পল্টু বাজারে গিয়ে বেশ দাম দিয়ে সবচেয়ে বড় এবং তাজা ইলিশ মাছটা কিনল। স্ত্রীর রান্না করা মাছটা খেয়ে বলল, বাংলাদেশের মাছের মতো মাছ আর হয় না। সামনে স্ত্রী না থাকলে পল্টু কি তখন একই কথা বলত? এই মতামত তথ্যগতভাবে পক্ষপাতদুষ্ট। মাছটা কি রান্নাশৈলীর জন্য সুস্বাদু হয়েছে, না প্রকৃতই মাছটা সুস্বাদু? যারা মাছটা আগে খায়নি, তারা তর্ক করতে পারে। এমনও হতে পারে, সুস্বাদু মাছ রান্নার গুণে আরও সুস্বাদু হয়েছে। এখানে দুটি বৈশিষ্ট্যের ফলের মিশ্রণ হয়েছে। রোগতাত্ত্বিক ভাষায় রান্নার শৈলী এখানে কনফাউন্ডিং ফ্যাক্টর।

কিন্তু 'ইলিশ মাছ' খেয়ে কি এ কথা বলা ঠিক- বাংলাদেশের 'মাছের' তুলনা হয় না? বাংলাদেশের মাছ তুলনাহীন- এ কথাটা বলতে গেলে মাছের বাজারে ঢোকার আগে চোখ বন্ধ করে বাজারে যে মাছটা আগে পাবে সেটা কিনে নেওয়া, অথবা আগে থেকে ঠিক করে নেওয়া। মাছের বাজারের পাঁচ বা অন্য কোনো ক্রমিকের দোকান থেকে সে যে মাছ আগে পাবে অথবা বাজারে ঢোকার আগেই গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যে কোনো নির্দিষ্ট ক্রম অনুযায়ী মাছ কিনবে। একবার এটা, একবার সেটা ইত্যাদি করা যাবে না। অন্যথায় নমুনা নির্বাচন হবে পক্ষপাতদুষ্ট। এর পরও একটা সমস্যা থেকে যায়। আবার বাংলাদেশের বাজারে পাওয়া মাছ তুলনাহীন- এ কথা বলতে গেলে আমার পছন্দ বা সুবিধামতো বাজারে গেলে কি চলবে? যে বাজারে ভালো মানের মাছ কেনার খরিদ্দার বেশি, সে বাজারে ভালো মানের মাছ বেশি পাওয়া যাবে। সুতরাং বাজারও বাছাই করতে হবে দৈবচয়নের মাধ্যমে।

কথা হলো, তুলনা না করে তো তুলনাহীন শব্দটা ব্যবহার করা যাবে না। প্রশ্ন হলো, তুলনা করব কীভাবে? সে জন্য লটারি করে একটা দেশের একটা মাছ বাজার চিহ্নিত করতে হবে। সে বাজারে একই ধরনের মাছ পাওয়া গেলে ভালো। না পাওয়া গেলেও অসুবিধা নেই। হাজার হোক, বাজারটা তো লটারি করে নির্বাচন করা হয়েছে এবং তুলনা হচ্ছে মাছের; বিশেষ কোনো মাছের নয়। তবে সেই বাজার থেকেও একইভাবে মাছ সংগ্রহ করতে হবে।

একইভাবে হাসপাতালে পাওয়া রোগীর ওপর ভিত্তি করে বা কোনো পরীক্ষাগারের তথ্য থেকেও এটা বলা নির্ভুল হবে না- বাংলাদেশের রোগীদের মধ্যে অমুক অমুক বৈশিষ্ট্য বেশি। হাসপাতাল বা পরীক্ষাগার সংশ্নিষ্ট তথ্য শুধু পরীক্ষাগার বা হাসপাতালের বেলায়ই প্রযোজ্য। যেহেতু হাসপাতালে ভর্তির সম্ভাবনা সবার জন্য আর্থসামাজিক, ভৌগোলিক বা অন্যান্য কারণে সমান নয়; তাই যুক্তিগত কারণেই হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্য সবার বেলায় প্রয়োগ করা যাবে না। অর্থাৎ যে তথ্য হাসপাতালভিত্তিক বা দৈবনির্বাচনভিত্তিক নয়, সে তথ্যের বাহ্যিক ন্যায্যতা নেই। গবেষণায় নমুনার সংখ্যা কীসের ভিত্তিতে নির্ধারিত হলো, নমুনা কীভাবে এবং কোথা থেকে তালিকাভুক্ত হলো এবং তথ্য কীভাবে সংগৃহীত হলো, এসব পদ্ধতি তথ্যের নির্ভুলতার মূল নিয়ামক।
গবেষণার একটা নীতি হলো, জরিপকারী ধরে নেন, দৈব কারণে পরিমাপের ভুল বেশি হলেও ৫ শতাংশের কম হবে। তার পরও ৯৫ শতাংশ নিশ্চয়তা থাকবে যে, পরিমাপ সঠিক এবং এসব ক্ষেত্রে এ ধরনের আগে করা জরিপের ফল জানা না থাকলে নমুনার সংখ্যা হবে কমপক্ষে ৪৮৪।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের করা জরিপ একটা বর্ণনাকারী (ডেসক্রিপটিভ) গবেষণা। যেহেতু নমুনা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক, তাই জরিপের ফল শুধু ওই প্রতিষ্ঠানের বেলায় প্রযোজ্য। যেহেতু রোগীর সেবা করার কারণে নমুনা প্রদানকারীদের মধ্যে কভিড-১৯-এর নীরব সংক্রমণ ঘটার আশঙ্কা ছিল, তাই টিকা নেওয়ার আগে তাদের মধ্যে অ্যান্টিবডি ছিল কিনা, দেখলে ভালো হতো। তদুপরি, আইইডিসিআর ২৩ শতাংশ টিকাপ্রাপ্তের মধ্যে সংক্রমণ পেয়েছে, অথচ বিএসএমএমইউ ৯৮ শতাংশ টিকাপ্রাপ্তের মধ্যে খুঁজে পেয়েছে অতি উচ্চ পরিমাণে অ্যান্টিবডি। তবে জানা থাকা প্রয়োজন, সব অ্যান্টিবডিই সংক্রমণ প্রতিরোধক নয়। বিএসএমএমইউর নমুনা ছিল ২০৯টি। এটি একটি উপপ্রমেয় সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট নয়, তবে প্রাপ্ত তথ্য ভবিষ্যতে উপপ্রমেয় পরীক্ষার কাজে লাগবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের প্রভিন্স টাউন কাউন্টিতে ৩ জুলাই লাখে একজন কভিড-১৯ রোগীও ছিল না সেখানে। ২৬ জুলাই ৪৬৯ জন রোগী পাওয়া গেল, যার ৭৪ শতাংশেরই ফাইজার-বায়োএনটেক, মডার্না বা জনসনের পরিপূর্ণ টিকা নেওয়া ছিল। তাদের ৮০ শতাংশের মধ্যে রোগের উপসর্গ দেখা গিয়েছিল। তবে মাত্র চারজনকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল এবং কেউই অবশ্য মারা যায়নি। টিকাপ্রাপ্তদের মধ্যে ভাইরাসের পরিমাণ অ-টিকাপ্রাপ্তদের সমানই ছিল।

