গত অর্থবছরের (২০২০-২১) সংশোধিত বাজেটের 'মাত্র' ৭৪ শতাংশের মতো খরচ হয়েছে- অর্থ মন্ত্রণালয় প্রদত্ত তথ্য বিশ্নেষণ করে বুধবার সমকালের এ-সংক্রান্ত শীর্ষ প্রতিবেদনটি যথেষ্ট বিশ্নেষণাত্মক। এতে নতুন কিছু যোগ করার খুব বেশি অবকাশ নেই। 'মাত্র' বলছি এই কারণে যে, এটা সংশোধিত বাজেটের ব্যয়; এর অর্থ প্রস্তাবিত বাজেটের ক্ষেত্রে এই হার আরও কমবে। গত পাঁচ বছর ধরেই দেখা গেছে, বাজেটের ৮৪ থেকে ৮৯ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে। ফলে বাস্তবায়নের এই হ্রাসকৃত হার নিঃসন্দেহে আমলে নেওয়ার মতো।
মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন বিশ্নেষণ করে দেখা যায়, 'মন্দের ভালো' হিসেবে সরকারের ব্যয় কম হওয়ায় ঋণ কম হয়েছে। বাজেট ঘাটতিও হয়েছে কম। মনে রাখতে হবে, এই সময়ে সরকার বৈদেশিক অনুদান পেয়েছে সামান্য। এটা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই যে, ২৬ শতাংশ বাজেট বাস্তবায়ন না হওয়ার বড় কারণ চলমান করোনা পরিস্থিতি। করোনার ঊর্ধ্ব সংক্রমণ, লকডাউনসহ বিভিন্ন কারণে দীর্ঘদিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ ছিল কিংবা ধীরগতিতে চলেছে। তবে করোনার মধ্যে যথাযথ পরিকল্পনা নিয়ে সক্ষমতা বাড়াতে পারলে এর চেয়ে বেশি হারে বাজেট বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল।
আমাদের দেশে বাজেট পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ার বেশ কিছু কারণ অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। আমাদের সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। সরকার এ বিষয়ে ওয়াকিফহাল। বিভিন্ন সময় এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং হচ্ছে। এরপরও অগ্রগতি অতি সামান্য। আসলে বাজেট বাস্তবায়নের কাজ যারা করেন তাদের মধ্যে গাফিলতি লক্ষ্য করা যায়। অনেক সময় প্রকল্প পরিচালকরা কর্মস্থলে থাকেন না। ফলে কাজে অগ্রগতি থাকে না। যারা গাফিলতি করেন তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত হয় না। করোনাকালে এ প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা গেছে। পাশাপাশি বরাদ্দ করা অর্থ ছাড় নিয়েও সমস্যা রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সময়মতো সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে অর্থ ছাড় করলেও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয়ের হাতে পৌঁছাতে যেসব ধাপ পেরোতে হয়, সেখানে বেশ সময় যায়। এ ছাড়া যন্ত্রপাতি, জনবলের ঘাটতিও বাজেট বাস্তবায়ন কম হওয়ার কারণ।
আমরা দেখেছি, গত অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয় হয়েছে অনেক কম। সরকার সংশোধিত বাজেটে ২ লাখ ৮ হাজার ২৫ কোটি টাকা উন্নয়ন ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নেয়। অর্থবছর শেষে ব্যয় হয়েছে এক লাখ ২৯ হাজার ৩২ কোটি টাকা, যা উন্নয়ন বরাদ্দের ৬২ শতাংশ। এর মধ্যে নিয়মিত ব্যয় হয়েছে ২১ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। মূলধনি ব্যয় হয়েছে ৮৬ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। সরকারের উন্নয়ন ব্যয় কম হলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়। বাজারে পণ্যের চাহিদা ও মুদ্রা সরবরাহ কমে যায়। স্বাভাবিকভাবেই সরকার পরিচালন ব্যয়ও কম করেছে। আরও বিভিন্ন খাতে ব্যয় কম হয়েছে।
করোনার কারণে কিছু খাতে চাহিদা কমেছে। আবার কিছু খাতে ব্যাপক ব্যয়ের চাহিদা তৈরি হয়েছে। চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে এমন খাতে বরাদ্দের চেয়ে অধিক ব্যয় করার দৃষ্টান্ত ২০২০-২১ অর্থবছরেই রয়েছে। আবার চাহিদা বাড়লেও বরাদ্দের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় করতে না পারার ব্যর্থতা দেখা যাচ্ছে। এ-সংক্রান্ত দুটি খাতের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই। করোনার কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের কাজের সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় সরকার খাদ্য সহায়তা ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি বাড়ায়। কাজ হারিয়ে সংকটে পড়া কয়েক লাখ পরিবারকে বিনামূল্যে খাদ্য সরবরাহ করে সরকার। এ ছাড়া কম দামে খোলাবাজারে বিক্রি (ওএমএস) বাড়িয়ে দেয়। ফলে সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ বাড়িয়ে ২ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু অর্থবছর শেষে দেখা গেছে, এ খাতে সরকারের ব্যয় হয়েছে ৯ হাজার ৪২২ কোটি টাকা। করোনাকালে বেকার হওয়া, আয় বন্ধ হওয়া, সঞ্চয় হারানো মানুষের জন্য এ ব্যয় খুবই মানবিক। সরকারের এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবা খাতে ঠিক এর উল্টো চিত্র।

করোনাকালে স্বাস্থ্যসেবা খাতকে আগের মতো করে দেখার অবকাশ নেই। এই সময়ে স্বাস্থ্য খাতই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে স্বাস্থ্যসেবা খাতকে আরও সুসংহত করার সুযোগ আমাদের ছিল। সংশোধিত বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য ২৫ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য নেয় সরকার। হাসপাতাল উন্নয়ন, করোনার টিকাদান কার্যক্রম বাস্তবায়ন, অক্সিজেন সরবরাহ উন্নয়ন, ভেন্টিলেটর, আইসিইউ স্থাপন, চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগের মতো বিভিন্ন কাজের চাহিদা বাড়ে। এর পরও বছর শেষে দেখা গেছে, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ১৫ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা ব্যয় করতে পেরেছে। প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় সম্ভব হয়নি। বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবা খাতের বেশ দুর্বলতা লক্ষ্য করা যায়। এর একটি কারণ হতে পারে, এ খাতে যারা ব্যয় করেন তাদের পর্যাপ্ত দক্ষতা নেই। তাদের সঠিকভাবে পরিকল্পনা করার সক্ষমতা নেই এবং পরিকল্পিতভাবে ব্যয় করারও সক্ষমতা নেই। করোনা থাকুক আর না থাকুক, মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সব সময়ই জরুরি। কাজেই এঘঐ দুর্বলতা শনাক্ত করে ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করা দরকার।
আমি মনে করি, বাজেট প্রণয়ন করতে হয় বাস্তবতার আলোকে। কিন্তু এ বছর যে বাজেট করা হয়েছিল, তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। কারণ, আমরা করোনাকাল অতিক্রম করছি। সুতরাং বাজেট হওয়া উচিত ছিল করোনাকে কেন্দ্র করে। বাস্তবে সেভাবে বাজেট হয়নি। স্বাস্থ্যসেবা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর তাগিদ ছিল। তা হয়নি। এতে অনেকেই হতাশ হয়েছেন। কিন্তু সরকার যে বরাদ্দ রেখেছিল তা ব্যয় না হওয়া আমাদের নতুন করে হতাশ করেছে। সারাদেশের কমিউনিটি ক্লিনিককে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা সুসংহত করে একটি সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা তৈরির প্রক্রিয়া শুরুর করার সুযোগ ছিল আমাদের। এ পর্যন্ত সে পথে হাঁটা শুরু হয়নি। আশা করি, আগামী বছর থেকে সে প্রক্রিয়া শুরু হবে।
সন্দেহ নেই, এ বছর বাজেট বাস্তবায়নে আগে থেকেই যে ঘাটতিগুলো ছিল সেগুলোকে আরও প্রকট করেছে করোনা পরিস্থিতি। সুতরাং, সরকারের করণীয় হলো, দক্ষতার ঘাটতি পূরণ এবং যারা বাজেট বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। অনেকেই গাফিলতি করেন এবং নানা কারণে লক্ষ্য অর্জন করতে পারেন না। এসব বিষয়ে তাদের জবাবদিহি নেই। এভাবে চলতে থাকলে বাজেট বাস্তবায়নের এই দুর্বলতা টিকে থাকবে। সেটা করোনা থাকলেও থাকবে, না থাকলেও থাকবে।
আমাদের লক্ষ্য করোনা-পূর্ব সময়ে যে অগ্রগতি সাধিত হচ্ছিল সেই পথে ফিরে যাওয়া। এ ক্ষেত্রে প্রথমে করোনা থেকে পুনরুদ্ধার এবং পরে পুনর্জাগরণ বা পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় যেতে হবে। এ জন্য দরকার সঠিক পরিকল্পনা। তার চেয়ে বেশি দরকার দক্ষতার সঙ্গে বাজেট বাস্তবায়ন। আগামীতে পরিকল্পনা ও বাজেট বাস্তবায়নের দিকে জোর দিতে হবে।
অর্থনীতিবিদ