জাতের মেয়ে কালোও ভালো, নদীর জল ঘোলাও ভালো- বাঙালি জীবনে এ নদীপ্রেম চলমান। পরীক্ষিত বিশ্বাসে উভয় উভয়ের। মানব হূৎপিণ্ডের মতোই চলতে থাকা নদী জালের মতো ছড়িয়ে আছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। একটা নদী পাড়ি দিয়ে এসে দেখা যায় আরেক নদীর পাড়। আবার এই নদী পাড়ি দিলে নতুন আরেক নদী। নদীর কোনো শেষ নেই। নানান কিংবদন্তি, উপকথা, লোকশ্রুতি নিয়ে নদী বয়ে চলেছে। তার এ বয়ে চলা আপন মনে, পছন্দের পথে। নিজের মতো তৈরি করে নেয় পথ। নদীর পাশেই গড়ে ওঠে জনপদ, বাণিজ্যকেন্দ্র, জীবন-জীবিকার সহায়ক অনেক কিছু। মানুষ নৌপথ ব্যবহার করে জানা-অজানা পথে ঘুরছে, পণ্য পরিবহন করছে, মাছ ধরছে, কৃষিতে সেচ দিচ্ছে, সাঁতার কাটছে; প্রাত্যহিক কাজে ব্যবহার করছে। এক নদী কত রূপে আমাদের সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে! এতে নদী আজ ভোগের সামগ্রীতে পরিণত হয়েছে। অথচ মানুষ ভুলেই গিয়েছে শুধু ভোগ করলেই হয় না; নদীকে রক্ষাও করতে হয়। সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নদীকে ব্যবহারের রূপ পরিবর্তনের পাশাপাশি নদী ধ্বংসের কার্যক্রমও সমানতালে এগিয়ে গেছে। নদীর সোনালি দিনের নির্বিষ ব্যবহার এখন আর নেই। মানুষের ব্যবহারে নদী এখন খালে; খাল থেকে নালায় রূপ নিচ্ছে। নদীর সোনালি দিন ফিরিয়ে দিতে দেশব্যাপী আন্দোলন-সংগ্রাম হলেও তার আদি রূপে ফেরা খুব কঠিন। মানবকল্যাণে সেই কঠিন কাজটাই এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

আমি তখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। গ্রীষ্ফ্মের ছুটিতে খালার বাড়ি বেড়াতে গিয়েছি। ইছামতী নদীর ধারে বর্ধিষ্ণু গ্রাম। জীবনের প্রথম খুব কাছ থেকে নদী দেখা; হাত দিয়ে নদীর পানির পরশ নেওয়া; রাতে বিছানায় শুয়ে নদীর গর্জন শোনা; নৌকায় নদী পার হওয়া। সকালে-বিকেলে নদীর পাড়ে ঘুরে বেড়ানো; জেলেদের মাছ ধরা দেখা; ডোঙা দিয়ে জমিতে সেচ দেওয়া; পণ্য নিয়ে নৌকার চলাচল; বকের আনাগোনা আর মাছের আশায় জলের ধারে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা। সবকিছুর ওপরে নদীর বিশাল জলরাশির একটা ভয়। এখনও সেই ভয় কেটে গেছে, এমন কথা বলার সাহস নেই। তবে এখন বুঝতে পারি, নদীর এই জলরাশিই সম্পদ। এ সম্পদ মানবকল্যাণে উৎসর্গিত। এমনকি এ সম্পদ বন্যার নামে যখন মানুষের সহায়-সম্বল ভাসিয়ে নিয়ে যায়, অনেককে নিঃস্ব করে দেয়, তার পরও যা কিছু রক্ষা পায় তার জন্য নদী যে পলি বিছিয়ে রাখে, তাতে মানুষ উপকৃত হয়। গোলাভরা ফসল কৃষকের মুখে হাসি ফোটায়, বন্যার ক্ষয়ক্ষতির কথা ভুলিয়ে দেয়। নদীর এই কল্যাণকর রূপই মানুষকে নদীকেন্দ্রিক জনপদ গড়ে তুলতে, সভ্যতার বিকাশ ঘটাতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী এটাই সত্য।

