কালোহাত' শব্দটি বাংলা ভাষায় বহুল প্রচলিত ও ব্যবহূত। বিশেষ করে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এ শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহূত। কোনো ঘটনার নেপথ্য কারণ উদ্ঘাটন করা না গেলে সাধারণত বলা হয়, 'এর পেছনে কালোহাতের কারসাজি' রয়েছে।

এই কালোহাত নিয়ে জিয়াউর রহমানের সরকারের আমলে একটি মজার ঘটনা ঘটেছিল। সময়টা ১৯৮০ সাল। এপ্রিল-মে মাসের দিকে হঠাৎ চাল-ডাল-তেলসহ নিত্যপণ্যের মূল্য বেড়ে যায়। বিরোধী দলগুলো সরকারের সমালোচনায় মুখর। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতার সমালোচনা করে মিছিল-সমাবেশ হচ্ছে। আমি তখন জয়পুরহাটে থাকি। বিএনপির মুখপত্র 'দৈনিক দেশ'-এর মহকুমা প্রতিনিধি। সে সময় রাতে বাংলাদেশ বেতারের ঢাকা কেন্দ্র থেকে 'সংবাদ প্রবাহ' নামে একটি অনুষ্ঠান প্রচার করা হতো। এক রাতে শুনলাম, বিএনপি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে রাজধানীতে মিছিল করেছে ওইদিন বিকেলে। মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সরকারের প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান। মিছিলে স্লোগান ছিল- 'কালোবাজারির কালোহাত/ ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও'। মনে প্রশ্ন জাগল- এ কেমন মিছিল! কালোবাজারিদের কালোহাত কে ভাঙবে? কার কাছে বিএনপির এ দাবি? ধরে নিলাম, তারা রাষ্ট্রপতির কাছে দাবি জানিয়েছে। কয়েক দিন পর একই প্রসঙ্গ তুলে প্রখ্যাত সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরী তার প্রসিদ্ধ কলাম 'দরবার-ই-জহুর'-এ সরকারকে তুলাধুনা করেছিলেন।

হাত সে ফর্সা কিংবা কালো যা-ই হোক, তা যদি ভালো কাজে প্রবৃত্ত হয়, কেউ প্রশ্ন তোলে না। কিন্তু ওই হাতই যখন সমাজ, রাষ্ট্র, আইন বা জনস্বার্থবিরোধী কোনো তৎপরতার নেপথ্যে কাজ করে, তখন তাকে কালোহাত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। মজার বিষয় হলো, রাজনৈতিক দলগুলো নানা ঘটনায় নেপথ্যের কালোহাতকে অভিযুক্ত করলেও সেসব কালোহাতের সন্ধান কখনোই পাওয়া যায় না। উদ্ভূত ইস্যুটি স্তিমিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কালোহাতের বিষয়টি ততদিনের জন্য চাপা পড়ে যায়, যতদিন নতুন আরেকটা ইস্যু সামনে না আসে।

২৭ আগস্ট সমকাল একটি সচিত্র প্রতিবেদন ছেপেছে 'হাত দুটির খোঁজে গোয়েন্দারা' শিরোনামে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক বছর ধরে ইন্টারনেটে রহস্যময় দুটি হাত বোমা বানানোর কৌশল শিক্ষা দিয়ে চলেছে। ভিডিওতে হাত দুটি দেখা গেলেও ওগুলোর মালিকের চেহারা দেখা যায় না। কীভাবে কোন প্রক্রিয়ায় বোমা তৈরি করা যায়, হাত দুটি তার সচিত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে; অনেকটা দূরশিক্ষণ পদ্ধতির মতো। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে সক্রিয় উগ্রপন্থিদের কাছে ওই হাতের ব্যক্তি 'বোমা মাস্টার' হিসেবে পরিচিত। সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে সমকাল লিখেছে, অনেক দিন ধরেই অনলাইনে জঙ্গিদের বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে একটি চক্র। আর সে কাজে ওই হাত দুটির ভিডিও দেখানো হয়। পুলিশ জানিয়েছে, বোমা তৈরির সঙ্গে জড়িত যাদের এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তারা ওই ভিডিওর কথা স্বীকার করলেও হাত দুটির মালিকের পরিচয় জানাতে পারেনি। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা ওই নেপথ্য হাতের রহস্য উন্মোচনের চেষ্টায় আছেন। হাতের ব্যক্তিটিকে চিহ্নিত করা গেলে বাংলাদেশে জঙ্গিদের বোমা তৎপরতার নেটওয়ার্ক পুরোটাই ভেঙে দেওয়া সম্ভব হবে।

