এ কথা এখন আর অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই- তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতার মসনদে দ্বিতীয়বারের মতো আসীন হয়েছে। তাদের এই পুনরুত্থানের কারণ খুঁজতে গিয়ে অনেকেই বলছেন, আমেরিকানদের ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই এমনটি ঘটেছে। কেউ কেউ আবার এর মাঝে ষড়যন্ত্রের গন্ধও খুঁজে পাবেন। তারা বলবেন, চীন-রাশিয়ার চালে হেরে গেছে আমেরিকা। এ নিয়ে প্রত্যেকেরই যুক্তি আছে এবং থাকবে। হয়তো আরও অনেক দিন এ নিয়ে লেখালেখি হবে। বাস্তবতা এটাই, তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় এসেছে। প্রশ্ন হলো- তালেবানের এই প্রত্যাবর্তন অন্যান্য দেশের জন্য, বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা প্রেরণ করছে? আমরাইবা এ থেকে কী শিক্ষা নিতে পারি?

প্রথমেই যে কথাটা মাথায় আসছে তা হলো, তালেবানের পুনরুত্থান এ কথা প্রমাণ করেছে- ভৌত উন্নয়নের সঙ্গে যদি সামাজিক উন্নয়নের সংমিশ্রণ না ঘটে, তা হলে সে উন্নয়ন দেশের কোনো কাজে লাগে না। বরং অগণতান্ত্রিক শক্তির ক্ষমতা দখলের পথকে প্রশস্ত করে দেয়। প্রায় দেড় যুগ আগে যখন আফগানিস্তানের মাটিতে পা রেখেছিলাম, তখন দেশটির দুরবস্থা দেখে খুবই খারাপ লেগেছিল। কৈশোর-যৌবনে বই-পুস্তকে পড়া কাবুলের সঙ্গে মেলাতে গিয়ে বারবার শুধু হোঁচট খেয়েছি। কাবুল বিমানবন্দরকে মনে হয়েছিল একটা পরিত্যক্ত বাসস্ট্যান্ড। জালালাবাদ রোডে অবস্থিত জাতিসংঘ কম্পাউন্ড থেকে শহরের কেন্দ্রে আসতে সে কী অবস্থা! অত্যাধুনিক গাড়িতে বসেও কোমরে ব্যথা হয়ে যেত। তারপর যখন মাজার-ই-শরিফে গেলাম সেখানেও দেখি একই অবস্থা। আর আজ? কাবুল এয়ারপোর্ট আজ সত্যি এক আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টের রূপ ধারণ করেছে। শহরজুড়ে ঝকঝকে রাস্তা। মোড়ে মোড়ে স্কয়ার আর মল। আব্দুল হক স্কয়ার, মাসুদ স্কয়ার, এমন আরও কত কী! এসব আধুনিক মল আর স্কয়ারের ঝলকানিতে আজকের কাবুল শহরকে ২০ বছর আগের প্রিজম দিয়ে দেখলে চেনার কোনো উপায় নেই। মাজার-ই-শরিফকেও চেনা যায় না।

কাবুল-মাজার হাইওয়ে ধরে বালখ শহরে ঢুকতে প্রথমেই চোখে পড়বে এক সুরম্য উদ্যান। দৃষ্টিনন্দন এ উদ্যানে যে কারও চোখ আটকে যেতে বাধ্য। জালালাবাদ, হেরাতসহ সব বড় শহরেরই একই অবস্থা-উন্নয়ন আর আলোর ঝলকানি। উদ্যান, তোরণ, মল, মনোরম আবাসিক কমপ্লেক্স, এমন আরও কত কী! কিন্তু গত দুই দশকে দেশটিতে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মনোজগতের পরিবর্তন ঘটানোর তেমন কোনো প্রয়াসই লক্ষ্য করা যায়নি। বরং শহরকেন্দ্রিক একমুখী উন্নয়নের ফলে সামাজিক বৈষম্য বেড়েছে আগের চেয়ে অনেক বেশি।

