মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিরচিত মহাকাব্য 'মেঘনাদবধ' কাব্যের 'এতক্ষণে অরিন্দম কহিলা বিষাদে'- এই কাব্যপঙ্‌ক্তি বাঙালি সমাজের জনপরিসরে বহুল উচ্চারিত। এর প্রেক্ষাপট বিস্তৃত। তবে রাবণপুত্রের এই উপলব্ধি- হাহাকার প্রবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে সমাজে। বুঝতে না পারা কোনো ঘটনা যখন বিভ্রম সৃষ্টি করে এবং এই ভ্রম কেটে গেলে অনেকেই এই কাব্যপঙ্‌ক্তিটি উচ্চারণ করে থাকেন। বিমানবন্দরে করোনার র‌্যাপিড টেস্টের জন্য ল্যাবরেটরি স্থাপনে প্রবাসী কর্মীদের দাবি ছিল অনেক দিনের। করোনা-দুর্যোগে নানা খাতে যে অভিঘাত লাগে এর বাইরে থাকতে পারেননি আমাদের প্রবাসী কর্মীরাও। তাদের আমরা 'রেমিট্যান্সযোদ্ধা' বলি। কিন্তু তাদের প্রতি সরকারের সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল মহলগুলোর যে দায় রয়েছে, তা পালনে তারা কতটা নিষ্ট- এ প্রশ্নের উত্তর প্রীতিকর নয়। আমাদের এরকম অভিজ্ঞতার সঙ্গে ফের যুক্ত হয় বিমানবন্দরে র‌্যাপিড টেস্ট ল্যাব স্থাপনের বিষয়টি। ৬ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, দু-তিন দিনের মধ্যে ল্যাব স্থাপনের। তারপরও গড়িয়ে যায় ১০ দিন। বিষয়টি নিয়ে সংবাদমাধ্যমে নানা নেতিবাচক চিত্র উঠে আসতে থাকে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরও যখন অতি জরুরি এই বিষয়ে সময়ক্ষেপণ হচ্ছিল, সরকারে সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলদের মুখে উচ্চারিত হচ্ছিল অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতির বাণী, তখন খুব বিস্ময়করভাবেই প্রশ্ন উঠেছিল- এ নিয়ে এত কসরতের কারণটি কী! ১৬ সেপ্টেম্বর সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিই এ প্রশ্নের উত্তর অনেকটা পরিস্কার করে দিয়েছে। 'করোনা পরীক্ষার দায়িত্ব পেল ভুয়া সনদ দেওয়া প্রতিষ্ঠানও'-শিরোনামে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা যে কোনো শুভবোধসম্পন্ন মানুষকেই ক্ষুব্ধ ও বিস্মিত না করে পারে না। বিদেশগামীদের ভুয়া সনদ দেওয়ায় যে চার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ করেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, তারই মধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠান বিমানবন্দরে করোনার পরীক্ষার কাজ পেয়েছে! সিএমবিএফ হেলথ সেন্টার ও স্টেমজ হেলথ কেয়ার (বিডি) লিমিটেড প্রতিষ্ঠান দুটির করোনা-দুর্যোগে তুঘলকিকাণ্ডের খতিয়ান কম দীর্ঘ নয়।

১১ সেপ্টেম্বর সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, বিমানবন্দরে করোনা পরীক্ষা নিয়ে সিন্ডিকেটের ছকের কথা। এও বলা হয়েছে, বিমানবন্দরে স্বল্প সময়ের মধ্যেই আরটি-পিসিআর ল্যাব স্থাপনে সরকারি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা-সক্ষমতা রয়েছে এবং খরচও অনেক কম পড়বে। তবুও বেশি খরচে পরীক্ষা করতে চাওয়া বেসরকারি এমন একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে চলে তোড়জোড়, যে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক এক মহাপরিচালকের সম্পৃক্ততা রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সন্ধানে সময়ক্ষেপণ করা হলো- এই প্রশ্নের উত্তরও জটিল নয়। করোনা দুর্যোগে অনেক দেশই প্রবাসী কর্মীদের পুনরাগমনে বিধিনিষেধ জারি করেছিল। পর্যায়ক্রমে কোনো কোনো দেশ তা তুলে নেয়, এর মধ্যে আরব আমিরাত একটি। তবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেও বেশ কিছু শর্ত তারা জারি করে। এর মধ্যে যাত্রার ৪৮ ঘণ্টা আগে পিসিআর টেস্ট করাতে হবে এবং করোনা নেগেটিভ সনদ নিয়ে বিমানে চড়তে হবে এটি অন্যতম শর্ত।

