বিগত কয়েক দশকে পৃথিবী যে সংকটগুলো প্রত্যক্ষ করেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিশু ও শৈশবের ওপর প্রভাব ফেলেছে করোনা অতিমারি। পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই, যে দেশের শৈশব তার সহজাত প্রবৃত্তি অনুসারে বেড়ে উঠেছে এই দীর্ঘ ১৮ মাস। ধনী বা উন্নয়নশীল প্রতিটি দেশেই দুরন্ত শৈশবকে আটকে থাকতে হয়েছে চার দেয়ালে, মাস্কের পরতে পরতে আর হাজার নিয়মের শৃঙ্খলে। এই শৃঙ্খলে শিশুরা পারেনি বন্ধুর সঙ্গে খেলতে, যা স্বাভাবিকভাবেই তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করেছে। তাদের সামাজিক রীতিনীতি শেখাতেও সৃষ্টি হয়েছে বাধা। কেননা লকডাউনে শিশুদের বর্ধিত পরিবার ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে সামাজিকতা রক্ষার সুযোগও ছিল না। শিশুদের জন্য স্বাভাবিক সময়ে যেখানে ডিভাইস ব্যবহারের সুযোগ কম ছিল, করোনা পরিস্থিতিতে সেই ডিভাইসগুলোই হয়েছে তার শিক্ষা উপকরণ। তাই ভার্চুয়াল জগতে তার এক্সপোজার বেড়েছে, কমেছে শারীরিক কসরত, বেড়েছে স্থূলতা, প্রাত্যহিক নিয়মের ব্যত্যয়, রাত জাগা, সকালে ঘুম না ভাঙা, ক্ষুধামন্দা। বেড়েছে মানসিক সমস্যা, সেই সঙ্গে বিষণ্ণতা। এমনকি আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে শিশুদের প্রতি মানসিক ও শারীরিক সহিংসতার ঘটনা। এতকিছুর মাঝে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে যে বিষয়গুলো বেশি মাত্রায় পরিলক্ষিত হয়েছে তা হলো শিশুশ্রম এবং বাল্যবিয়ের বর্ধিত হার।
স্কুল ছুটির ঘোষণা আসার পর পরই ঈদের আমেজের মতো উত্তেজনা ছিল শিশুদের মাঝে। ভাটা পড়তে আরম্ভ করে যখন এই ছুটির দিনগুলো অনির্ধারিতকালের ছুটি হয়ে যায়। কভিডের উত্তররোত্তর ভয়াবহতায় শিশুদের মাঝে বাড়িয়েছে মানসিক চাপ, বিদ্যালয়ে ক্লাস না হওয়ায় পড়ালেখায় পিছিয়ে যাওয়া বা গতি হ্রাস, বন্ধুদের না পাওয়ার কষ্ট, সেই সঙ্গে ডিভাইসে অধিক সময়ে এক্সপোজারে শিশুদের মস্তিস্ককে ক্লান্ত করেছে, বাড়িয়েছে মানসিক অবসাদ এবং অস্থিরতা। বারবার বিদ্যালয় খুলে যাবে, সেই প্রস্তুতি নিয়েও তা পিছিয়ে গেছে। কোনোভাবেই সংক্রমণ নয়- তাই সংগত কারণেই বিদ্যালয় খুলে যাওয়ার বিষয়টি পিছিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে ১৯ দফা সংবলিত নীতিমালার ভিত্তিতে বিদ্যালয়গুলোকে শিশুদের জন্য সুরক্ষিত করতে শুরু হয় প্রস্তুতি। সেই প্রস্তুতি সম্পন্ন করে দীর্ঘ ১৮ মাস পর ১২ সেপ্টেম্বর থেকে বিদ্যালয়গুলো নিয়ম মেনে খুলে দেওয়ার ঘোষণা আসে। করোনাকে সঙ্গে নিয়েই সচেতনভাবে স্বাভাবিক কাজ চালিয়ে নিতে হবে বলে এগিয়ে চলা মানুষ শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর প্রশ্নে নানান সংশয়ে পড়েছে। নতুন পরিস্থিতিতে কেমন হবে নতুন দিনের শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের কী করা উচিত, শিশুদের আদৌ বিদ্যালয়ে পাঠানো উচিত হবে কিনা- এসব নিয়ে অনেক সংশয় স্বাভাবিকভাবেই সূচিত হয়েছে।
শিশুদের বিদ্যালয়ে ফিরতে হবে, ফেরাতে হবে। এটি তাদের অধিকার ও প্রয়োজন। প্রয়োজন তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশও। তাই আতঙ্ক নয় বরং সচেতন করতে হবে তাদের। তাদের ভাষায়, বয়সোপযোগী করে পরিবার থেকেই এই সচেতনতা তৈরি করতে হবে। তবে বিদ্যালয়ে যাওয়ার পর পরই তাকে পড়ার পাহাড়ে আরোহণের নির্দেশনা না দিয়ে জানাতে হবে, করোনার বিরুদ্ধে সে বাসায় থেকে কেমনভাবে লড়াই করেছে, তার জন্য তাকে বাহবা দিতে হবে। সেই যুদ্ধ বিদ্যালয়ে এসেও কীভাবে অব্যাহত রাখতে হবে তা তাকে জানাতে হবে।
