার উত্তরণ সম্ভব নয়। অসাধু ও প্রতারক ব্যবসায়ীদের কূটকৌশল বন্ধে ভোক্তা পর্যায়ে সচেতনতার পাশাপাশি তাদের শিক্ষিত ও সচেতন করা প্রয়োজন। তারা যদি অতিলাভের প্রলোভনে বারবার পা দেন, তাহলে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে এ ধরনের প্রতারণা রোধ করা কঠিন। তবে কোনো গ্রাহকই যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হোন, এ বিষয়ে গ্রাহক সুরক্ষার উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে। নতুনভাবে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান যাতে গজিয়ে না উঠতে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা সরকারকেই নিতে হবে।

শুরুতে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের জন্য কোনো নীতিমালাই ছিল না। এখন নীতিমালা হলেও তার যথাযথ মনিটরিংয়ের অভাব রয়েছে। সেই সুযোগই নিচ্ছে প্রতারকরা। এ খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতারক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে এবং গ্রাহক ও উদ্যোক্তাদের রক্ষা করতে হবে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম নিয়ে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তার লাগাম টানতেই হবে। গ্রাহকরা যেন কোনোভাবেই প্রতারিত না হন তার যথাযথ সুরক্ষা দিতে হবে। একই সঙ্গে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবসায়ীদের যেসব প্ল্যাটফর্ম রয়েছে, বিশেষ করে ই-ক্যাবসহ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকেও এমন প্রতারণামূলক ঘটনার দায় নিতে হবে। কারণ, তারা এসব প্রতিষ্ঠানকে সদস্যপদ দেবে, আর তাদের অনিয়মের দায় নেবে না তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তারা যদি অভ্যন্তরীণ সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারে তাহলে পুরো অনলাইন ব্যবসা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি লাখ লাখ গ্রাহক প্রতারিত ও ভোগান্তির শিকার হবেন, এমনটি কাম্য নয়।

ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)
cabbd.nazer@gmail.com