১৪ সেপ্টেম্বর আমিরাত প্রবাসী কর্মীরা বিমানবন্দরে ল্যাব স্থাপনে বিলম্বের কারণে অনশন করেন। করেন বিক্ষোভও। পরে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রীর আশ্বাসে তারা অনশন ভঙ্গ করেন। যাদের আমরা বলছি 'রেমিট্যান্সযোদ্ধা', তাদের প্রতি সরকারের দায়িত্বশীল মহলগুলোর উপেক্ষা-উদাসীনতার এমন মনোভাবের ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ কী হতে পারে? এই অঞ্চলেরই দেশ নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভারত তাদের প্রবাসী কর্মীদের প্রাধান্য দিয়ে এবং তারা যাতে কেনোরকম ঝুঁকি বা বিড়ম্বনায় না পড়েন এ জন্য তারা বিমানবন্দরে র‌্যাপিড টেস্টের ব্যবস্থা করে দ্রুততার সঙ্গে। আমাদের দেশেও একই সুবিধা চালু করতে দাবি জানিয়ে আসছিলেন প্রবাসীরা। শেষ পর্যন্ত তারা নামেন কর্মসূচি নিয়ে রাস্তায়। তারপরও সরকারের দায়িত্বশীল মহলগুলোর ঘুম ভাঙতে এত বিলম্ব! এ বিলম্বের কারণে প্রবাসী অনেকেরই যে ক্ষতি ও বিপদের মুখোমুখি হতে হয়েছে, এর দায় এড়ানোর পথ কি দায়িত্বশীলদের আছে?

সংস্কৃত একটি শ্নোকে 'বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া' এই শব্দগুলো রয়েছে। অর্থাৎ কাজের ব্যাপারে দৃশ্যত তোড়জোড় যতই থাকুক, প্রকৃতার্থে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় মন্থর। আমাদের বাস্তবতায় এই সত্য অস্বীকারের পথ নেই। তাছাড়া অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক সমীকরণ ইত্যাদি তো আছেই। করোনা পরীক্ষায় যেসব প্রতিষ্ঠান ভুয়া সনদ দিয়ে দণ্ডিত হয়েছিল তারা কীভাবে কিংবা কোন বিবেচনায় বিমানবন্দরে প্রবাসী কর্মীদের র‌্যাপিড টেস্ট করার জন্য ল্যাব স্থাপনের অনুমতি পেল? তাদের দক্ষতা, সক্ষমতা কিংবা স্বচ্ছতা কোন মানদণ্ডে নির্ণীত হলো তা অনেকেরই প্রশ্ন। আরও প্রশ্ন- এ কোন 'ভানুমতি'র খেলা! করোনা-দুর্যোগে দেশের স্বাস্থ্য খাতের কোনো কোনো রাঘববোয়ালের সম্পৃক্ততায় কিংবা কারও কারোর সরাসরি জড়িত থেকে অনিয়ম-দুর্নীতির যে উৎকট দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে দাঁড়িয়েছে এর দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার কী হলো? অভিযুক্ত কারও কারোর বিরুদ্ধে মামলা এখনও চলমান, আবার অভিযুক্ত কাউকে কাউকে সাময়িক বরখাস্ত কিংবা বিভাগীয় কিছু পদক্ষেপের মধ্যে প্রতিকারের বিষয়টি গণ্ডিবদ্ধ!

এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিচার প্রক্রিয়ায় কেন এত বিলম্ব? জীবন-মরণ সমস্যা নিয়ে যারা তুঘলকিকাণ্ড চালালো, তাদের প্রতি কেনইবা অনুকম্পা? কী করে অভিযুক্তরা ফের এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দায়িত্বই বা পেল? তারা যে আরও বড় সর্বনাশের কারণ হবে না এর কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? রিজেন্ট-জেকেজি থেকে শুরু করে যে ক'টি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান বা হাসপাতাল কভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি, দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও সার্বিক অব্যবস্থাপনার যে নজির স্থাপন করেছে এর দায়দায়িত্ব সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়, দপ্তর-অধিদপ্তরের এড়ানোর অবকাশ নেই। তাদের পারস্পরিক দোষারোপ মানুষ অনেক শুনেছে, দেখেছে। কিন্তু তাদের এই 'খেলা'য় যে কোনো ফল ফলেনি বা ফলবে না এরকম দৃষ্টান্ত এখনও স্থাপিত হচ্ছে। জবাবদিহির পাঠ চুকে গেলে যা হয় তাই হয়েছে- এমনটি বললে নিশ্চয় অত্যুক্তি হবে না।

বিমানবন্দরে র‌্যাপিড টেস্ট ল্যাব স্থাপনে যে অসংগতি দেখা গেল, এর দায় প্রবাসীকল্যাণ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এড়ানোর সুযোগ নেই। ১৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্বাস্থ্য খাতের কঠোর সমালোচনায় বিরোধী সদস্যরা সোচ্চার হয়ে উঠলেও স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সেই গতানুগতিক ধারায়ই কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, 'সমুদ্রের মধ্যে দুই বালতি ময়লা ফেললেই সমুদ্র নষ্ট হয়ে যাবে না, পানি নষ্ট হয়ে যাবে না।' মন্ত্রী ময়লা বলতে আলোচ্য বিষয় নাকি অসাধু-দুর্নীতিবাজদের কাণ্ডকীর্তি- কোনটি বুঝিয়েছেন? আমাদের সমাজ বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় সমস্যা-সংকট 'বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া'। এ জন্যই দীর্ঘশ্বাস ফেলে জনপরিসরে উচ্চারিত হয়- 'এতক্ষণে অরিন্দম কহিলা বিষাদে'। কিন্তু এরকম কি চলতেই থাকবে?

লেখক ও সাংবাদিক
deba_bishnu@yahoo.com