শুরুতেই পড়ার চাপ নয়। এতগুলো দিন বাসায় থেকে শিশুদের স্বাভাবিক জীবন পরিবর্তন হয়েছে। হঠাৎ করেই তার জন্য যেমন সকালে উঠে বিদ্যালয়ে যাওয়া মুশকিল, তেমনি স্বাভাবিক সময়ের মতন লম্বা সময় বিদ্যালয়ে থাকাটাও। তাই শুরুর দিনগুলোতে বিদ্যালয়ে পড়ার চেয়ে খেলা, সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো দিয়েই শিক্ষকমণ্ডলী শিশুদের মন আকর্ষণ করবেন।
ডিজিটাল ডিভাইসে আসক্তি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের দৃষ্টিশক্তিতেও ভীষণভাবে প্রভাব পড়েছে। প্রভাব পড়েছে তাদের আচরণে। বিদ্যালয় বন্ধে পড়ালেখায় ক্ষতি হচ্ছে বলে মত প্রকাশ করেন অনেক পিতামাতাই। কিন্তু বিদ্যালয় বন্ধ থাকার কারণেই আক্রান্তের হার আশঙ্কার চেয়ে অনেক নিচে। শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রেখে শিক্ষার্থীদের উপযোগী ও সময়োপযোগী কনডেন্সড সিলেবাসে ইন্টারনেট ও টেলিভিশনের মাধ্যমে পাঠদান পরিচালনা হয়েছে এই সময়। তথাপি অনেক অভিভাবক মুখর হয়ে আছেন- গেল বছরগুলোর ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিদ্যালয় খোলা মাত্রই শিশুদের পড়ায় মনোযোগী করায়।
এই করোনাকালে যখন বিদ্যালয়গুলো বন্ধ ছিল, তখন বিদ্যালয়গুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের মানসিকভাবে সুস্থ রাখা। করোনার উৎকণ্ঠা থেকে তাদের দূরে রাখা। তাই সিলেবাস হয়েছে সংক্ষিপ্ত, দিনপ্রতি ক্লাসের সংখ্যাও ছিল কম।
দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ শিশু করোনার কারণে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে সরে এসেছে। এই শিশুদের অনেককে কোনোভাবেই শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা যায়নি। তাদের মুঠোফোন বা টেলিভিশন দেখার সুযোগ নেই। আবার করোনায় কাজ হারানো অনেক পরিবারের পক্ষে সন্তান লালন-পালন মুশকিল হওয়ায় তারা শিশুদের কাজে দেওয়া এবং কন্যাশিশুদের বিয়ে দিয়ে দেওয়াকেই শ্রেয় মনে করেছেন। এই শিশুদের ভুলে গেলে চলবে না। তাদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনতে নিতে হবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোকে কাজ করতে হবে পরিবার ও বিদ্যালয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে। উপার্জনের সঙ্গে যুক্ত শিশুরা যেন শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হয় তেমনি বাল্যবিয়ের শিকার শিশুদেরও বিদ্যালয়ে ফেরানোর জন্য পরিবারগুলোর সঙ্গে কাজ করতে হবে।
তবে সর্বোপরি যা প্রয়োজন তা হলো, সরকারের সুচিন্তিত ১৯ দফা নীতিমালার পরিপূর্ণ প্রয়োগ ও তা টিকিয়ে রাখা। বিদ্যালয় খুলে যাওয়ার আগের প্রস্তুতি যেন কোনোভাবেই একটা বিশেষ দিনকেন্দ্রিক না হয়ে সবসময়ের জন্য বজায় থাকে তার ব্যবস্থা নিতে হবে, নিবিড়ভাবে এর পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োগ যাতে হয়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। শিশুকে বিদ্যালয়ে পাঠানোর বিষয়ে পরিবারের সংশয় তখনই কাটবে। সেই সঙ্গে পরিবারকেও দায়িত্ব নিতে হবে নিজেরা সচেতন হয়ে শিশুদের সচেতন ও দায়িত্বপূর্ণ আচরণ শেখানোর। সচেতনতাই একমাত্র পারে করোনার এই নিউ নরমালে সবাইকে সুস্থ রাখতে এবং নীতিমালার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে।
কমিউনিকেশন্স ম্যানেজার, ওয়ার্ল্ডভিশন বাংলাদেশ