বিশ্বের প্রতিটি সভ্যতা, প্রতিটি নগর নদীকেন্দ্রিক। নদী হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সভ্যতা আর নগরও হারিয়ে গেছে। সাধারণ মানুষ আর হারিয়ে যেতে চায় না। তাই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফেরত পেতে বিশ্বব্যাপী প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে নদীর সোনালি অতীত দেখতে চায়।

বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে নদী ব্যবহারে পরিবর্তন এসেছে। ধীরগতির মানুষচালিত নৌকার বদলে দ্রুতগতিসম্পন্ন ইঞ্জিনচালিত নৌযান এসেছে। এসব নৌযানের যাতায়াতের ফলে সৃষ্ট শব্দদূষণে জীববৈচিত্র্যে প্রভাব পড়ছে এবং জ্বালানি পড়ে নদীর পানি দূষণ হচ্ছে। আপাত কল্যাণের চিন্তায় নদী ব্যবস্থাপনা বেড়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে, সেচ সুবিধা বৃদ্ধির নামে বাঁধ দিয়ে, বিভিন্ন গেট নির্মাণ করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বেঁধে ফেলা হয়েছে। যমুনা নদীর পশ্চিম পাড়ে গাইবান্ধা থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ১০৮ কিলোমিটার লম্বা বালুর বাঁধ দিয়ে ৮টি নদীর মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ৭৫০০ কিউসেক বাড়লে কী হবে, সে চিন্তা থেকে নদীর মুখে ২৫০০ কিউসেকের গেট নির্মাণ করা হয়েছে, যেটা আবার প্রয়োজনের সময় পুরোটা খোলাই যায় না। প্রতি ইঞ্চি জমি আবাদ করার স্লোগানের বাস্তব রূপ দিতে জনগণকে যশোর-খুলনায় স্থায়ী জলাবদ্ধতা উপহার দেওয়া হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে নদীকে আড়াআড়িভাবে অতিক্রম করে। আমাদের দেশে উত্তর-দক্ষিণ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে সমস্যা হতো না। কিন্তু পূর্ব-পশ্চিম যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য যে সংখ্যক ব্রিজ-কালভার্টের প্রয়োজন ছিল, তা না করায় নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তার ওপর নদীর পানিপ্রবাহ ঠিক রাখতে যা প্রয়োজন তাও রক্ষা করা হয়নি। ভৈরব সংস্কারের সময় দেখা গেছে ৫-৭ কিলোমিটারের মধ্যে অবিবেচনাপ্রসূত ১২০ ফুটের ব্রিজ থেকে ২০ ফুটের কালভার্ট পর্যন্ত তৈরি করা হয়েছে। বর্তমান সময়ে নদী সংস্কারের নামে শত শত কোটি টাকার প্রকল্প যথার্থ নদীর সোনালি অতীতকে ফেরত পাওয়ার জন্য হচ্ছে বলে সাধারণ মানুষ মনে করে না। সমন্বিত পরিকল্পনা করে পানির নিশ্চয়তা প্রাপ্তির পর সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা জরুরি।