কাবুল, মাজার কিংবা হেরাতে ছেলেমেয়েরা যখন ডলারের মূল্যে ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়াশোনা করছে, গ্রামগুলোয় তখন বাতি নেই। নেই শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা। দুর্নীতি সর্বত্র। পরিস্থিতিটা এমনই দাঁড়িয়েছিল যে, পরিচ্ছন্ন ইমেজের ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও আশরাফ গনির কিছুই করার ছিল না। তালেবান এ সুযোগটাই নিয়েছে। শহুরে আধুনিক চিন্তাধারার বিপরীতে মধ্যযুগীয় চিন্তা দিয়ে দখল করে নিয়েছে জনগোষ্ঠীর মনোজগৎ। এ কারণে তালেবান যখন তাদের আক্রমণ শুরু করে, আফগান প্রশাসন তখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। কারণ জনবিচ্ছিন্ন দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন বাইরের আঘাতকে প্রতিহত করার শক্তি রাখে না। বলাবাহুল্য, দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে গনি প্রশাসন সাধারণ মানুষের কোনো সমর্থনই পায়নি। জনগণ কেবল সেই পলাশী যুদ্ধের মতো দূর থেকে সরকারি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্য অবলোকন করেছে। অতঃপর বগলে রুটি নিয়ে চিবুতে চিবুতে ঘরে ফিরে গেছে। আর তালেবান যোদ্ধারা সদর্পে হেঁটে গেছে শহরের পথ ধরে। এই হলো বাস্তবতা।

বাংলাদেশেও আজ যে উন্নয়নের জোয়ার বইছে, তা জনগণের মনোজগৎকে কতটুকু ছুঁতে পারছে, সেটা সরকারের চিন্তা করে দেখা উচিত। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই- প্রায় দেড় দশক ধরে দেশে ভৌত উন্নয়নের এক মহাযজ্ঞ চলছে। কিন্তু এর সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন কতটুকু ঘটছে, তা ভাবনার দাবি রাখে বৈকি! দীর্ঘদিন ধরেই দেশে বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রাণ জারি-সারি, বাউল গানসহ অন্যান্য দেশজ ও গণমুখী সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা বলবৎ আছে। অন্যদিকে উন্নয়নের পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে দুর্নীতি; স্টম্ফীত হচ্ছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। হাসপাতাল থেকে কয়লার খনি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পশুর হাট, সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতির মহোৎসব। মানুষ এখন আর কাউকেই বিশ্বাস করে না। বহুমুখী শিক্ষার কবলে পড়ে গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থা প্রায় ধসে পড়ার উপক্রম। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, ২০১৫ থেকে ২০১৮ সময়কালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় ছাত্রছাত্রী কমেছে ১৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ। অন্যদিকে এবতেদায়ি মাদ্রাসায় এ সংখ্যা বেড়েছে ১৪ দশমিক ৪২ শতাংশ। এ ছাড়া গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে ছাত্রদের অনেকেরই রয়েছে দ্বৈত ছাত্রত্ব। উপবৃত্তির টাকা পাওয়ার জন্য তারা স্কুলের খাতায় নাম রাখে, পাশাপাশি মাদ্রাসায়ও পড়ে। বাংলাদেশের যে কোনো গ্রামে গেলেই এর সত্যতা খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু ভোটের রাজনীতির হিসাবনিকাশ করে ক্ষমতাসীন দলসহ বড় রাজনৈতিক দলগুলো এ অবস্থা মেনে নিয়ে পরিস্থিতিকে নিজেদের অনুকূলে আনার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এই সুযোগে লাভবান হচ্ছে কট্টর মৌলবাদী গোষ্ঠী। গত প্রায় তিন দশকের বাংলাদেশের এই হলো বাস্তবতা।

আরও একটা বিষয় এ প্রসঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। তা হলো, গত ২০ বছরে আফগানিস্তানে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক দলকে রাজনীতির স্পেস দেওয়া হয়নি। পার্লামেন্টের প্রায় সব সদস্যই ছিলেন অরাজনৈতিক যুদ্ধপতি ও ব্যবসায়ী। অথচ তালেবান সমস্যা হলো একটি রাজনৈতিক বিষয়। রাজনৈতিক বিষয়কে রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করতে হয়। কিন্তু তা ঘটেনি। শক্তি দিয়ে তা দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। বাংলাদেশেও অনেক বিষয় আছে, যা রাজনৈতিক বিবেচনার দাবি রাখে। কিন্তু রাজনৈতিক শক্তিকে বাইরে রেখে তা প্রশাসনিকভাবে মোকাবিলা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে সংকুচিত হয়ে আসছে রাজনীতির স্পেস। এ অবস্থা চলতে থাকলে অগণতান্ত্রিক শক্তি যে সুযোগ গ্রহণ করতে চাইবে, তা বলাই বাহুল্য।

মনে রাখতে হবে- গণতন্ত্র বিকাশের সুস্থ পরিবেশ সৃষ্টি করে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের মাধ্যমেই কেবল মৌলবাদের উত্থান ঠেকানো সম্ভব; অন্যথায় নয়।

সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা, আফগানিস্তান