একটানা দেড় বছর বন্ধ থাকার পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলায় শিক্ষার্থীদের বাঁধভাঙা আনন্দের সঙ্গে অভিভাবক ও শিক্ষানুরাগী সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে যে স্বস্তি ফিরে এসেছে এককথায় তা অভাবিত। এরপরই প্রস্তাবিত জাতীয় শিক্ষাক্রম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুমোদন দেওয়ায় শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে এতে আমার সন্তুষ্ট হওয়ার কারণ, ২০১২ সালের শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন তৈরির জন্য ২০১৭ সালে গঠিত কমিটিতে ক্ষুদ্র সামর্থ্য নিয়ে আমাকেও সময় ও শ্রম দিতে হয়েছে। আগামী বছর অর্থাৎ ২০২২ সালে যেদিনটির ৬০ বছর পূর্তি হবে- ঐতিহাসিক সেই শিক্ষা দিবসে উল্লিখিত দুটি বিষয় সবদিক দিয়েই প্রাসঙ্গিক।
যে পটভূমিতে '৬২-র শিক্ষা আন্দোলন সূচিত হয়, নবকুমার স্কুলের ছাত্র বাবুল, বাস কন্ডাক্টর গোলাম মোস্তফা ও গৃহকর্মী ওয়াজীউল্লাহ শাহাদাতবরণ করেন, ১৭ সেপ্টেম্বর যে আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে তা নিয়ে লেখালেখি কম হয়নি। ভারত বিভাগের পর ১৯৪৭ সাল থেকে পাকিস্তানের পূর্ব অংশে শোষণ ও বৈষম্যমূলক নীতি অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো শিক্ষা ব্যবস্থায়ও অনুসরণ, বাংলা ভাষার বিকৃতি, রোমান হরফে বাংলা প্রবর্তনের অপপ্রয়াস, রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনের বিরোধিতার প্রেক্ষাপটে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌সহ শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীদের বলিষ্ঠ ভূমিকা, ড. মাহমুদ হোসেন, রেহমান সোবহানের দুই অর্থনীতির প্রস্তাব বাঙালির প্রতিরোধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। এ পটভূমিতে পূর্ব বাংলার বুদ্ধিজীবী সংস্কৃতিসেবীরা ও অগ্রণী ছাত্রসমাজ যখন বঞ্চনার বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসছিল, সামরিক শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, সে সময় ১৯৬২ সালে শরীফ শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট প্রকাশ হওয়ার পর তা কার্যকর হওয়া শুরু হয়।
উল্লেখ্য, আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট হয়েই শিক্ষানীতি প্রণয়নের জন্য ৩০ ডিসেম্বর ১৯৫৮ পাকিস্তান শিক্ষা বিভাগের সচিব ও আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের তার সাবেক শিক্ষক এসএম শরীফকে চেয়ারম্যান নিয়োগ করেন। শিক্ষার উন্নয়নের জন্য শরীফ কমিশনের অর্থ সংস্থান সম্পর্কিত প্রস্তাব ও মন্তব্য ছিল- (১) 'শিক্ষা সস্তায় পাওয়া সম্ভব নয়', ২. অবৈতনিক প্রাথমিক স্কুল ও নামমাত্র বেতনের মাধ্যমিক স্কুল স্থাপনের জন্য সরকারের ওপর নির্ভর করাই জনসাধারণের রীতি। তাদের উপলব্ধি করতে হবে, অবৈতনিক শিক্ষার ধারণা বস্তুত অবাস্তব কল্পনা মাত্র, ৩. শরীফ কমিশনের যে সুপারিশ বাষট্টির ছাত্র আন্দোলনকে তীব্রতর করে ও আশু কারণ হিসেবে দেখা দেয় তা হলো, দুই বছরমেয়াদি স্নাতক ডিগ্রি কোর্সকে তিন বছরমেয়াদি করার সুপারিশ, ৪. আওয়ামী লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর গ্রেপ্তার। ছাত্রসমাজ শরীফ কমিশন প্রতিবেদনকে একটি প্রতিক্রিয়াশীল শিক্ষানীতি হিসেবে চিহ্নিত ও মূল্যায়ন করেন, শিক্ষা সংকোচনমূলক গণবিরোধী এ প্রতিবেদন তারা প্রত্যাখ্যান করেন। ছাত্ররা আগে থেকেই আইয়ুব তথা সামরিক আইনবিরোধী আন্দোলনে ছিল। এমন একটা অবস্থায় শরীফ কমিশনের গণবিরোধী সুপারিশ ছিল ভিমরুলের চাকে ঢিল দেওয়ার মতো। তারা অত্যন্ত সংগঠিতভাবে আন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম হন। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব স্তরের ছাত্ররা এতে স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। প্রথমে আন্দোলন শুরু হয়েছিল ঢাকা কলেজ থেকে। তিন বছরমেয়াদি ডিগ্রি পাস কোর্সের বিপক্ষে ঢাকা কলেজের ছাত্ররা সর্বপ্রথম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। ডিগ্রির ছাত্র প্রতিবন্ধী এমআই চৌধুরী এই আন্দোলনের সূচনা করেন। উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে ইংরেজিকে অতিরিক্ত বোঝা মনে করে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির পরীক্ষার্থীরাও আন্দোলন শুরু করেন।
আমি ছিলাম ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক। সে হিসেবে এ আন্দোলনের একজন সংগঠক। আর এ অবস্থান থেকে জনগণের স্বার্থের অনুকূল শিক্ষানীতির জন্য আন্দোলনে অংশ নিই। শিক্ষা কমিশনের কয়েকটি সুপারিশের বিরুদ্ধে এ আন্দোলন গড়ে ওঠে। ছাত্রছাত্রীরা দেখিয়ে দেয় যে, সেসব সুপারিশ গরিব ও কম আয়ের মানুষদের জন্য শিক্ষার দরজা বন্ধ করে দেবে। কয়েক মাস ধরে চলা এ আন্দোলন শুরু করেছিলেন ঢাকা কলেজের ছাত্ররা। এ আন্দোলনের অংশ হিসেবে একের পর এক ধর্মঘট, ক্লাস বর্জন ও অনশন ধর্মঘট সংগঠিত করা হয়। সেই ১৭ সেপ্টেম্বরে ঢাকায় যে মিছিল হয়, তাতে কেবল ছাত্রছাত্রীরা অংশ নিয়েছিল, তা নয়। ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি কলকারখানার মজুর, রিকশাচালক, মাঝিরাও মিছিলে শরিক হন। এই ১৯৬২ সালের আন্দোলন নিয়ে আসে গ্রগতিশীলতা। বাইরের কোনো মহলের প্রভাব ছাড়াই ছাত্রছাত্রীরা এ আন্দোলন শুরু করেছিলেন।
এক সময় আমাদের দেশে শিক্ষার উন্নয়ন বলতে দালানকোঠার উন্নয়ন বোঝানো হতো। স্কুলে অথবা গৃহে, অথবা উভয় স্থানে শিক্ষার্থীর লেখাপড়ায় বিদ্যমান প্রতিকূল পরিবেশ, নিরানন্দ পাঠদান পদ্ধতি যেমন গ্রাহ্যের মধ্যে আসেনি, পাঠদানকারী শিক্ষকের প্রাপ্য আর্থসামাজিক মর্যাদার সোপানগুলো ছিল বিবেচনার বাইরে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয় ক্ষেত্রে অবস্থার পরিবর্তন হলেও এখনও কাঙ্ক্ষিত করণীয়ের তালিকা কম দীর্ঘ নয়।
উল্লেখ্য, সমন্বিত শিক্ষা আইন, স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন, পিএসসির আদলে শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থা চালুর মতো প্রত্যাশাগুলো এখনও বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। সেই সঙ্গে সংবিধান ও জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুসারে সরকারি-বেসরকারি, গ্রাম-শহর, নারী-পুরুষের বৈষম্যের প্রাসঙ্গিকতায় শিক্ষায় করণীয় রয়েছে উল্লেখ করার মতো। ব্যক্তিগতভাবে শেখ হাসিনার আনুকূল্যে, তার সরকারের উদ্যোগে শিক্ষকদের প্রস্তাব মতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠ্যসূচিতে উল্লেখযোগ্যভাবে স্থান করে নিতে পারলেও মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর ছোবল থেকে মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির সুরক্ষায় বাধা কোনো অংশে কম নয়। সেজন্য বেশি করে চোখ-কান খোলা রাখার অনস্বীকার্য প্রয়োজন রয়েছে।
শিক্ষায় নারীর অগ্রযাত্রা নজর কাড়লেও কর্মমুখী শিক্ষা ও শিক্ষার উচ্চস্তরে নারীর অগ্রযাত্রা নিশ্চিতকরণে অনেক কিছু করার আছে। এ কথা স্পষ্ট, মুক্তিযুদ্ধের পথ ধরে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন ও অর্জন সম্ভব হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে। তবে শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী উন্নয়ন ও শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো অপরিহার্য। ওইসিডি পরিচালিত পিসা (প্রোগ্রাম ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট) কর্মসূচির