যদি বলি, আফগানিস্তানের ক্ষমতার অলিন্দ বঙ্গীয় ব-দ্বীপের নদীর মতোই সদা পরিবর্তনশীল- অত্যুক্তি হবে না। কখন কোন পক্ষ ক্ষমতায় আসছে বা ক্ষমতা থেকে যাচ্ছে, মুহূর্ত আগেও যেন বোঝা কঠিন। সর্বশেষ মাত্র তিন সপ্তাহে আফগানিস্তানে যে রাজনৈতিক ও সামরিক পরিবর্তন ঘটেছে, সেটাকে 'নাটকীয়' বললেও কম বলা হয়।
আগস্টের প্রথম সপ্তাহে দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে তালেবান আগ্রাসনের মুখে আফগান সামরিক বাহিনীর প্রতিরোধ যখন বিবিসির ভাষায় 'তাসের ঘরের মতো' ভেঙে পড়ছিল, তখনও যেন 'আশাবাদী' ছিল মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদপত্র 'ওয়াশিংটন পোস্ট' মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার উদ্ৃব্দতি দিয়ে আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহেও জানিয়েছিল, কাবুল অবরুদ্ধ হতে আরও অন্তত ৩০ দিন সময় লাগবে। আর পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে তালেবানের হাতে পতন হতে পারে আশরাফ ঘানির নেতৃত্বাধীন সরকারের। বাস্তবে তার তিন দিনের মাথায়ই কাবুলের পতন হয়েছিল এবং আশরাফ ঘানি 'ক্ষমতা' ত্যাগের ঘোষণা দিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন। সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের মুহুর্মুহু 'আপডেট' যুগে নদীপ্রবাহের মতো পরিবর্তিত পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সবারই জানা।
স্বীকার করতে হবে, আফগানিস্তান নামটি শুনলেই বাঙালি পাঠকের চোখের সামনে নদী নয়; নদীহীন রুক্ষ পাহাড় ও প্রান্তর ভরা এক ভূখণ্ডের ছবি ভেসে ওঠে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'কাবুলিওয়ালা' রহমতের চোখে আফগানিস্তানকে দেখেছিলেন এভাবে- 'দুই ধারে বন্ধুর দুর্গম দগ্ধ রক্তবর্ণ উচ্চ গিরিশ্রেণী, মধ্যে সংকীর্ণ মরুপথ, বোঝাই-করা উষ্ট্রের শ্রেণী চলিয়াছে; পাগড়ি-পরা বণিক ও পথিকেরা কেহ বা উটের 'পরে, কেহ বা পদব্রজে, কাহারও হাতে বর্শা, কাহারও হাতে সেকেলে চকমকি-ঠোকা বন্দুক'।
বাস্তবে আফগানিস্তানও একটি 'নদীবহুল' দেশ। নদী সেখানকার সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবনে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, রাজধানী কাবুলসহ পানশির বা হেলমান্দের মতো জনপদের নামকরণ হয়েছে নদীর নাম থেকে। দেশটিতে প্রধান নদীর সংখ্যা অর্ধশতাধিক; এর মধ্যে অন্তত ১০টি নদী রয়েছে যেগুলোর দৈর্ঘ্য ৪শ কিলোমিটারের বেশি। আড়াই হাজার কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ আমু দরিয়া, হাজার কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ হেলমান্দ কিংবা সাতশ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ কাবুল নদীর কথা আলাদাভাবে বলতে হবে। কিন্তু সেই নদী বাংলাদেশ তো বটেই, দক্ষিণ এশিয়ার আর পাঁচটি দেশের নদীর মতো নয়। প্রায় সবই যেহেতু বরফগলা নদী; বছরের বেশিরভাগ সময় সেগুলো আক্ষরিক অর্থেই প্রবাহশূন্য থাকে। আবার শীতকালে জমে বরফ হয়ে যায়। কাবুল কিংবা পানশির নদীতে যতটুকু পানি থাকে, তা মূলত গ্রীষ্ফ্মকালের।
কেবল চরিত্রের দিক থেকে নয়; উপযোগিতার দিক থেকেও আফগানিস্তানের নদীগুলো দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ নদী থেকে ভিন্ন। এ অঞ্চলে নদীভিত্তিক সেচ ব্যবস্থার যে প্রসার আমরা দেখে থাকি, এর প্রাথমিক যুগের বেশকিছু নজির আফগানিস্তানে এখনও বিদ্যমান। যেমন গজনী নদীর সেচ ব্যবস্থা সেই দশম শতাব্দীর। দেশটিতে এখনও সচল রয়েছে ২০টির বেশি ড্যাম ও জলাধার। যেমন লগর নদীতে চাকি বারদার নদীতে 'আধুনিক' ড্যাম প্রতিষ্ঠা হয়েছিল সেই ১৯৩৮ সালে; দক্ষিণ এশিয়ার বাকি ড্যামগুলোর অনেক আগে।