আইইডিসিআর সম্প্রতি যে জরিপ করেছে সেটিতে কোন দৈবচয়ন ব্যবহার করেছে, না জানলে জরিপের নির্ভুলতা সম্পর্কে মতামত দেওয়া ঠিক হবে না। দৈবচয়নের যে পাঁচটি ধরন আছে তার সব ক'টির দৈবত্ব (র‌্যান্ডমনেস) সমান নয়। আইইডিসিআর ২৩ শতাংশ টিকাগ্রহীতার মধ্যে সংক্রমণ পেয়েছে। প্রণিধানযোগ্য, আইইডিসিআর অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকার কার্যকারিতা বিশ্নেষণ করেছে, যার কার্যকারিতা যুক্তরাষ্ট্রের টিকার চেয়ে কম। হতে পারে, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে টিকা ভালো কাজ করে। আবার হতে পারে, যারা জরিপে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, তাদের মধ্যে অনেকের টিকা নেওয়ার আগেই প্রতিরোধ শক্তি তৈরি হয়েছিল। আইইডিসিআর ৪৩৫টি নমুনা সম্পর্কে কোনো বক্তব্য দেয়নি। যারা টিকা নেয়নি এবং যাদের মধ্যে কভিড-১৯ ভয়াবহ উপসর্গ তৈরি করেনি, তারা যদি এমন হয়, তাহলে যারা টিকা নেয়নি তাদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া, মৃত্যু বা শ্বাসকষ্টের হার কমে যাবে; বিভাজক বড় সে কারণে। ইচ্ছাকৃতভাবে এই ৪৩৫ নমুনা বাদ দেওয়া হলে জরিপের ফলাফল সঠিকত্ব হারাবে। আইইডিসিআরের জরিপের দুর্বল দিক হলো, ৩০৭ জন টিকাপ্রাপ্তের সঙ্গে ৫৯৮ জন, যারা টিকা নেয়নি, তাদের তুলনা করা। এতে তুলনার সংবেদনশীলতা নষ্ট হয়। রোগতাত্ত্বিক নীতি হলো, সমানের সঙ্গে সমানের তুলনা। কারণ, ৫৯৮ জনের মধ্যে দৈবচয়নের কার্যকারিতা ৩০৭ জনের প্রায় দ্বিগুণ।

আইইডিসিআর যেহেতু টিকাপ্রাপ্ত এবং টিকা না নেওয়াদের মধ্যে তুলনা করেছে, সেহেতু এটি একটি বিশ্নেষণাত্মক (অ্যানালিটিক) গবেষণা। যেহেতু প্রথমে রোগীদের চিহ্নিত করে, তারপর তাদের মধ্যে কারা টিকাপ্রাপ্ত এবং কারা নয় তার তথ্য নিয়েছে, তাই এটি পশ্চাৎমুখী (রেট্রোস্পেকটিভ) গবেষণা। বিশ্নেষণাত্মক গবেষণা করা হয় কোনো উপপ্রমেয় তৈরি বা প্রমাণের জন্য। যেমন, 'টিকা কভিড-১৯-এর উপসর্গ হ্রাস করে'। বিশ্নেষণাত্মক গবেষণায় নমুনার সংখ্যা নির্ধারণে দুটি অতিরিক্ত শর্ত পূরণ করা হয়- ১. টিকাপ্রাপ্ত ও টিকা নেয়নি তাদের মধ্যে যদি ফলাফলে প্রকৃত কোনো পার্থক্য না থাকে, তাহলে জরিপ করে যাতে পার্থক্য না পাওয়া যায় এবং ২. পার্থক্য থাকলে যাতে তা পাওয়া যায়। আইইডিসিআর কি তাদের নমুনার সংখ্যা এর আলোকে করেছে?

রোগতত্ত্ববিদ, বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের কার্যকরী দলের সদস্য, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ কার্যকরী দলের আহ্বায়ক, সোশ্যাল সেক্টর ম্যানেজমেন্ট ফাউন্ডেশনের অবৈতনিক নির্বাহী প্রধান