সঙ্গে বাংলাদেশে শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন ব্যবস্থা যুক্ত করা আবশ্যক। বিগত ৫০ বছরে শিক্ষায় অর্জনগুলো ধরে রাখার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার গুণগত বিস্তার ও শিক্ষায় অর্থায়নে যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সব উৎসের সদ্ব্যবহার; সর্বোপরি, যুগোপযোগী দক্ষতা উন্নয়ন ও অপচয়ের সব ফাঁকফোকর বন্ধ করা সময়ের দাবি। স্বাধীনতার ৫০ বছরে উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন অর্জনের পরও যখন প্রশ্ন ওঠে, যে কারণগুলোর জন্য ৬২ শিক্ষা আন্দোলন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল, তা থেকে আমরা কতটুকু মুক্ত হতে পেরেছি, তখন আত্মানুসন্ধান ও বিশ্নেষণের অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য হয়ে ওঠে।
শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের আরও করণীয় রয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষার উন্নয়নে শিক্ষা খাতে জাতীয় বাজেটের ২০% অথবা জিডিপির ৬% বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা পরিকল্পনা ও বাজেটের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। যা হবে বৈষম্যহীন ও মতাদর্শ, অঞ্চল ও জেন্ডার নির্বিশেষে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের প্রকৃত উন্নয়ন ও কল্যাণ এবং শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে সহায়ক। বিশ্বমানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ শিক্ষার্থীর জ্ঞান ও উন্নত জীবন পরিচালনার উপযোগী দক্ষতা অর্জন এবং নৈতিক মূল্যবোধ সমৃদ্ধ, দেশাত্মবোধে উজ্জীবিত, আত্মবিশ্বাস সৃষ্টিকারী ও প্রেরণাদায়ক। শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি ও শিক্ষায় বরাদ্দের অগ্রাধিকার চিহ্নিত করতে হবে। যুবসমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৃদ্ধিতে সহায়ক কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ ও বাংলাদেশ দক্ষতা উন্নয়ন নীতি-২০১১ বাস্তবায়নে সমন্বিত, পূর্ণাঙ্গ ও অন্তর্বর্তী কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ বাড়াতে হবে এবং বিজ্ঞানের ব্যবহারিক শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ অনুসারে প্রতি থানা বা উপজেলায় সরকারি অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনায় বিজ্ঞানাগার প্রতিষ্ঠা করে পালাক্রমে সংশ্নিষ্ট এলাকার স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের আবশ্যিক ব্যবহারিক ক্লাসের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক পৃথক উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। বাজেট প্রক্রিয়া বিকেন্দ্রীকরণ করার লক্ষ্যে আয় ও ব্যয়ের বিধান রেখে কার্যকর জেলা বাজেট প্রণয়ন ও প্রতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বাজেট তৈরি করতে হবে। সর্বোপরি তথ্যপ্রযুক্তি ও দূরশিক্ষণ করোনাকালে যেভাবে শিক্ষার অপরিহার্য অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে তার কাম্য বিকাশের লক্ষ্যে কম্পিউটার ল্যাপটপ ইন্টারনেট সংযোগ সহজলভ্য ও ঋণে প্রাপ্তির সুযোগ অবারিত করে গ্রাম ও শহর, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান তথা ডিজিটাল ডিভাইস দূরীকরণে অবিলম্বে কর্মসূচি নিতে হবে এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য সুনির্দিষ্ট কার্যকর প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হাতে নিতে হবে।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর প্রণয়ন কমিটির সদস্য; শিক্ষা উন্নয়ন গবেষক
principalqfahmed@yahoo.