বিশ্বজুড়ে জালালুদ্দিন রুমির বিস্ময়কর সমাদরের পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। তবে তিনটি কারণ উল্লেখযোগ্য। তার একটি রুমির বংশধারা, রক্তের উত্তরাধিকার। যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান, মায়ের দিক থেকে আমিরুল মোমেনিন হজরত আলি (রা.)-এর বংশধর আর পিতার দিক থেকে খলিফাতুল মুসলেমিন হজরত আবুবকর সিদ্দিক (রা.)-এর বংশধর; এর পাশাপাশি ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-এর ভাবশিষ্য রুমি পরবর্তী সময়ে গুরু হিসেবে পেয়েছিলেন রহস্যপুরুষ শামস তাব্রিজকে; যিনি তার জীবনে 'ইনকিলাবে রুহানি' তথা আধ্যাত্মিক বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, রুমি তার পরিণত বয়সে রচিত অধ্যাত্মবিজ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্য-সংকলন মাসনাভিয়ে মানাভি; বিশ্বসাহিত্যে যাকে বলা হয়েছে অধ্যাত্মবাদের বিশ্বকোষ। মুসলিম জাহানে মাত্র তিনটি মহাগ্রন্থের সঙ্গে শরিফ শব্দটি সংযোজন করা হয়; কোরআন শরিফ, হাদিস শরিফ আর মসনভি শরিফ। মসনভির সঙ্গে এই শরিফ সংযোজনের মাধ্যমে ইসলামী দুনিয়া রুমির স্বাতন্ত্র্য অবস্থান ও মর্যাদার স্বীকৃতিই প্রদান করল। তৃতীয় কারণটি হচ্ছে- রুমির প্রেম-দর্শন; ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ, অশান্ত আর অস্থিরতাপূর্ণ সমাজে রুমি তার প্রেমদর্শনের মাধ্যমে এনে দিলেন শান্তির পরশ। এই তিনটি বিশেষত্ব রুমিকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে, স্বকীয় মহিমায় তাকে চিরভাস্বর ও চির-অমর করেছে।
রুমি ছিলেন প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত একজন মানুষ। তদানীন্তন পৃথিবীর এমন কোনো জ্ঞান অবশিষ্ট ছিল না, যে সম্পর্কে রুমি শিক্ষালাভ করেননি; জ্ঞান আহরণ করতে করতে একপর্যায়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সর্ববিদ্যাবিশারদ। তৎকালীন দুনিয়ায় এমন মানুষ ছিল দুর্লভ, যিনি কিনা রুমির সামনে এসে জ্ঞানের তালিম দেবে অথবা বলবে আমার জ্ঞান রুমির চাইতে বেশি। শিক্ষাজীবন শেষ করে বুজুর্গ পিতার প্রতিষ্ঠিত দ্বীনি প্রতিষ্ঠানেই তিনি জ্ঞান বিতরণে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। দূরদূরান্ত থেকে অজস্র মানুষ এসে রুমির ক্লাসে বসে যেতেন, রুমি তাদের মাঝে অকাতরে এলম ও আমলের জ্ঞান বিলিয়ে দিচ্ছিলেন। জ্ঞানের গরিমা ও পাণ্ডিত্যের অহংবোধ এ সময় হয়তো কিছুটা রুমিকে আঁকড়ে ধরেছিল। এমন সময় তার সামনে হাজির হন জ্যোতির্ময় আত্মাবিশিষ্ট রহস্যজালে ঘেরা এক মহাপুরুষ; নাম তার শামস তাব্রিজ তথা তাব্রিজের সূর্য।
রুমির মতে, সব ব্যাধির মহৌষধ হলো ঐশীপ্রেম। প্রেম মনকে মলিনতা, কালিমা, কদর্যতা ও পাপাসক্তি হতে মুক্ত করে নির্মল, পবিত্র ও উন্নত করে। যার অস্তিত্ব প্রেমের দ্বারা নির্মল ও পবিত্র হয়. তার জীবন সবরকম কলুষতা হতে মুক্ত হয়। প্রেম বড়-ছোট বিচার করে না। বৃষ্টির মতো সর্বত্র পতিত হয়। এই প্রেমই আত্মাকে করে পবিত্র এবং নিয়ে যায় উন্নতির চরম শিখরে। এ প্রেম হলো সব ধরনের প্রবৃত্তিজাত ও চারিত্রিক ব্যাধির নিরাময়কারী। চিকিৎসক যেসব আধ্যাত্মিক রোগের চিকিৎসা থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছে এবং যেসব রোগের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপত্রই ফলদায়ক হয় না- একমাত্র চোখের পলকে সেসব রোগ এ প্রেম নিরাময় করতে পারে। শত বছরের রোগী যখন প্রেমের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জটিল রোগ থেকে মুক্তি পায় তখন সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে এবং এ প্রেমকে অভিবাদন জানায়। এ প্রসঙ্গে রুমি বলেন :'প্রেমে পড়ে যার (সম্মানের) জামা দীর্ণ হয়েছে/ লোভ ও যাবতীয় দোষ হতে সে পাক-সাফ হয়েছে।/ ধন্য হও হে প্রেম! ওহে আমার সুখময় মগ্নতা/ ওহে আমার সকল রোগের চিকিৎসক!/ ওহে আমার আত্মপূজা ও খ্যাতির গরিমার ঔষধ/ ওহে তুমিই তো আমার প্লোটো ও গ্যালেনাস।'
জালালুদ্দিন রুমি ঐশীপ্রেমের মাধ্যমে সব অন্যায়, দোষত্রুটি থেকে মুক্ত হয়ে মহান স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি প্রেমের মাধ্যমে স্রষ্টার সঙ্গে মিলিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় বিভোর ছিলেন এবং স্রষ্টার ভালোবাসায় আরও গভীরভাবে ডুবে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন। মানবসমাজে সৃষ্টিকর্তাকে নিয়ে মতবিরোধের কোনো অবকাশ নেই; পরম স্রষ্টার একত্ববাদের রহস্য এখানেই নিহিত রয়েছে। রুমির প্রজ্ঞাপূর্ণ এ ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করলে পৃথিবীর কোনো ধর্মাবলম্বীই সংকীর্ণ মনের হবে না, সাম্প্রদায়িক হবে না; বরং আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির এক মধুর পরিবেশ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আধুনিক বিশ্বের সমাজদেহে মানবকুুলের প্রত্যাশিত শান্তির সুবাতাস বয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
গতকাল ছিল রুমির ৮১৫তম জন্মদিন। রুমির প্রেম ও প্রজ্ঞার জয় হোক, জয় হোক মানুষের আর জয় হোক মানবতার।
চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়