আমাদের দেশে ইন্টারনেট তথা তথ্যপ্রযুক্তির যে অপব্যবহার বিভিন্ন ক্ষেত্রে চলছে, হাত দুটির বোমা বানানোর প্রশিক্ষণ তার অন্যতম উদাহরণ। কিছু সমাজবিরোধী বিজ্ঞানের এ সুবিধাকে অনৈতিক কাজে ব্যবহার করে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে মাঝেমধ্যেই। কেউ কউ করে চলেছে ব্যক্তির চরিত্র হনন। তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধার অপব্যবহার করে অনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে সরকার একটি আইনও করেছে। এই আইনে কেউ কেউ ধরাও পড়ছে। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার কমছে না। তবে ওই আইনের প্রয়োগ বেশি হচ্ছে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে। প্রভাবশালী কারও সম্পর্কে অনলাইনে কিছু প্রকাশ করলেই ওই আইনের খÿ নেমে আসছে। এমনি একটি মামলায় অনেক ভোগান্তি শেষে বেকসুর খালাস পেয়েছেন ফরিদপুরের সাংবাদিক প্রবীর শিকদার। প্রবীর শিকদারের এ হয়রানির পেছনে কার 'কালোহাত' কাজ করেছে, তা এখন আর জানতে কারও বাকি নেই। বেকসুর খালাস পাওয়া প্রবীর শিকদার পাল্টা কোনো ব্যবস্থা নেবেন কিনা জানি না। তবে আইনের অপব্যবহার এবং শক্তিধর মহলের হয়রানি বন্ধের জন্য এ ধরনের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো দরকার।

তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধাকে অপব্যবহার করে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অনেক নজির রয়েছে। ফেসবুকে গুজব ছড়িয়ে সামাজিক বা ধর্মীয় দাঙ্গা লাগানো হয়েছে বিভিন্ন স্থানে। এসব ঘটনার পেছনেও কালোহাতের কারসাজির কথা বলে সচেতন মহল। প্রতিনিয়ত আমাদের সমাজে যেসব ঘটনা ঘটে, সেগুলোর পেছনে একেকটি চক্র কাজ করে থাকে। কেউ যদি কোনো অন্যায় বা সমাজবিরোধী কাজের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন, অমনি তার বিরুদ্ধে একটি মহল উঠেপড়ে লাগে। তারা প্রতিবাদী ব্যক্তিকে কীভাবে বিপাকে ফেলা যায় তার চক্রান্ত করতে থাকে। মিডিয়ার ক্ষেত্রেও আমরা এমন ঘটনা মাঝেমধ্যেই ঘটতে দেখি। সংবাদপত্রকে বলা হয় সমাজের দর্পণ। কিন্তু সে দর্পণে যখন কিছু কুৎসিত মানুষের প্রতিবিম্ব ফুটে ওঠে, তখনই ওরা পাগলা সারমেয়র মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। নানাভাবে চেষ্টা করা হয় সংবাদকর্মীদের হয়রানির। কিছুদিন আগে সংবাদের জন্য তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে একজন সাংবাদিককে আমরা চুরির মামলার আসামি হতে দেখেছি। ওই ঘটনার পেছনেও কাজ করেছিল কোনো প্রভাবশালী মহলের কালোহাত। যদিও শেষ পর্যন্ত ওই সাংবাদিক জামিন পেয়ে মুক্ত হয়েছেন। তবে মামলা এখনও চলমান।

বোমা তৈরির প্রশিক্ষক হাত দুটি কার- এক বছরেও পুলিশ তা খুঁজে বের করতে পারেনি। এ জন্য তাদের দোষারোপ করে লাভ নেই। কেননা, এ ধরনের ব্যর্থতার অনেক নজির আমাদের পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর রয়েছে। সাংবাদিক সাগর-রুনি, সোহাগী জাহান তনু কিংবা মাওলানা নূরুল ইসলাম ফারুকী হত্যারহস্য উদ্ঘাটন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। আর আমরাও জানতে পারিনি চাঞ্চল্যকর এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে কার বা কাদের কালোহাত সক্রিয় ছিল। এসব হত্যাকাণ্ড ঘিরে তৈরি হওয়া রহস্যের পর্দা কোনোদিন উঠবে কিনা, সম্ভবত কেউ জানে না।

আমাদের সমাজে কালোহাতের প্রভাব এবং ক্ষমতার কথা সবাই অবগত। এই কালোহাতের ছোঁয়ায় বাজারে দ্রব্যমূল্য বাড়ে, অপরাধীরা পার পেয়ে যায়, নির্দোষ ব্যক্তিকে কারাবাস করতে হয়। ঘটে এমন অনেক অঘটন। দাবি ওঠে কালোহাত ভেঙে দেওয়ার। কিন্তু সে হাত থেকে যায় অক্ষত।

সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্নেষক