প্রশ্ন হতে পারে- আফগানিস্তানের ক্ষমতার খেলার সঙ্গে নদী, জলাধার বা ড্যাম ব্যবস্থার কী সম্পর্ক? বিষয়টি বুঝতে হলে আফগানিস্তানের নদীগুলোর উপযোগিতার দিকে আরও বিশেষভাবে মনোযোগ দিতে হবে। প্রচলিত যে মহাসড়ক আমরা দেখে থাকি, দেশটিতে তা কয়েক দশক আগ পর্যন্তও ছিল না। আফগানিস্তানের বিস্তৃত ও দুর্গম পবর্তশ্রেণিতে যেমন মহাসড়ক নির্মাণ কঠিন, তেমনই নেই নৌপথ ব্যবহারের সুযোগ। এ ক্ষেত্রে প্রবাহশূন্য নদীগুলোই ব্যবহূত হতো 'রাজপথ' হিসেবে। ব্রিটিশ ভ্রমণকারী ক্রিস্টোফার বেলফুর পঞ্চাশের দশকে আফগানিস্তানে গিয়ে দেখেছেন, মালবাহী ট্রাক বা যাত্রীবাহী বাস চলাচল করে প্রবাহশূন্য 'নদীপথ' ধরে। সম্প্রতি প্রকাশিত 'আফগানিস্তান :অ্যাট আ টাইম অব পিস' বইয়ে তিনি এসব আলোকচিত্র ব্যবহার করেছেন।

তার মানে, নদীপথগুলো ক্ষমতার পালাবদলের সামরিক আগ্রাসন ও প্রতিরোধে ভূমিকা রাখত। পানি-সংকটের ওই দেশে কেবল সুপেয় পানির প্রশ্নেও নদী কিংবা জলাধার দখলে রাখার কৌশলগত তাৎপর্য ছিল ব্যাপক। এ ছাড়া বহু নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক গোত্রে বিভক্ত ওই সমাজে ফসল জন্মানের সেচের প্রশ্নেও নদী ও জলাধারের ওপর আধিপত্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ। গত শতকের বিশের দশকের শেষভাগে সৈয়দ মুজতবা আলীর চোখেও পড়েছে আফগান নদীর গুরুত্ব। তিনি 'দেশে বিদেশে' গ্রন্থে লিখেছেন- 'ছলছল করে কাবুল নদী বাঁক নিয়ে এক পাশ দিয়ে চলে গিয়েছেন- ডান দিকে এক ফালি সবুজ আঁচল লুটিয়ে পড়েছে। পলি-মাটি জমে গিয়ে যেটুকু মেঠো রসের সৃষ্টি হয়েছে তারি উপরে ভুখা দেশ ফসল ফলিয়েছেন।'
বস্তুত সেই 'গ্রেট গেম' যুগ থেকেই অভ্যন্তরীণ বা বহিস্থ কিংবা বহিস্থ শক্তির অভ্যন্তরীণ প্রতিনিধি- যারাই আফগানিস্তানে ক্ষমতা সংহত করতে চেয়েছে, তারা সবার আগে নদী, জলাধার ও ড্যামগুলো বাগে আনতে চেয়েছে। যেমন আশির দশকে আফগানিস্তানে গিয়ে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন সবার আগে যে অবকাঠামো নির্মাণ করেছিল, তা হচ্ছে আমু দরিয়ার ওপর ৮শ মিটার দীর্ঘ স্টিল-কংক্রিটের সেতু। ১৯৮২ সালে নির্মিত সেই সেতু এখন 'আফগানিস্তান-উজবেকিস্তান ফ্রেন্ডশিপ' সেতু নামে পরিচিত। ওই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে এ সেতুর উপযোগিতা সর্বশেষ পরিবর্তনের সময়ও স্পষ্ট হয়েছে। একুশ শতকে এসে ভারত যখন আফগানিস্তানে ভূ-অর্থনীতির মাধ্যমে ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধিতে উদ্যোগী হয়েছিল, তাদেরও মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল নদীগুলো। ২০১৬ সালে আফগানিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি ও ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যৌথভাবে উদ্বোধন করেছিলেন সেচ ও জলবিদ্যুতের জন্য হারি নদীর ওপর নির্মিত 'আফগান-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ ড্যাম'।
বলা বাহুল্য, বহু পরিবর্তনের সাক্ষী 'কাবুল' নদীর তীরে গড়ে ওঠা শহরটি যখন তালেবান বাহিনীর পুনর্দখলে, তখন ভূ-রাজনৈতিক হিসাব নতুন করে কষতে হবে। সেখানে সামরিক শক্তি ও স্বার্থ, খনিজসম্পদ ও এর বাণিজ্য নিয়ে নতুন অঙ্কের যোগ-বিয়োগ করতে হবে। কিন্তু অপরিবর্তিত থেকে যাবে নদী, জলাধার ও ড্যামের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব। বিশেষত সেখানকার জনসাধারণের কাছে, যারা সুপেয় পানি, সেচ ও কোথাও কোথাও মৎস্যসম্পদের জন্য নদীগুলোর ওপর একান্তভাবে নির্ভরশীল।
গত দুই দশকে ইঙ্গ-মার্কিন নেতৃত্বাধীন অবকাঠামোগত 'উন্নয়ন' সত্ত্বেও কাবুলের মতো বড় শহরের বাইরে পরিস্থিতি এখনও তথৈবচ। যেমন তালেবান ও বিরোধী বাহিনীর সর্বশেষ 'যুদ্ধক্ষেত্র' পানশিরে প্রবেশের এখনও একমাত্র প্রবেশপথ যে গিরিখাত, তা আসলে পানশির 'নদীপথ' মাত্র। সৈয়দ মুজতবা আলীর আফগান সহচর ও পানশিরের বাসিন্দা আব্দুর রহমান সেই সময় বলেছিলেন, পানশির নদীর মাছ জগতের মধ্যে সবচেয়ে সুস্বাদু। যুদ্ধ শেষ হলে মৎস্যপ্রিয় বাঙালি বাবুকে তিনি পানশির নিয়ে যাবেন।
শতবর্ষ পেরিয়েও আফগানিস্তানের যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। সেখানকার নদীগুলো নিয়ে আব্দুর রহমানের মতো সাধারণ আফগানের শখ ও স্বপ্ন এখনও অপূর্ণ রয়ে গেছে।
লেখক ও গবেষক
skrokon@gmail.com