মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একসাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ৯ মাসে এ দেশের যত মানুষ আত্মবিসর্জন দিয়েছে, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। ২৫ মার্চের রাতে অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যার সূচনা করে। পরবর্তী সময়ে তারা গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে। ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার পর দেশব্যাপী সংগঠিত মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর হামলা শুরু করে। এর প্রতিশোধ নিতে পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর এবং গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহরে হামলা চালায়। তারা বিভিন্ন জনপদে আগুন ধরিয়ে দেয়, হত্যা করে নিরপরাধ মানুষকে, ধর্ষণ করে নারী, লুণ্ঠন করে সম্পদ। পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক এই গণহত্যা ইতিহাসের অন্যতম জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সারাদেশে চালানো হত্যাকাণ্ডের অন্যতম ক্ষেত্র হবিগঞ্জ জেলার লাখাইয়ের কৃষ্ণপুর। ১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানি সৈন্যরা রাজাকার বাহিনীর সহযোগিতায় ১২৭ জন ব্যক্তিকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে।

লাখাই উপজেলার অন্তর্গত হিন্দু অধ্যুষিত একটি গ্রাম কৃষ্ণপুর। ইউনিয়নের অন্যান্য গ্রাম থেকে বলা চলে বিচ্ছিন্ন এলাকা এটি। এখানে শুকনো মৌসুমে হেঁটে এবং বর্ষায় নৌকায় চলাচল করতে হয়। একাত্তরের ১৮ সেপ্টেম্বর ভোরে অমাবস্যার অন্ধকারের মতো গাঢ় ছায়া নেমে আসে ওই হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামটিতে। চারদিক থেকে রাজাকাররা ঘিরে ফেলে গ্রামটিকে। কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম ক্যাম্প থেকে দুটি স্পিডবোটে করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কিছু সদস্য এখানে চলে আসে। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় স্থানীয় রাজাকার কমান্ডার মোড়াকরি গ্রামের লিয়াকত আলী, বাদশা মিয়া; কিশোরগঞ্জের আলবদর আমিনুল ইসলাম ওরফে রজব আলী, লাল খাঁ, নাসিরনগর থানাধীন ফান্দাউকের আহাদ মিয়া, সন্তোষপুরের মোর্শেদ কামাল ওরফে শিশু মিয়াসহ ৪০-৫০ জন রাজাকার, আলবদর। তাদের সহযোগিতায় নিরীহ ১৩১ জন হিন্দুকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয় কমলাময়ী উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। তারপর তাদের লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়। তাদের মধ্যে হরিদাস রায়, প্রমোদ রায়, নবদ্বীপ রায় ও মন্টু রায় বুলেটবিদ্ধ হয়েও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। তবে তারা সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে পড়েন। গ্রামে আক্রমণের খবর পেয়ে যারা পুকুরে কচুরিপানার মধ্যে লুকিয়ে ছিলেন তারাই কেবল প্রাণে বেঁচেছিলেন। নারীদের ওপর নেমে এসেছিল অকল্পনীয় নির্যাতন। রাজাকার-আলবদররা পুরো গ্রামে লুটপাট চালায়। পরে তাদের মাধ্যমে প্ররোচিত হয়ে পুরো গ্রাম আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় পাকিস্তানি সৈন্যরা।

বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলা ওই তাণ্ডব পুরো গ্রামটিকে কার্যত শ্মশানে পরিণত করে। একসঙ্গে ১২৭ জন মানুষের সৎকারের ব্যবস্থা করতে না পেরে রাজাকাররা তাদের সংবাদ জানতে পারে- এই শঙ্কায় বলভদ্র নদীতে মৃতদেহ ভাসিয়ে দেয় লোকজন। স্ব্বাধীনতার এত বছর পেরিয়ে গেলেও এখানকার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কিংবা আহত মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম নেই গুলি খেয়েও বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের। গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি কৃষ্ণপুর গণহত্যার শিকার সেইসব সাহসী বীর শহীদকে। স্বাধীনতার জন্য জীবন দেওয়া শহীদরা আমাদের বীর সৈনিক। কৃষ্ণপুরের মতো দেশের নানা স্থানে সংঘটিত বেদনাদায়ক গণহত্যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেশমাতৃকার জন্য জীবন দেওয়া সেইসব মানুষকে।

শিক্ষার্থী, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়