বাংলাদেশের প্রকৃতি ও পরিবেশ হাজার হাজার বছর ধরে পানিনির্ভর। উজানের দেশের আন্তঃদেশীয় নদীর একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে আজ আমাদের নদীগুলো সম্পূর্ণরূপে বিপন্ন। গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণ করে নদীর পানিপ্রবাহের একটা বড় অংশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। তিস্তা নদীতে গজলডোবায় ব্যারাজ নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার করা হয়েছে। এভাবে বড় নদীর পাশাপাশি ছোট নদীগুলোও পানি প্রত্যাহারের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। আত্রাই, পুনর্ভবা, বরাক, খোয়াই, মনু, গোমতী, ভৈরব, বেতনা, কোদলা ইত্যাদি নদীর ক্ষেত্রে উজানে পানি কাঠামো নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার করা এবং নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। আন্তঃদেশীয় নদী হিসেবে পানি প্রাপ্তির কোনো সুরাহা এখনও হয়নি। যৌথ নদী কমিশনের নিয়মিত বৈঠক হলেও অগ্রগতি সাধারণ মানুষ জানে না। নোম্যান্স ল্যান্ডে অ্যাকুইডাক্ট বা কৃত্রিম পানি প্রণালি তৈরি করে মহানন্দা নদীর পানি প্রত্যাহার করা হয়েছে। যার ফলে বাংলাদেশ অংশের কাজ হয়েছে পাথর কুড়ানো এবং তা করতে গিয়ে গুলি খেয়ে মরার ফাঁদ। ১৯৯৬ সালে ৩০ বছরের জন্য গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি হলেও চুক্তি মোতাবেক পানিপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে- সে সুসংবাদ এখনও নেই। দশকের পর দশক ধরে তিস্তা নদীর পানি বণ্টনের আলোচনা সাধারণ মানুষ দেখছে। ফারাক্কা ব্যারাজের বিকল্প হিসেবে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ যুগের পর যুগ পড়ে আছে। ফলে প্রমত্ত পদ্মার সঙ্গে সঙ্গে তার শাখা-প্রশাখারও নদী-রূপ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এখন আন্তঃদেশীয় নদীর পানিপ্রাপ্তির একমাত্র নিশ্চয়তা বর্ষা মৌসুমের অতিরিক্ত পানি, যা দেশের একটা বড় অংশকে বন্যার নামে ভাসিয়ে দেয়। একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে পলি পড়ে নদী ভরাট হয়ে ধারণক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করেও নদীর প্রবাহে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে জনকল্যাণের আস্ম্ফালনে ব্যক্তিস্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্প প্রণীত হয়ে থাকে। ব্যক্তিস্বার্থের প্রকল্প যে জনকল্যাণে ভূমিকা রাখে না- তার শত-সহস্র উদাহরণ থাকার পরও সংশ্নিষ্টদের ঘুম ভাঙে না। উজানে একের পর এক নদীতে পানি কাঠামো তৈরি করে একতরফা পানি প্রত্যাহারের পরও সচেতনতার সঙ্গে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি। দেশে সেচের জন্য বেশ কয়েকটা ব্যারাজ নির্মাণ করা হয়েছে। তিস্তা নদীর উজানে আশির দশকে গজলডোবায় ব্যারাজ নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার করার পরও পানির নিশ্চয়তা না করেই তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণ করা হয়েছে। এই ব্যারাজ নির্মাণ করা হয় সীমান্তের চার কিলোমিটার দূরত্বে। পানিপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা থাকলেও ব্যারাজের অবস্থান বিবেচনায় আমাদের চাইতে উজানের দেশ বেশি লাভবান হতে বাধ্য। তার চাইতে বড় কথা, দেশের কোনো সেচ প্রকল্পই লক্ষ্যমাত্রার ধারে-কাছে পৌঁছাতে পারেনি। জিকে সেচ প্রকল্প, মনু-ধনাগদা প্রকল্প, তিস্তা সেচ প্রকল্প- সবার ইতিহাস একই। এ ছাড়া মৃতপ্রায় নদীকে বাঁচানো, নৌ চলাচল, সেচ সুবিধা বৃদ্ধির জন্য অনেক খাল কাটা হয়। এসব খালের সিংহভাগ নদী রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়নি।

দেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রকল্প গ্রহণ ও তা আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করে নদীর সোনালি দিন ফিরিয়ে দেওয়া দেশ ও জাতির স্বার্থে জরুরি। প্রকৃতি প্রদত্ত নদীর পানি প্রত্যাহার, পানি দূষণ; পানি কাঠামো ও ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ, ইচ্ছামতো ব্যবহার করায় যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে উদ্ধার করে নদীর সোনালি অতীত ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব কিনা জানি না। তবে বর্তমান পরিস্থিতি-পরিবেশ থেকে উদ্ধার জরুরি।

প্রাবন্ধিক; সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)
khairulumam1950@gmail.com